মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ , ৪ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
প্রাণী ও পরিবেশ

সোনালি ডানার শঙ্খ চিল

নিউজজি প্রতিবেদক ১৬ মার্চ , ২০১৯, ১৩:২৬:৩৯

  • ছবি: রাকিব হাসান

"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শঙ্খ চিল শালিখের বেশে" কবি জীবনানন্দের সোনালি ডানার চিল এখন আর ধানসিঁড়ি নদীর তীরে কাঁদতে দেখা যায় না। ধানসিঁড়ি নদী গেছে শুকিয়ে। চিল আর খুঁজে পাওয়া যায় না গ্রামবাংলায়। প্রকৃতিতে এখন সোনালি ডানার চিলের দেখা মেলা সত্যিই ভার। সেই নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা এখনো আছে, নেই শুধু অলস ডানা মেলা সোনালি ডানার শূন্যদৃষ্টির সেই পাখি চিল। হায় সোনালি ডানার চিল তুমি কোথায়?

অথচ একসময় চিলের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই বাংলার সর্বত্র। আকাশের অনেক উঁচুতে দল বেঁধে ডানা মেলে ঘুরে বেড়াত। শিকারের খোঁজে আকাশে ডানা স্থির রেখে চক্রাকারে ঘুরপাক খেত। চিল এলেই হাঁস-মুরগির বাচ্চাগুলো ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিত। হাঁস-মুরগি তাদের ছানাগুলো পালক ছড়িয়ে ঢেকে রাখত। গ্রামবাংলায় এমন পরিচিত দৃশ্য এখন আর চোখেই পড়ে না। কালেভদ্রে দু-একটি চিল আকাশে চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে দেখা যায়। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশে শঙ্খচিল পর্যাপ্ত সংখ্যায় ছিল। এখন এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ খাদ্য ও প্রজনন সংকট। এখন আর আগের অবস্থায় প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো নেই। নেই পর্যাপ্ত খাবার; যেখানে তারা দলগতভাবে মাছ শিকার করে বেঁচে থাকতে পারে। বড় বড় প্রাকৃতিক গাছের সমাহারও এখন নেই। যেখানে তারা নির্বিঘ্নে বাসা তৈরি করে ছানা উৎপাদন করতে পারবে।

শিকারি পাখি চিলের ডানা দুটি বেশ দীর্ঘ এবং পা দুর্বল ও খাটো। এদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর। শিকারের খোঁজে এরা আকাশে ডানা স্থির রেখে চক্রাকারে ঘুরপাক খায়। চিলের প্রজাতির সংখ্যা অনেক হলেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে ভুবন ও শঙ্খচিল বেশি দেখা যেত। শস্যখেতে বিষটোপ, গবাদিপশু চিকিৎসায় প্রদাহরোধক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ব্যবহার, খাদ্যের অপর্যাপ্ততা বাসস্থানের অভাবের কারণে প্রজনন সমস্যায় চিল বিলুপ্তির পথে রয়েছে। সে কারণেই আগের মতো প্রকৃতিতে সেভাবে চিলের বিচরণ চোখে পড়ছে না। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি থেকে চিল বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে।

এদের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো- ওরা ওদের ছানার দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য মাঝে মাঝে হাঁস-মুরগির ছোট বাচ্চা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায়। তবে এমনিতে সাধারণত ওরা নিজের খাবার জন্য হাঁস-মুরগি ছানা তুলে নেয় না। গ্রামাঞ্চলের বাড়ির উঠান থেকে এভাবে চমৎকার ভঙ্গিতে শিকার ধরতে ভীষণ পটু ওরা। মুহূর্তের মধ্যে মুরগির বাচ্চার ডাকগুলো আকাশে মিলিয়ে যেত। একসময় আমাদের গ্রামদেশের বিলে বা পুকুরে মাছ ধরা হলে দেখা যেত দল বেঁধে ১৫-২০ শঙ্খচিল এসে ভিড় করত। খলিসা, পুঁটি, চেলা, মলা, ঢেলা প্রভৃতি প্রাকৃতিক ছোট মাছ, কাঁকড়া, মেটেসাপ- এগুলো খেতে নামত। মানুষের একেবারে নাকের ডগায় এসে ফেলে দেওয়া মাছগুলো ছোঁ মেরে নিয়ে যেত। এ দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। 

মার্চ থেকে মে শঙ্খ চিলের প্রধান প্রজনন ঋতু। এ সময় পুরুষ চিল আকাশে চক্রাকারে উড়তে থাকে। হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে ডালে বসে থাকা স্ত্রী চিলের পিঠে এসে নামে। স্থানভেদে প্রজনন মৌসুমে বিভিন্নতা দেখা যায়। উঁচু গাছে কাঠি, ডালপালা দিয়ে এলোমেলো মাচার মতো বাসা তৈরি করে। উঁচু দালানে পানির ট্যাঙ্কেও বাসা করতে পারে। বাসায় নষ্ট কাগজ, পাখির পালক, ছেঁড়া কাপড়, শুকনো গোবর, কাদা, উজ্জ্বল প্লাস্টিকের বস্তুও থাকে। বাসার উচ্চতা ভূমি থেকে ৫ মিটার থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত হয়। বাসা বানানো হয়ে গেলে ২-৪টি ডিম পাড়ে। ৩০ থেকে ৩৪ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ছানারা প্রায় দুই মাস বাসায় থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় চিলই বাসা বানায়, ডিমে তা দেয় ও সন্তান লালন-পালনের ভার নেয়। দুই বছর বয়সে ছানারা প্রজননক্ষম হয়।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers