মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ , ৪ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

কক্সবাজার টু ভাসানচর

শহীদুল্লাহ ফরায়জী ৮ ডিসেম্বর , ২০২০, ১১:২১:২৯

  • কক্সবাজার টু ভাসানচর

এখনো বাংলাদেশে শরণার্থী আসছে, এই শরণার্থী আসার অবারিত সুযোগ আর কত কাল অব্যাহত থাকবে। গত মে মাসেও অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দুই দফায় নারী-শিশুসহ ৩০৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্য দেশে প্রবেশে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশে নিশ্চিন্তে ঢোকা যায়। এতে করে রাষ্ট্র উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে পড়েছে এবং জাতীয় বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারপরও কি শরণার্থীর প্রশ্নে সীমান্ত বন্ধ করা উচিত নয়?

এই ‘সীমান্ত খোলা’ নীতি বিশ্বের কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের কি আছে? আমরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রের যে সীমানা অর্জন করেছি, সেই সীমানা অন্য দেশের নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারি না। বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে আমরা নির্দয় রাজনৈতিক খেলা খেলতে পারি না। অস্তিত্বের প্রশ্নে আমাদের ‘সীমান্ত খোলা’ নীতি বন্ধ করা জরুরি মৌলিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজার আশ্রয় শিবির থেকে ভাসানচরে পৌঁছেছে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একটি অংশ।

জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন কেউ রোহিঙ্গাদের  ‘স্থানান্তর’ বা ‘স্থায়ী আবাসন’ নির্মাণের প্রয়োজনই বোধ করেনি বা প্রস্তাবনা উত্থাপন করেনি, বরং তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নান্দনিক প্রকল্প গ্রহণ কি ‘জরুরি’ ছিল? সরকারের কাছে ভাসানচর প্রকল্প কেন অগ্রাধিকার তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠলো তা জাতির জানার অধিকার রয়েছে। শরণার্থীদের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বাংলাদেশের একার নয়।

শরণার্থীদের মানবিক দিকগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের অভিমতের বাইরে গিয়ে  সরকারের সুস্পষ্ট ‘একক নীতি’ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কি সংযোগ সৃষ্টি করবে?

শরণার্থীদের এক লাখ ভাসানচরে আর দশ লাখ কক্সবাজারে- এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র আরো ‘অনিয়ন্ত্রিত’ ঝুঁকিতে পড়েছে। ভাসানচর আবাসন যদি শরণার্থীদের জন্য ‘বৈধ মানদণ্ড’ হয় তাহলে কক্সবাজারে অবস্থানরত শরণার্থীদের মানবেতর অবস্থান ‘অমানবিক’ কাজ হিসেবে চিহ্নিত হবে। মনে হয় এসব গুরুতর প্রশ্ন সরকার বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে কক্সবাজারের জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং ভূমিধসসহ যেকোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই কারণে সরকার জরুরিভাবে ভাসানচরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দ্বীপটির উন্নয়নে সরকার ৩৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।

১১ লাখ শরণার্থী অবস্থান করছে কক্সবাজার-টেকনাফের শিবিরগুলোতে। ১ লাখ শরণার্থী ভাসানচরে নিয়ে গেলেও জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলো ফাঁকা হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারপরও কক্সবাজারের পরিবেশ ঝুঁকি সৃষ্টি করার জন্য অবশিষ্ট ১০ লাখ শরণার্থীই যথেষ্ট।

বরং কক্সবাজারে অবস্থানরত শরণার্থীর মাঝে এ অসমতার জন্য বড় ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে। একই দেশে শরণার্থীদের দুই ধরনের নীতি বড় বিপর্যয়ের ‘উৎস’ হয়ে উঠতে পারে।

শরণার্থী ইস্যু বৈশ্বিক। শরণার্থী সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের অনেক ধনী দেশ। দারিদ্রতার কারণে এশিয়া আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষ শরণার্থী হিসেবে অভিবাসন প্রত্যাশী হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে শত শত অভিবাসী প্রাণ হারাচ্ছে। আর কোনোভাবে ইউরোপের দেশগুলোতে ঢুকতে পারলেও তাদের পরিণতি  হচ্ছে খুবই বেদনাদায়ক, তাদের ঠাঁই হচ্ছে বন্দি শিবিরে নতুবা বনজঙ্গলে। তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশ অভিবাসীদের সমুদ্র পথে পুশব্যাক করছে যা খুবই অমানবিক। হাজার হাজার শরণার্থী ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে উত্তর ফ্রান্সে আটকা পড়েছে। তীব্র শীতে জঙ্গলে ব্রিজের নিচে মানুষকে রাত কাটাতে হচ্ছে অথচ শহরে ঢুকতে দিচ্ছে না। ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বসনিয়ার জঙ্গলে বাংলাদেশের মানুষ অবস্থান করছে, তাদের সঙ্গে কোনো মানবিক আচরণ করা হচ্ছে না।  

আর বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ১৩ হাজার একর জমির ওপর চমৎকার হ্রদ, যথাযথ অবকাঠামো, আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ‘অস্থায়ী’ রোহিঙ্গাদের জন্য ‘দৃষ্টিনন্দন’ স্থায়ী আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়াই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার।

আমাদের চেয়ে হাজার গুণ উন্নত  পশ্চিমী দুনিয়ার কেউ সাহস করে শরণার্থীদের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে স্থায়ী বাসস্থান এর উদ্যোগ নিতে পারেনি।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন চুক্তি হয় ২৩শে নভেম্বর ২০১৭। প্রথম প্রত্যাবাসনের তারিখ ছিল ১৫ই নভেম্বর ২০১৮, প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় তারিখ ছিল ২২শে আগস্ট ২০১৯।

একদিকে প্রত্যাবাসন চুক্তি এবং প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ অন্যদিকে স্থায়ী আবাসনের প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কী বার্তা প্রদান করা হয়েছে?

যদি বিশ্ব রাজনীতির কারণে রোহিঙ্গারা এখনই ফিরে যায় তাহলে ভাসানচরের আধুনিক আবাসন প্রকল্পের কী পরিণতি হবে!

সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের প্রস্তাবে আঞ্চলিক রাষ্ট্রের সমর্থন হারিয়েছে। এবার ভাসানচর ইস্যুতে জাতিসংঘসহ দাতা সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনসমূহের সঙ্গে সরকার মনোমালিন্য বা বিরোধে জড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশের সফলতা কী সেটা পর্যালোচনা করা খুবই প্রয়োজন। ভাসানচরে রাষ্ট্রের এতো বিপুল অর্থ খরচ করেও সরকার আন্তর্জাতিক মহলের মন জোগাতে পারেনি।

এতো বড় দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিবৃতি দিয়ে সরকারের ‘প্রকৃত প্রচেষ্টা’কে দুর্বল বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করার জন্য সবাইকে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ অবলম্বন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।  বিশ্বের কেউ সরকারের ‘প্রকৃত প্রচেষ্টা’কে অনুধাবন করতে পারছে না। রাষ্ট্রকে মানবিক কাজ করেও  আহ্বান জানাতে হচ্ছে ‘সর্বোচ্চ সর্তকতা’ অবলম্বন করতে। রাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থায়নে এতো বড় স্থায়ী আবাসন স্থাপনের পরও সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য বিবৃতি দিতে হলো, এসব যে জাতির জন্য অসম্মানজনক তা সরকারের উপলব্ধিতেই নেই।

 সরকার যেহেতু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য খুবই সংবেদনশীল এবং উদার সেহেতু (১) নিজস্ব অর্থায়নে সরকারকে বাকি ১০ লাখ শরণার্থীর জন্য ভাসানচরের মতো আধুনিক মানসম্মত স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, (২) বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে আরো ১ লাখ ৩০ হাজার একর (১৩০০০ক্ম১০) জমি চিহ্নিত করতে হবে, এবং (৩) রোহিঙ্গা শরণার্থী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সকল শরণার্থীর জন্য সমতা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ভাসানচর প্রকল্পটি যদি জাতিসংঘ বা দাতা সংস্থার সাহায্যে এবং পরিকল্পনায় সম্পন্ন করা যেতো তাহলে সরকারকে এতো বড় দায় বহনের ঝুঁকিতে পড়তে হতো না।

ইতিমধ্যে মিয়ানমার সরকার রাখাইন থেকে মুছে ফেলেছে রোহিঙ্গাদের বাস্তুভিটার শেষ চিহ্নটুকু। সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশালতর অর্থনৈতিক অঞ্চল। সাগর তীরবর্তী রাখাইন-আরাকানে স্থাপিত হচ্ছে বিশাল বিশাল শিল্প কারখানা আর বাণিজ্যিক স্থাপনা। সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বিলাসবহুল হোটেল। এশিয়া অঞ্চলের দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র রাখাইনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করছে।

আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তিদ্বয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দিয়ে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করিয়েছে। এখন রোহিঙ্গাদের ভূমিতে সেই শক্তির কার্যসিদ্ধি হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এমনিতেই আমরা বিপর্যস্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে রয়েছি, তারপরও সরকার অদূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আরো ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যে সকল শরণার্থী ভাসানচরের চেয়ে মিয়ানমারে দুর্বল অবস্থায় ছিল তারা নিশ্চয়ই এই নিশ্চিত ‘আধুনিক বাসস্থান’ ছেড়ে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইবে না। তখন আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠবে জোর করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। শরণার্থী ইস্যুতে দেশ আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষাতে চরম ঝুঁকিতে। নানামুখী ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তরিক এবং মানবিক হয়ে ভাসানচরের মতো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারলো কিন্তু বাংলাদেশের গৃহহীন ছিন্নমূল নদীভাঙ্গা উদ্বাস্তু মানুষের জন্য কেন এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে পারলো না। সরকার বাংলাদেশি গৃহহীনদের জন্য কৃত্রিম হ্রদসহ শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধমূলক বাসস্থান কেন করে দিতে পারলো না তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই নাগরিকদের আছে।

বিশ্বে এখনো যেহেতু রাষ্ট্রের অবস্থান আছে, সীমানা আছে, কাঁটাতার আছে সুতরাং সরকারকে নিজ রাষ্ট্রের জনগণকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সরকার হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। নিজ দেশের মানুষের ক্রন্দন ও হাহাকার সবার আগে শুনতে হবে।

সুতরাং প্রজাতন্ত্রের জনগণের প্রতি সরকারকে আরো মানবিক হতে হবে, আরো সংবেদনশীল হতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আঞ্চলিক পরাশক্তির রাজনীতি ও আমাদের অপরিণামদর্শিতার জন্য জাতিকে যেন চরম মূল্য দিতে না হয়।

কমালা হ্যারিস বলেছেন, সত্যকে ছড়িয়ে দাও। সত্য বলা আর সত্য ছড়িয়ে দেয়ার মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। সত্য ছড়িয়ে দেয়া মানে জোর গলায় বলা, সবার কাছে পৌঁছে দেয়া। যেখানে সত্য কথাটা বলা অস্বস্তিকর, সেখানেও বলা। আমাদের সত্য কেবল আড়াল হয়ে যায়। চলুন আমরাও সত্য কথাটা সবার কাছে ছড়িয়ে দেই।

লেখক: গীতিকার

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers