সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮ , ১০ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
প্রাণী ও পরিবেশ

পরিবেশের এ কেমন বিপর্যয় !

নিউজজি ডেস্ক ২২ জুন , ২০১৯, ১০:২৯:২২

  • পরিবেশের এ কেমন বিপর্যয় !

আকাশ দাপিয়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। তুমুল বৃষ্টি। পৃথিবী ঠাণ্ডা হবার কথা ছিল। আগে তো তাই হতো। কিন্তু গরমে ঘেমে অস্থির সকলেই। শীতকাল এসে চলে যায়, তবুও আমাদের গরম ছাড়ে না। কেন এই বিপর্যয়? পরিবেশ যাচ্ছে কোথায়?

প্রকৃতি থেকেই জীব ও জগৎ। এই প্রকৃতিই জন্মদাতা পুরুষ এবং নারী। অর্থাৎ বাবা ও মা। সন্তানের জন্ম ও বেঁচে থাকার জন্য যেখানে প্রকৃতির অশেষ দয়া, সেখানে সন্তানের লাঞ্ছনা আর কতকাল সইবে প্রকৃতি। পৃথিবী ও সূর্যের মধুর সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি যতদিন না থাকবে, পৃথিবীর বাইরেই আমাদের মূল অবস্থান, এই মনোভাবের পরিবর্তন না হবে, ততদিন দুর্ভোগ আমাদের পিছু ছাড়বে না। 

অবশ্য বলা যায়, আধুনিক বিজ্ঞানের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশ মানুষকে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিল্প-দানবের দাস করে ফেলছে। যার ফলে বনাঞ্চল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বনাঞ্চল যে মানুষের প্রকৃত সত্তাকে বিকশিত করে তা ভুলে বসে আছে মানুষ। নির্জন প্রকৃতির সংরক্ষণই যে মানব সভ্যতা টিকে থাকার কষ্টিপাথর তা নিয়ে কেউ ভাবছে না। বর্তমান মানব সমাজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে, নদী-নালা-খাল-বিল-ঝর্নাকে বুজিয়ে দিয়ে নগর সভ্যতার প্রত্যাশী। এই প্রত্যাশা পশ্চিমা নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষ এখন বুঝতে পেরে প্রকৃতি রক্ষার চিন্তায় আকৃষ্ট হচ্ছেন। তাই প্রকৃতিকেন্দ্রিক পরিবেশ আন্দোলন পশ্চিমে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও সেভাবে সাড়া জাগেনি। 

বলা যায়, জীববিদ্যার বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন সভ্যতার বিকাশ প্রাকৃতিক পরিবেশকে পরিবর্তন ছাড়া অসম্ভব। কিন্তু ক্রমাগত হস্থক্ষেপ কখনও ব্যাপক বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে এই আশঙ্কাটি বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীকে চিন্তান্বিত করে। বলা যায়, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু মানুষ নামক প্রাণীর বাসস্থান এবং সুখ-সুবিধার কথা, ভোগ-বিলাসের কথাই বর্তমান সভ্যতা বলে মেনে চলার এই অন্তিম পরিণতিই আজ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। জীবনযাত্রার উন্নত অবস্থাকে চালু রাখতে যে ব্যাপক সম্পদ তৈরি করতে হচ্ছে শিল্প, কৃষিতে তা থেকে উদ্ভূত দূষণ পরিবেশকে ধ্বংস করছে। রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বলতে হয়, আধুনিক শিল্প ও কৃষিজাত দূষণকে সীমিত রাখতে নতুন সমাজ ও জীব-দর্শনের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা, ধনতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক যাই হোক না কেন, তার বিরোধী মতবাদগুলোকে একটি ঐক্যের সূত্রে গেঁথেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

মানুষ নিজেকে খুব বড় বলে মনে করে। ভূ-প্রকৃতির কাছে মানুষ তিল পরিমাণ কিছু নয়। এ পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে কী কাণ্ডকারখানা চলছে তা মানুষ জানে না বলেই বেশ আছে। যখন মাঝে-মাঝে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভয়ংকর রূপ ধরে প্রকাশ হয়, তখন ধ্বংসলীলা দেখে ক্ষণিক ভাবিত হলেও পরক্ষণে ভুলে গিয়ে আত্মসুখে মেতে ওঠে। নিজেকে বিশ্বের অধীশ্বর বলে ভাবে। এই তো কিছু দিন হয় এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ নিয়ে বিজ্ঞানের এক অধ্যাপকের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। এই অঞ্চলের তাপমাত্রার একটা গÐি ছিল। তা ভেঙে গেছে কেন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক বললেন, ভুলে যাবেন না গত সুনামির কথা। সেই সময় সুনামির ভয়ংকর রূপ দেখেছেন, কিন্তু সেই ভয়ংকর রূপের কারণে সে সময়ই কেবল প্রচণ্ড ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে নিঃশ্বাস ফেললে চলবে না, সে সময়ের পরিণতি তো জানার এখনও বাকি। পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে দিক পরিবর্তন যখন আমরা একদিন জানতে পারব, তখন অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আমরা সত্যি সত্যি কি আগের জায়গায় আছি, না পূর্ব থেকে দক্ষিণে চলে গেছি কে জানে। সুনামির প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। একদিন ভূ-পৃষ্ঠের দিক পরিবর্তনের চিত্র আমরা জানব। তখনই আমাদের ক্ষমতা অহংকার চূর্ণ হবে। বিশ্ব-প্রকৃতির কাছে নতজানু হয়ে নিজেদের অহংকারকে চূর্ণ করা ছাড়া গতি থাকবে না।

সত্যি, মানুষ এখনও নিজেদেরকে শোধরাবার চেষ্টা করুক। পরিবেশ রক্ষায় যত্নবান হোক। প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করুক। হাতের কুড়াল বা করাত ফেলে গাছগাছালির গোড়ায় পানি ঢালুক। যুদ্ধের  অস্ত্র ফেলে মানুষে-মানুষে আলিঙ্গনাবদ্ধ হোক। সুখ ও সমৃদ্ধির লাগাম টানুক। কার্বনের বিষাক্ত পরিবেশের কথা স্মরণ করে অধিকমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ বন্ধ হোক। সবচেয়ে বড় কথা অপচয় রোধ করার দিকে যত্নবান হোক। প্রয়োজনের অধিক অপচয়ই সর্বনাশ ডেকে আনে। মনে রাখা দরকার, ভোগবাদই বিশ্ব-প্রকৃতির বড় শত্রু। শুধু মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তাই ডেকে আনছে বড় বিপদ।

বিশ্ব পরিবেশ তো আর ভালো হচ্ছে না। শিল্প স্থাপনের নিমিত্তে নির্গত কার্বন এবং যুদ্ধাস্ত্রের কারণে বারুদের ধোঁয়ায় আকাশ আচ্ছন্ন। সেই সঙ্গে তামসিকতায় আচ্ছন্ন মানুষের মন। বোধহীন বহু জীবনের অমানুষিকতায় বিড়ম্বনার জীবন আজ বিশ্বজুড়ে। আত্মসুখে মগ্ন ক্ষমতালোভী মানুষের মোহ ভঙ্গ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বিলাসী জীবন যাত্রায় থেকে যে পৃথিবীকে সুন্দর ও স্বর্গ বলে আমরা মনে করছি তা যে মোটেই সুন্দর ও স্বর্গ সমান নয় আবহাওয়ার এই জটিল পরিবর্তনে তা আর বলার প্রয়োজন পড়ে না। যদি এখনও বিজ্ঞানীদের সংকেত শুনে আমাদের বোধোদয় না ঘটে, যুদ্ধ থেমে না যায়, কার্বন নির্গত বন্ধ না হয়, মানবতাবোধ প্রকট না হয়, প্রকৃতি সৃজনে মনোযোগী না হয়, তাহলে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাঁচবে না। আমরা যারা বুড়ো খোকার দল তারা মরে গেলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদেরে স্বার্থপর, অপদার্থ, অশিক্ষিত, অমানুষ ইত্যাদি বলে গালাগাল দেবে। তারাও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমাদের অভিশাপ দিতে দিতে মরবে।

তাই যত দ্রুত সম্ভব সচেতন হওয়া। পৃথিবী সুন্দর। সুন্দর বলেই আমরা জানতে চাই। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers