সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮ , ১০ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ইন্দো-প‌্যাসিফিক জোনে বাংলাদেশকে পা ফেলতে হবে সাবধানে

রেজা ঘটক ১৪ অক্টোবর , ২০২০, ১৩:৫৮:২৭

  • ইন্দো-প‌্যাসিফিক জোনে বাংলাদেশকে পা ফেলতে হবে সাবধানে

মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন এডওয়ার্ড বিগান তিন দিনের সফরে আজ ঢাকায় আসছেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গেও স্টিফেনের বৈঠক হবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এর বাইরে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় করবেন।   

মার্কিন মন্ত্রী'র সফরকালে দুই দেশের আলোচনায় ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি, রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান ও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। অন্যান্য বিষয়গুলো আলোচ্য সূচিতে থাকলেও মার্কিন মন্ত্রীর প্রধান টার্গেট হবে ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক জোনে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা। আর এজন্য বাংলাদেশকে তারা ৪ কোটি মার্কিন ডলার দেবে বলে ইতোমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

ইন্দো-প্যাসিফিক জোনে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে বিষয়টি সম্পর্কে একটু ভালো করে জেনে নেওয়া যাক। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ভারত মহাসাগরে মার্কিন নজরদারী ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভারত মহাসাগরকে অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়া-প্যাসিফিককে সম্প্রসারণ করে এর নাম দিয়েছিলেন ইন্দো-প্যাসিফিক। আর পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মার্কিন সামরিক থিয়েটার প্যাসিফিক কমান্ডের নামকরণ করেছিলেন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড।

মূলত ভারত মহাসাগরে চীনের একচ্ছত্র প্রাধান্যকে টেক্কা দিতেই পেন্টাগন চার দেশের সাথে একটি সামরিক কৌশলগত স্ট্র্যাটেজির পরিকল্পনা করেছিল ওবামা প্রশাসন থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে এই ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক জোন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই মার্কিন সামরিক কৌশলকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবার কৌশল হিসেবে ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক জোনে এখন বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। 

এশিয়াতে সামরিক মনোযোগের লক্ষ্যে ওবামার আমলে রি-ব্যালেন্সিং কৌশল নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির দিকে আরো মনোযোগ দেয় পেন্টাগন। বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনের সামরিক আধিপত্য বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে অধিক মনোযোগী হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হলে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি আরো জোরদার হবে। তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বিজয়ী হলে নিরাপত্তা নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয় সেটা এখনও সুস্পষ্ট নয়।

এর আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগকে (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে গঠিত) চাঙ্গা করতে এবং ভারত মহাসাগরে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে খর্ব করার জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে নতুন কৌশল নিয়েছে পেন্টাগন। কারণ এসব দেশ চীনের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্থানকে হুমকি বা উদ্বিগ্ন হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের উত্থানকে টেক্কা দিতেই এই জোট শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল। এই অঞ্চলে এই জোটের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি মানে তা চীনের জন্য হুমকি এবং ভারত মহাসাগরে নয়া উক্তেজনা তৈরি করবে। যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টির পাশাপাশি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার পেছনে রয়েছে আরেকটি জোড়ালো কারণ। সেটি হল- মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল নেবার জন্য আরব সাগর থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে সোজা অস্ট্রেলিয়া ও জাপান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাবার রুট শক্তিশালী করা। মাঝখানে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশকে নানান কিসিমের টোপ দিয়ে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করাতে পারলে বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। চীনের সাথে ভারতের সাম্প্রতিক সীমান্তে সংঘর্ষ ও বৈরি সম্পর্ককে পুঁজি করে মার্কিন কৌশলে তাই নতুন মোড় নিয়েছে। ইতোমধ্যে ইসরাইল ও ভারত সামরিক চুক্তি করেছে। আবার পাকিস্তানের উপর থেকে মার্কিন সমর্থন ধীরে ধীরে যতটা শীথিল হচ্ছে, তার বিপরীতে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক তত উন্নত হচ্ছে। ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই কোয়াডে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ খুব স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাংলাদেশকে যে কোনো কৌশলে হাত করতে পারলেই মার্কিন স্ট্র্যাটেজি অনেকখানি সফল হবে। 

অন্যদিকে কোয়াডভুক্ত চার দেশের (যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-ভারত) সাথেই চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার রয়েছে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চীনের বাজার তাদের জন্য ক্রমবর্ধমান হারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অ্যাপেল, জেনারেল মোটর্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন ৫০০ প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর কারখানা ও বাজার এখন চীনে অবস্থিত।

বিশ্ব অর্থনীতির দুই জায়ান্টের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণেই ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর কিছু খারাপ সিদ্ধান্তের কারণে চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেকটাই ডুবতে বসেছে। ভোক্তা মূল্য বাড়ছে, কৃষকরা দেউলিয়া হচ্ছে, দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব পণ্যের ওপর করারোপ করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো এশিয়ান দেশের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোই তৈরী করে। এই প্রেক্ষাপটে কোয়াডের পুনর্জীবন মার্কিন অর্থনীতির জন্য, বিশেষ করে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে বিপর্যয়কর হতে পারে। কারণ করোনা মহামারীর শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে চীনের যে বৈরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য হোয়াইট হাইজ এখন নতুন কৌশল নিয়েছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকাকে এই কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করতে তারা আগ্রহী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় কোয়ার্টারে মার্কিন অর্থনীতি ৩০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। যা ২০২০ সালে অন্তত আরো ৮ ভাগ কমতে পারে। এর বড় একটি কারণ হলো চীনের সাথে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং করোনা মহামারী যথাযথভাবে সামাল দিতে না পারা। এর আগে অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত অবস্থায় রেখে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হতে পারেননি। তাই আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হতে এই কোয়াডের ফসলকে বড় করে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর তার অংশ হিসেবেই মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন এডওয়ার্ড বিগানের এই বাংলাদেশ সফর। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা মহামারীর জন্য সবসময় চীনকে দায়ী করলেও এর বিস্তার ঠেকাতে তিনি কাজ করেছেন খুবই সামান্য। চীনা প্রযুক্তি হত্যার চেষ্টার ফলে আকর্ষণীয় চীনা বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ফ্রন্টে চীনকে আক্রমণ করার ফলে আমেরিকার স্বার্থ ইতোমধ্যেই অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া ট্রাম্প কল্পনাও করতে পারেননি যে চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সামরিক জোট গঠন কতটা বিধ্বংসী হতে পারে। এ কারণেই সম্ভবত ৬ আগস্ট চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে শান্তি আলোচনার জন্য ৯০ মিনিটের টেলিফোন সংলাপে বসতে ট্রাম্প তার প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ী হতে এখন নিশ্চিতভাবেই চীনের সাথে সাময়িকভাবে একটা যুদ্ধবিরতি চান ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের কোয়াড অংশীদারেরা সম্ভবত একই বিষয় ভাবছে যে, কেন তারা পেন্টাগনের কথিত হুমকির কারণে তাদের নিজেদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে? বা কেন মার্কিন চাপের কাছে তারাও কৌশলগত কারণে নতি স্বীকার করবে? তাছাড়া চীন কখনো এমন ইঙ্গিত দেয়নি যে তারা এই কোয়াডের কোনো সদস্য দেশের ওপর সামরিকভাবে হামলা চালাবে। বরং কেউ যদি পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের ভূখণ্ডগত ও হিমালয়ের বিরোধগুলোর ওপর তীক্ষ্ণভাবে নজর দেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে চীন সম্ভবত অতটা খারাপ ছেলে নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ২০১২ সালে ‘পাইভোট টু এশিয়া’ ঘোষণা করার আগে পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কখনোই কোনো সমস্যাই কোনোকালে দেখা যায়নি। ওই একই বছর জাপান সরকার তার ‘জাপানি মালিকদের’ কাছ থেকে দিয়ায়ু/সেনকাকু আইল্যান্ডস কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকেই চীন ও জাপানের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ভারত-চীনের সীমান্ত সমস্যার কারণ লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) যথাযথভাবে নির্ধারণ না করা। এখানে উভয় দেশেরই আলাদা আলাদা চিহ্নিত এলাকা রয়েছে।

‘জ্ঞাতির সম্পর্ক’ ছাড়া অন্য কোনো কারণ না থাকলেও ওয়াশিংটনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার গাটছড়া বাঁধা অদ্ভূত বিষয়। চীন যদি এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার রফতানি বন্ধ করে দেয়, চীনা ছাত্র ও পর্যটক পাঠানো বন্ধ করে দেয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়া কৌশলগত কারণে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হবে। এই দুটি খাতে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির ৪০ ভাগ চীন নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া চীনের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সীমার মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ লোক প্রধান প্রধান নগরীতে বসবাস করায় সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ ও অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরীতে চীনের হামলা থেকে কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবে না অস্ট্রেলিয়া। ফলে চীনকে তার স্থানে আটকে রাখার বদলে চীন-কোয়াড যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া নিজেকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেখতে পাবে।

অন্যদিকে জাপানের শিনজি অ্যাবে সরকার ও তার ডানপন্থী সমর্থকেরা হয়তো কোয়াড চাঙ্গা করতে চাইবে, কিন্তু জাপানের বেশির ভাগ লোক তা নাও চাইতে পারে, বিশেষ করে দেশটির ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ক্রমহ্রাসমান অর্থনীতি ও বৃদ্ধ জাপানি লোকসংখ্যা বেশি থাকার কারণে জাপানের আর্থিক নির্ভরতার জন্য চীনের বাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান সম্পদশালী জনসংখ্যা ও ব্যাপকভিত্তিক অবকাঠামো ব্যবস্থা জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারাখানা ও বাজার উভয়টির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

জাপানের ভূমি অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় এবং এর লোকজন মাত্র কয়েকটি নগরীতে সীমাবদ্ধ থাকায় কোয়াড জাপানের জন্য আরো কম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে। চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাপান কতটা টিকতে পারবে তা অবশ্য ভিন্ন বিষয়। কারণ সেক্ষেত্রে জাপান ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম শিকার হতে পারে। ফলে কোয়াডে শেষ পর্যন্ত জাপান কতোটা যুক্ত থাকবে সেই প্রশ্ন এখন পর্যন্ত রহস্যময়। 

আবার ভারতের জন্য কোয়াডে অংশগ্রহণ একইভাবে অযৌক্তিক হতে পারে। কারণ ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের তুলনায় ছোট। আবার বর্তমানে ভারতের অর্থনীতি করোনা মহামারীর তীব্র ছোবলে এক গভীর মন্দাকাল পাড়ি দিচ্ছে। ফলে চীনকে মোকাবেলার জন্য ভারত এই মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ অর্থ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় করতে পারবে না। তাছাড়া ভারতে যে পরিমাণ গোলাবারুদের মজুদ আছে, তা দিয়ে ছয় মাসের বেশি চলবে না। রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা গুটিকয়েক জেট ছাড়া ভারতের বেশির ভাগ অস্ত্রই অনেকটা সেকেলে। তাছাড়া কৌশলগত কারণে তখন চীনের পক্ষে পাকিস্তানও যোগ দিতে পারে। ভারতের পক্ষে যেখানে এক ফ্রন্টে লড়াই করাই কঠিন। সেখানে দুই ফ্রন্টে লড়াই করা ভারতের জন্য হবে ভয়ংকর প্রাণঘাতী। ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক কোয়াডে ভারত শেষ পর্যন্ত মার্কিন স্ট্র্যাটেজি থেকে নিজেরাই পিছিয়ে যেতে পারে। 

ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক জোনে মার্কিন সামরিক কৌশলের অপর তিন অংশীদার জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র খুব শক্তভাবেই যে দলে ভেড়াতে পারবে তেমন কোনো গ্র্যান্টি নাই। যে কারণে ভারত মহাসাগর এলাকায় চীনকে টেক্কা দিয়ে মার্কিন সামিরক জোট খুব একটা সফল হবে না। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক জোটে মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান দৌঁড়ঝাপ ট্রাম্পকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আনার একটি অন্যতম প্রধান কৌশল। আর সেই কৌশলে বাংলাদেশকে সকল বিবেচনায় জেনে-বুঝেই মার্কিন ফাঁদে পা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে- ভূ-রাজনৈতিক কারণে এবং বাণিজ্য সুবিধার অংশ হিসেবে চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম অংশীদার। চীনের সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট হয় এমন কোনো মার্কিন কৌশলে বাংলাদেশ জড়ালে বা মার্কিন সামরিক জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে চীন মোটেও ভালো নজরে দেখবে না। 

বর্তমানে চীন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। পদ্মা সেতু ছাড়াও বহির্সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীন যদি একবার পিছু হাঁটে তাহলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য মরার উপর খরার ঘা। তাই মার্কিন প্রশাসনের ৪ কোটি ডলারের লোভের ফাঁদে বাংলাদেশকে খুব কৌশলে পা দিতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা- ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক জোটে নতুন করে মার্কিন দৌঁড়ঝাঁপ ট্রাম্পকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আনার প্রচেষ্টা স্বরূপ। খোদ মার্কিন সরকার চীনের সাথে এই মুহূর্তে কোনো ধরনের সামরিক যুদ্ধে জড়াতে চায় না। সেখানে বাংলাদেশ কৌশলে কোনো ভুল করলে চীনের সাথে আমাদের বন্ধুত্বে যে ফাটল ধরবে, তা কাটিয়ে ওঠা হবে বড়ই বেদনাদায়ক। ফলে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন এডওয়ার্ড বিগানের ঢাকা সফরকে খুব কৌশলেই মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে। কৌশলে কোনো রকমের ভুল হলে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সাম্প্রতিক অংশগ্রহণে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক

বি দ্রি: (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers