রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯ , ২৮ সফর ১৪৪৪

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

নিভু নিভু শশিকরের দ্যুতি

শ্যামা সরকার ২৯ জুলাই , ২০২২, ০১:৫৪:১৮

3K
  • নিভু নিভু শশিকরের দ্যুতি

শশিকর। প্রকৃতির লীলাভূমি। ছায়া সুনিবিড়ি সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ, গাছে গাছে পাখির কল-কাকলী, মেঠো পথ- এসবই মুগ্ধ করে, দোলা দেয়। স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। সরল প্রাণের চঞ্চলতায় যেন জড়িয়ে আছে এক মায়াময় স্নিগ্ধ শিহরণ। প্রাণের স্পন্দন। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার একটি গ্রাম। অপরূপ রূপের মাধুরী। ছবির মতোন। যেন চিরন্তন বাংলার হৃদয়ের স্পর্শ মেলে এখানে। 

ছোট্ট এ গ্রামটিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশবের মধুর স্মৃতি, নানা রঙের দিনগুলো প্রায়শই আচ্ছন্ন করে রাখে। রূপসী বাংলার ষড় ঋতু এ গ্রামটিকে ঘিরে। একদিকে এর সৌন্দর্যের মুগ্ধতা এবং অন্যদিকে তার ঐশ্বর্যের লালসা বহুদিন থেকেই আকর্ষণ করেছে। অনুপম বৈচিত্র্যময় ঋতু রঙের এমন উজ্জ্বল প্রকাশই শশিকর। 

ঋতু বৈচিত্র্যের এক চমৎকার ভাব প্রত্যক্ষ করা যায় এ গ্রামটিতে। গ্রীস্মের কাঠফাটা দাবদাহ। চাতক পাখির ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদে নেমে আসে বৃষ্টি। টিনের চালের ঘরে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ কেড়ে নেয় শৈল্পিক মন। বর্ষাকালে চারিদিকে জলে টইটম্বুর। চলাচলের একমাত্র বাহন ‘নৌকা’। খাল, বিল জুড়ে শাপলা। গাছে গাছে কদম ফুল। যেন পূর্ণিমার আরেক রূপ। বর্ষা এলেই ঘরে ঘরে চলতো মাছ ধরার জাল বোনার কাজ। এ সময় বিল-ঝিলে মাছ ধরা নিত্যদিনের কাজ। বর্ষাকালে এ অঞ্চলের লোকজন তখনকার সময়ে এক প্রকার ঘরবন্দীই ছিলেন। শীতে ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু যেন রূপালির ঝিলিক। মন মাতানো অনুভূতি। গ্রামের রাস্তাঘাট, মাঠ ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সূর্যের দেখা মেলা ভার। এ সময় খেজুরের রস, পিঠাপুলি নিয়ে যেন ঘরে ঘরে উৎসবের মেলা বসে। বসন্ত প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আরেক নাম। চারিদিকে রঙের মেলা। ফুলে ফুলে ভরা চারপাশ। পলাশ ফুলের রূপে আগুন ছড়ায় প্রতিটি মানব মনে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, কোকিলের ডাকে মন মাতাল থাকে। প্রকৃতির এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। প্রকৃতির এ রূপগুলো হৃদয় দিয়ে উপভোগ করার মতো। বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির এ লীলাভূমিতে খেলেছি গোল্লাছুট, কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাঙ্গুলি, লাটিম খেলা, মার্বেল খেলা আরো কত কী? 

গ্রামের জনজীবনে ছিল না আর্থিক সচ্ছলতা। কিন্তু আশ্চর্য আত্মতৃপ্তির এক স্বর্গভূমি। দৈন্য, অভাব, অনটন, রোগ  রোগ মুক্তি- সবই ছিল। অর্থনৈতিক মুক্তি না থাকলেও মুখরিত ছিল প্রাণ-প্রাচুর্যে। যুগ যুগ ধরে পূজা-পার্বণ, নববর্ষ উদযাপন, মেলা ও উৎসব অনুষ্ঠান এ গ্রামের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। শিক্ষা প্রসারে শশিকর প্রাথমিক বিদ্যালয়, শশিকর উচ্চ বিদ্যালয় ও শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে স্থাপন করা হয়েছিল। দ্যুতি ছড়িয়েছে এলাকা ও এলাকার বাইরের অসংখ্য পরিবারে। শশিকর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকারের গৌরব অর্জন করেন আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও অগ্রজ অধ্যাপক ড. অমল হালদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের একজন সফল শিক্ষক ছিলেন। যাকে আমরা সেই শিশু বয়স থেকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে এসছি। এছাড়া সকলের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ড. দুলাল ভৌমিক, তিনিও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন এবং তিনি বিভিন্ন সময়ে শশিকরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। শত শত মেধাবীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশে ও দেশের বাইরে। যা এলাকাবাসীর অহঙ্কারের ও মর্যাদার। 

গর্বের ও আত্মমর্যাদার পুণ্যভূমি শশিকর আজ সে অবস্থানে নেই। সব হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। শিক্ষা ও শিক্ষিতের হার বেড়েছে। বাড়েনি মান। এটি সুস্পষ্ট। আচার-আচরণ, বাচনভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গি- সব কিছুর মধ্যে অহঙ্কার ও আত্মপ্রচারের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যা একটি কমিউনিটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মেধার ছড়াছড়ি। তবুও উন্নয়নের ছোঁয়া নেই। নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ- এর বিরাট অভাব। রয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত মনোভাবের অভাব। 

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখো শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ। অমর শহীদদের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ কওে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়িয়ে   দেয়ার   মহৎ   উদ্দেশ্য   নিয়ে ১৯৭৩ সালে শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। অত্র এলাকার তৎকালীন শিক্ষানুরাগী তথা ক্ষণজন্মা মনীষীদের চিন্তার ফসল এই শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়। এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত  হয়েছিলেন শশিকরসহ আশপাশের এলাকার জনসাধারণ।   

খুব বেশি আলোচনা না করে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরছি। যা গত কয়েক মাসে আমার দৃষ্টিগোচর হয় এবং এর কিছু সত্যতা আমি খুঁজে পাই। শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের কথাই বলি। এখানে বিচক্ষণ গভর্নিং বডি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক মনোনীত বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি আছেন। আছেন অভিভাবক প্রতিনিধি। এদের কাছ থেকে শুনতে হয় এলাকায় তরুণ সমাজ মাদকাসক্ত, লেখাপড়ায় উদাসীন এবং অভিভাবকদের সম্মান করে না। প্রশ্ন করেছিলাম গভর্নিং বডিতে এত মেধার সমন্বয় তারা কী করে? অনেকেই সরকারের বিভিন্ন পদমর্যাদায় আসীন ছিলেন এবং এখনও আছেন। তারা জানেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটাই লক্ষ্য দেশের যুব সমাজ ও গ্রামকে রক্ষা করা। তাদের উচিত দায় ও দায়িত্ববোধ থেকে এ কাজগুলো করা। অনেকে আছেন ভাবেন বেকার থাকার চাইতে কোন একটা কিছুতে লেগে থাকা আর কি? মাদকাসক্তকে ও লেখাপড়ায় উদাসীনতাকে মূলস্রোত ধারায় আনা আমার কাজ নয়। এলাকার দু’পক্ষ এটা বুঝবে। এ এক অশনি সংকেত।

শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের নৈতিক স্খলন, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়োগদান ও দুর্নীতি এলাকাবাসীর মুখে মুখে। যাকে সমর্থন দেয়ার মতো অনেক দক্ষ লোক আছেন বিভিন্ন কমিটিতে। যে কমিটিগুলোর সম্মানিত সদস্যরা অধ্যক্ষ মহোদয়েরই অনুকম্পা। গভর্নিং বডি গঠনে যদি কোন অনিয়ম থেকে না থাকে তাহলে তাদের উচিত এর প্রতিবাদ করা এবং এর থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায় বের করা। মনে রাখা দরকার- সময় বদলায়। আর বদলায় বলেই প্রয়োজন পরিবর্তন। প্রকৃতির এ এক অমোঘ নিয়ম।

এলাকায় প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে বিপথগামীদের পাশে দাঁড়নো এবং তাদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করলে আত্মতুষ্টি হবে। তা না হলে বিবেক তাড়িত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। তো সাবধান!

নিজ এলাকা তথা গ্রামের (যেহেতু সংশ্লিষ্ট সকলেই এলাকার) উন্নয়ন না হলে সার্বজনীন কল্যাণ সম্ভব নয়। মেধা ও প্রতিভা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হতে হবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাহসী ও দৃঢ় পদক্ষেপে অনুপ্রাণিত হলেই পাবো সুন্দর আগামী। পাবো উন্নত ও আত্মনির্ভরশীল জাতি। 

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ও প্রধান, কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, প্রধান কার্যালয়, উদ্দীপন।

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন