বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ১ আষাঢ় ১৪২৮ , ৫ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

বাবা কেন বোবা?

মো: ইসহাক ফারুকী ২১ জুন , ২০২০, ১০:৫৬:৩০

  • বাবা কেন বোবা?

বোবা! একটা এ-কার যুক্ত করে দিলেই বাবা বোবা হয়ে যান। এই এ-কার এর মূল্য তাই অনেক। যখনি প্রয়োজন পড়ে, বাবা নামক অতি অসহায় ( ক্ষেত্র বিশেষে সম্পর্কহীন-সে তথ্য নাইবা দিলাম) মানুষটি এ-কার যুক্ত করে বোবা হয়ে বসে থাকেন। থাকেন আশেপাশেই কিন্তু টু-শব্দটি করবেন না। 

পুর্বের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বাবার ভয়ে পুত্র-কন্যা হইতে পাতিহাঁস-সকলেই থরথরি কম্পমান। অতি ভয় বা আতংক; যাই বলি না কেন? এ যেন যুদ্ধের দামামা বাঁজা। তৎকালীন বাবারা রাগ পুষে রাখতেন যক্ষের ধনের মতোন। হুংকারে বাঘও ভয় পেয়ে মোষের সাথে এক ঘাটে পানি পান করতো। সন্তান থাকতো দুধে-ভাতে কিংবা কেউ কেউ অর্ধপেটে। তবে শাসন বলি, ভাষণ বলি-বাবাকূল; তা সে যেই বিত্তের হোন না কেন? নাকের ডগায় যেন ছিল তাদের বেজায় রাগ। সন্তানকে শাসনে না রাখলে উচ্ছন্নে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। মায়েদের সাথে ‘ওগো শুনছো, তোমার সন্তানের কান্ডটা দেখেছো?’-এই বলে হয় বেদব্যাসের মহাভারত নাহয় হোমারের ইলিয়াড-ওডেসি শুরু হতো। সন্তান কাঠ হয়ে দেয়ালের পাশে দাড়িয়ে  টেবিলের শিরা-উপশিরা গুনতো; পরবর্তীতে শহর থেকে আনা বইয়ের পাতায় নিজেদের মন ও মানসিকতাকে লুকাতো। 

বাবা বলে ডাকতে গলার স্বর এতোটাই খাদে নেমে যেত যে, সাড়াশি দিয়ে এই স্বর টানাই অবান্তর ছিল। খেলার সাথী নির্বাচন থেকে শুরু করে বিদ্যার্জন-সব কিছুতে বাবারাই বলতেন। সন্তানের কাজ শুধু ‘জো আজ্ঞা জাহাপনা’ বলে পালন করা। একে অনেক স্বেচ্ছাচারী পরাধীনতা বলে চালাতেন। পিতৃ-স্বৈরাচার জীবন যেন অসহনীয়; তবুও অনেকেই একে মায়াজাল বলে উল্লেখ করেছেন। বাবারা শাসন করতেন, কিন্তু তাই বলে আদর কি একেবারেই অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গিয়েছিল। তা নয়। বাবাদের মনে ভয়-আতংক কাজ করতো-সন্তান যেন বখে না যায়। খারাপ সংসর্গকে অবলম্বন করে না নেয়। বাবা হওয়াতে জ্বালা-এই মন্ত্র মনে মনে উচ্চারণ করতে গিয়ে কঠোর হতে হয়েছে। তবে কোমলতা যেন মায়ের জন্য বরাদ্দ ছিল। 

সময়ের বিবর্তনে বাবারা নিজেদের শাসনকে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলেছেন। আদরকে উচ্চে স্থান দিতে গিয়ে নিজের সঙ্গে এ-কার যুক্ত করেছেন। তাই অনেক ক্ষেত্রেই বোবা হয়ে থাকতে হচ্ছে। বাবারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। সন্তানের চাহিদা ও প্রাপ্তির সংমিশ্রণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। অর্থ বানানোর যন্ত্রতে পরিণত হওয়ার যন্ত্রণা ভোগ করছেন। সন্তানকে ঘুমে রেখে চলে যান নিজের অর্থস্থলে; ফেরেন সন্তানের ১ ঘুম শেষ হওয়ারও পর। শুধুমাত্র ছুটির দিনে দেখা হয়, খোঁজ-খবরের ঝাঁপি নিয়ে বসা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌরাত্ব্যে সন্তানের সময় কোথায়? হাঁ-হুঁ করেই আর কাহাতক বাতচিৎ চালানো যায়? সময় আজ অসময়ের হাতে বন্দি। বাবা নামক অসহায় হোমোসেপিয়েন্স আজ মার খাচ্ছেন একটু সুচিন্তিত অস্থিরতার হাতে। প্রযুক্তি দখল করে নিয়েছে আবেগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে পুঁজি করে সাধারণের কাছ থেকে পুজিঁবাদী অসামাজিকতা নিংড়ে নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। বাবাদের মুখ বন্ধ করতে এ-কার বসিয়ে দিচ্ছে। 

মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত শান্ত কেন মাস্তানের মতো প্রশ্ন তৈরি করছে বাবা কেন বোবা? আসলেই তো। বাবাদের কী বোবা হওয়া সাজে? কাজ অনেক হচ্ছে, হবে। কিন্তু বের হোক না কিছু সময়-সন্তানকে বোঝার, জানার বা বোঝানোর। কাজ ও সন্তান লালনের সম্মিলন ঘটাতে হবে। এ শুধু স্ত্রী বা মায়ের সম্পদ নয়; এ পরিবারের। আর পরিবারে বাবাকে বোবা হলে হবে না। বাবাই হতে হবে। যারা বাবা হয়েছেন, যারা হচ্ছেন, যারা হবেন-তারা কী ভেবে দেখছেন? যুগ পাল্টেছে। কিন্তু সন্তান মানুষ করার নিয়ত পাল্টেছে কি? নিয়ম করে বোবা হওয়ার অনিয়ম ভেঙ্গে সন্তানের সাথে সুন্দর ও মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বাবা-সন্তান জুটিকে সেরা হওয়ার প্রয়াস নেওয়ার সময় এখনি। কথায় আছে না, সোহাগ করা তারই সাজে, শাসন করে যে। পরিবারে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষাটা শুরু হোক-বাবা আর এ-কার ব্যবহার করবেন না। 

তিনি বোবা নন। তিনি সন্তানের আর্থিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মানবিক বিকাশে একজন সহায়ক মানুষ। একজন রোল মডেল। বাবা দিবস একদিনের নয়। প্রতিদিনের। বাবার গল্প প্রতি মুহুর্তের। রক্তের সন্তান বা আত্মার সন্তানের জন্য বাবাদের গোপন অস্থিরতা ও হাহাকার আর না জমুক। সন্তানের স্পর্শের বাইরে না থাকুক বাবাদের হাত। ছোটবেলার কনে আঙ্গুল আলতো করে ধরে রাখার পঙতিগুলো বড়বেলায় মুঠোর চাদরে মুড়ে যাক কবিতা হয়ে। ভাল থাকুক বাবারা; যারা আছেন। যারা নেই। ভাল থাকুক সন্তানেরা; যাদের বাবা আছেন, যাদের বাবা নেই, যারা বাবা হবেন, যারা বাবা হয়েছেন। কারণ, ঘটনার পুনরাবৃত্তিই তো বাবাদের রোজনামচা।    

লেখক: মো: ইসহাক ফারুকী। সাংবাদিক, পরিবেশ কর্মী, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিশ্লেষক।

নিউজজি/ এস দত্ত

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers