রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮ , ৯ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

চিকিৎসক এবং পুলিশ কাণ্ড: কিছু বলা কঠিন, চুপ থাকাও অসম্ভব

শহীদুল্লাহ ফরায়জী ২২ এপ্রিল , ২০২১, ১৫:০০:২৭

  • ছবি: নিউজজি২৪

করোনার ভয়াবহ দুর্দিনে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে চিকিৎসক এবং পুলিশের  বাকবিতণ্ডার মাঝে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃত আচরণবিধি, শৃঙ্খলা, দায়িত্ব ও কর্তব্য, আত্মমর্যাদাবোধ এবং অসহিষ্ণুতার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাতে  দেশবাসী খুবই উদ্বিগ্ন। উভয় পক্ষের পরিশীলিত জ্ঞানগর্ভ বয়ান, মূল্যবোধ ও মতাদর্শিক অবস্থানে দেশবাসী বিচলিত। কোন পক্ষই যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেনি বরং অমীমাংসিত বিরোধের প্রতিফলন ঘটেছে। এ ঘটনা শুধু দুই পক্ষের নয় সমাজের ব্যাপক মানুষ এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে রূপান্তর হতে পারে। কেউ তাদের দায়বদ্ধতা বা কর্তব্যদায় নির্ধারিত করছেন না। এটা ন্যায্যতার  বিচারে একেবারেই অগ্রহণীয়। এ ঘটনার সুদুরপ্রসারি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

তাঁরা জনসম্মুখে আলোচনার অবতারণা করেছেন কিন্তু সমাপ্তি করেননি। তাঁরা পরস্পরের প্রতি কেউ কোন একটা জায়গায় সহমত পোষণ করেননি, কোন একটা নৈতিক কোড গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁদের আচরণে অন্যের প্রতি ব্যক্তিগত সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। চিকিৎসক-পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট সবাই আইনের শৃংখলাবদ্ধ, কোন অজুহাতে তারা শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পারে না। প্রতিটি পেশার কর্তব্য দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্দেশিত। এবং এসব নির্দেশনা যেমন বাধ্যতামূলক তেমনি যেকোনো মূল্যে নির্দ্বিধায় অনুসরণীয়। আমাদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা সকল নির্দেশনা উপেক্ষা করে সহিংসপ্রবন হয়ে পরস্পরের প্রতি বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন যা আমার প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে না।

এই ধরনের অন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ একটি সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর হতাশাজনক।

মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার গৌরবময় অর্জনকে যে কোন ইস্যুতে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্বকে ধুলিস্যাৎ করার প্রবণতা আমাদেরকে অত্যন্ত  মর্মাহত করেছে। আমাদের অর্জনগুলোকে আমরাই ধ্বংস করে ফেলেছি। এগুলো ন্যায় ও সদাচারের পরিপন্থী, ন্যায্য সমাজ গঠনের অন্তরায়। সমাজ থেকে নৈতিকতার চিহ্ন মুছে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় আমরা নিয়োজিত। আমরা সাময়িক ক্ষমতার মোহে গণতন্ত্র মানবিকতা আইনের শাসনকে আমরা অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছি। নাগরিক নৈতিকতা বা ব্যক্তির নৈতিকতা ছাড়া কোন সমাজ চলতে পারে না।

কান্টের নীতি দর্শনের বলা হয়েছে মানুষের কর্তব্যবোধের মধ্যে সদিচ্ছা ভাবটি নিহত, মানুষ যখন নিছক কর্তব্যবোধ দ্বারা কাজে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয় তখন প্রকৃতপক্ষে তার ইচ্ছাবৃত্তিটি  যুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যুক্তি ও কর্তব্যবোধ নিয়ন্ত্রিত  ইচ্ছাবৃত্তিটি  সবার জন্য অপরিহার্য।

ঘটনার পরবর্তীতে করোনা মোকাবেলার সম্মুখ যোদ্ধা দুটি সরকারি সংস্থা পরস্পরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা কটাক্ষ হয়রানি কটুক্তিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায্যতার বিচার চেয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করায় প্রমাণ হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতা এবং যুক্তি প্রয়োগে চরম ঘাটতি রয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিকার না চেয়ে রাজনৈতিক দলের মত পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে ন্যায্যতা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য যথার্থ বা  সংগতিপূর্ণ কিনা তাও উভয়পক্ষের অনুসন্ধান করা উচিত। তাঁরা উভয় পক্ষ নিজেদের সমর্থন দিয়েছেন আর প্রতিপক্ষকে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিন্তু যুক্তি প্রয়োগ করে কোন পর্যালোচনা করেন নি। 

তাঁরা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 এগুলি আমাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপশাসন ও অপসংস্কৃতির নিদর্শন। এগুলো আমাদের নীতি-নৈতিকতাহীন উন্নয়নের দৃষ্টান্ত।এসব ঘটনা চরম অবক্ষয় প্রাপ্ত সমাজের প্রতিফলন, দুর্দিনের প্রতীক।

এসব প্রশ্নে নীরবতা পালন না করে সামাজিক নৈতিক যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা জরুরি।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন মানুষ হিসাবে আমাদের পরিচিতি সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তাকে যখন তার পূর্ণরূপে ধরা হয়, সেটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে খুবই প্রসারিত করতে পারে। আমাদের মানবতার সঙ্গে যুক্ত যে আবশ্যিক কর্তব্যদায় গুলো আছে  সেগুলো পালন করার জন্য আমাদের কোন রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। বস্তুত আমরা মানুষ হিসাবে একটা ব্যাপকতর বর্গের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের 'মানবিকতা'  বা 'মনুষ্যত্ব' দ্বারা পরিচালিত হবার আদর্শগত দাবিটা এর উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে; আমরা কোন বিশেষ জাতিসত্তা, ধর্ম সম্প্রদায় বা প্রাচীন কোন আধুনিক জাতি গোষ্ঠীর সদস্য তা দিয়ে একটা নির্ধারিত হয় না। ন্যায্যতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই ধারনাটি অতীতে বহু মানুষের চিন্তার বিষয় ছিল ভবিষ্যতেও থাকবে। যুক্তি প্রয়োগ এবং নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে  ন্যায্যতার পরিধি যেমন প্রসারিত হবে, তেমনি ধারণাটির তীক্ষ্ণতাও বাড়বে। 

এসব ঘটনাকে শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া বা একপেশে মনোভাবে যাচাই করা বা কারো প্রশংসা বা নিন্দা করার বিষয় হিসেবে দেখলে তা আরও বড় ধরনের মারাত্মক বিপর্যয় বহন করে আনবে যা সকলের পক্ষে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। কোন একটা অন্যায় সবখানেই ন্যায়ের জন্য বিপদস্বরূপ। অন্যায় শুধু আমার জানাশোনা পরিসরে বিদ্যমান থাকবে এমনটি আশা করা কখনও ন্যায় সঙ্গত নয়। একটা অন্যায়ের দৃষ্টান্ত শত অন্যায়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। নৈতিকতা বিবর্জিত একটা সমাজ কল্পনাও করা যায় না।

সরকারি দুটি সংস্থার উচ্চতর পর্যায়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যদি রাষ্ট্রের অন্য সংস্থার কাছ থেকে আইনগত বা নৈতিক সুরক্ষা না পায় তাহলে প্রজাতন্ত্রের সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা জনগণের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার সহায়ক নয়।

আইনের শাসন বিদ্যমান না থাকলে, গণতান্ত্রিক, মানবিক, নৈতিক ও সংস্কৃতি চর্চা না থাকলে শুধু দেশের জনগণ নয় সবাই যে অনিরাপদ এবং মর্যাদা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে তা রাষ্ট্রের সকল পক্ষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। নিজেকে রক্ষা করার যে ন্যূনতম সংস্কৃতিটুকু থাকা দরকার তা আজ আমাদের বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও নৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করে আমাদের  রাষ্ট্র সামনের দিকে এগোতে পারবে না। আমাদেরকে গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, সমতা ও স্বাধীকারকে প্রণোদিত ও উৎসাহিত করেই  মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করতে হবে।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত অমর্ত্য সেন তাঁর নীতি ও ন্যায্যতা বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন ১৭৮৯ সালের ৫ মে রাজনৈতিক দর্শনের পন্ডিত এবং সুবক্তা এডমন্ড বার্ক লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলেছিলেন 'একটি ঘটনা ঘটেছে এমন ঘটনা তা নিয়ে কিছু বলা কঠিন এবং চুপ করে থাকা অসম্ভব'।

ওয়ারেন হোস্টিং এর ইমপিচমেন্ট এর পক্ষে সওয়াল করতে বার্ক বলেছিলেন, তিনি ন্যায্যতার শ্বাশত বিধানগুলো লংঘন করেছেন এটাই তার মূল অপরাধ এবং সেই কারণেই এ বিষয়ে নীরব থাকা অসম্ভব। উৎকট অন্যায়ের অনেক দৃষ্টান্তই আমাদের এতটাই বিচলিত করে যে আমরা ক্ষোভ বা প্রতিবাদ জানানোর ভাষা খুঁজে পাই না অথচ চুপ করে থাকা অসম্ভব মনে হয়। তবু মানতেই হবে ন্যায্যতার বিচার করতে গেলে সুস্পষ্ট ভাষায় যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ছাড়া অন্য উপায় নেই।

এডমন্ড বার্ক ওয়ারেন হেস্টিংসকে অভিযুক্ত করেছিলেন এবং কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন ভারতের উদীয়মান ব্রিটিশ শাসনকেও। এই অভিযোগের সমর্থনে বার্ক পেশ করেছিলেন এক নয় একা্ধিক স্বতন্ত্র যুক্তি: আমি শ্রীযুক্ত ওয়ারেন হেস্টিংসকে গহির্ত এবং অসাদাচরণের এর দায়ে অভিযুক্ত করছি।

আমি পার্লামেন্টে সমবেত গ্রেট বৃটেনের নাগরিকদের প্রতিনিধিমন্ডলীর আশা ভঙ্গ করার অভিযোগে পার্লামেন্টের নামে তাঁকে অভিযুক্ত করছি।

আমি গ্রেট বৃটেনের সমস্ত নাগরিকের জাতীয় চরিত্র কে অসম্মানিত করার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করছি।

আমি ভারতের মানুষের নামে তাকে অভিযুক্ত করছি কারণ তিনি তাদের বিধি অধিকার এবং স্বাধীনতা খর্ব করেছেন, তাদের সম্পদ ধ্বংস করছেন এবং তাদের দেশভূমির ক্ষতি সাধন করেছেন।

তিনি ন্যায়ের যে শাশ্বত বিধান গুলোকে লঙ্ঘন করছেন তাদের নামে এবং তাদের ভিত্তিতে আমি তাকে অভিযুক্ত করছি।

তিনি নির্মমভাবে স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে বয়স, পদমর্যাদা, পরিস্থিতি এবং জীবনের অবস্থা নির্বিশেষে মানবিকতার লাঞ্ছনা করেছেন তাকে আঘাত করেছেন তার উপর অত্যাচার করেছেন তাই মৌলিক মানবিকতার নামে আমি তাঁকে অভিযুক্ত করছি।

 নৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা  এবং গভীর মানবিক সংস্কৃতিমনস্ক সমাজের আশায় আমাদের আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক :গীতিকার

faraizees@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers