সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৫ জিলহজ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাঁক

ডাঃ রফিকুর রহমান ২৯ মে , ২০২১, ১৪:৫৬:৩৯

  • পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাঁক

স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে নির্ধারিত মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক কুটনীতি থেকে বাংলাদেশ সরে এসেছে। এটা শুধুমাত্র পাসপোর্ট কেন্দ্রিক  সামান্য কোন ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে সুদুর প্রসারী লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে ইসরাইল ভ্রমণ করায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। অতিসম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা খুবই চুপিসারে প্রত্যাহার করা হয়েছে অর্থাৎ পাসপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণ করা যাবে না এই কথাটা এখন আর লেখা নেই। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পাসপোর্টের এই পরিবর্তনকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পাসপোর্টের মানে উন্নীত হওয়ার বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপনা করেছেন। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের পাসপোর্ট কতগুলো দেশকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে কতগুলো ধাপ এগিয়ে গেল তার কোন মূল্যায়ন নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ তাঁর  বক্তব্যকে ঠুনকো যুক্তি হিসেবে মনে করেছেন। এটাও মনে হয়েছে যে তিনি কিছু একটা রাখঢাক করার চেষ্টা করছেন। এ যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে লালন করা এই পররাষ্ট্রনীতি থেকে বাংলাদেশ যে সরে এল এর পিছনে কোন ঘটনা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে কিনা সেটা এখন সহস্র কোটি টাকার প্রশ্ন।

উগ্র ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের আগ্রাসী বর্ণবাদী চরিত্র এবং সর্বোপরি ফিলিস্তিনী জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিতাড়ন ও তাদের উপর ক্রমআক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পাসপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে ইসরাইলে ভ্রমণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সে সময় বর্ণবাদী চরিত্রের কারণে সাউথ আফ্রিকা ভ্রমনও বাংলাদেশের পাসপোর্টে নিষিদ্ধ ছিল। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশী জনগণের উপলব্ধিকে ধারণ করেই বঙ্গবন্ধু এই বৈদেশিক নীতি প্রনয়ন করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গত ৫০ বছরে ইসরাইল তার আধিপত্যবাদী অবস্থানের কোন পরিবর্তন করেনি বরং অধিকতর মারমুখী হয়েছে। ফিলিস্তিনের জনগোষ্ঠীর ওপর উপর্যুপরি আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে, যার সর্বশেষ ঘটনায় যুক্ত হয়েছে গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর উপর ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলা এবং শিশুসহ নিরীহ জনগণকে হত্যা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অবস্থান ইসরাইল সরকার কর্তৃক ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। পক্ষান্তরে এরকম সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ এবং ফিলিস্তিনি জনগণকে দারুণভাবে হতাশ ও মর্মাহত করেছে। নতুন কূটনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে আগেভাগে কোনো ব্যাখ্যা বা বিবৃতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয় নাই। পএিকায় পাসপোর্টের পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর কতিপয় মন্ত্রীর ব্যাখ্যা আলোচনায় আসে। তাঁদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দুর্বল ব্যাখ্যা সরকারের লুকোচুরি প্রকাশ করে যা জাতির জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না। এই নীতিগত অবস্থান বাংলাদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর উপলব্ধি ও ভাবনার পরিপন্থী। অনেক দেশের পাসপোর্টে এখনো ইসরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আছে। এশিয়ার দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নাম এখানে উল্লেখ করার মতো।

সরকার এখন উচ্চস্বরে বলছে ইসরাইলের সাথে আমাদের এখনো কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই অথচ নতুন কুটনীতিতে এমন এক সম্পর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে যেখানে বাংলাদেশীরা এখন নতুন বিধির আওতায় বিনা বাধায় ইসরাইলে ভ্রমণ করার মতো সুযোগ পাবে যা আগের আইনে ছিল অপরাধ। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের এই ব্যবস্থাকে ইসরাইল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং মুসলিম বিশ্বে তাদের রাজনীতির একটা বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করছে এবং ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থা সৃষ্টি করে দিয়ে  জঙ্গিবাদী ইসরাইলের অবস্থানকেই নৈতিক সমর্থন জানানো হয়েছে।  

পররাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ তৈরি করবে এবং কোন দেশের রাষ্ট্রদূত কি মনে করলো তাতে কিছু যায় আসে না। কাজেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনে এবং তার সমাজ ও সংস্কৃতি আচরণ এবং উপলব্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলন করে কিনা সেটা ব্যারোমিটার দিয়ে পরখ করে নিতে হবে। জনগণের ইচ্ছাকে গৌণ করে যে কোন নীতি গ্রহণ টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক হবে না। দেশের জনগণ পররাষ্ট্রনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকলে অথবা তাদের উপলব্ধি অনুযায়ী নীতি গৃহীত না হলে সেই পররাষ্ট্রনীতি মুখ থুবরে পড়ে যেতে বাধ্য।

যে কোন দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রবর্তিত হয় তার অভ্যন্তরীণ অবস্থান এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের উপর। পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে এমন প্রধান অভ্যন্তরীণ কারণ গুলো প্রধানত হলো ভৌগলিক অবস্থান, দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় সামর্থ্য, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। পররাষ্ট্রনীতির বিকাশ অভ্যন্তরীণ জন বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়।

আমরা প্রত্যাশা করি বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেয়া হবে এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জনগণের চিন্তা ভাবনার উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটে সে বিষয়ে নীতি নির্ধারক মহল যত্নবান হবেন।

লেখক: চিকিৎসক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

বি দ্রি: (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers