বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ১ আষাঢ় ১৪২৮ , ৫ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

করোনা: বিপন্ন মানবতা

শহীদুল্লাহ ফরায়জী ১৫ জুন , ২০২০, ১৮:০৯:০৭

  • করোনা: বিপন্ন মানবতা

করোনা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার সর্বগ্রাসী এক ভীতি, আর এর বিপরীতে মানুষকে প্রমাণ করতে হচ্ছে মানবিক অনুভূতির অতলতা ও ব্যাপকতার সামনে করোনা নগণ্য। মানুষের উচ্চতম মূল্যবোধ দিয়েই করোনাকে করুণা করতে হবে। করোনা সন্দেহ হলেই মাকে ফেলে দিতে হবে, বাবাকে ভুলে যেতে হবে, চিরকালীন মানবিক সম্পর্ক অস্বীকার করতে হবে, সমাজের এ চিত্র বড় নিষ্ঠুর। নশ্বর মানুষের জন্য এসব কাজ জঘন্য ও চরম লজ্জার।

অন্যদিকে করোনায় মৃত্যু বরণ করলে লাশ পড়ে থাকবে অবহেলায় রোদে, বৃষ্টিতে। আর কবরস্থানে লাশ দাফন করতে বাধা সৃষ্টির মত ভয়ঙ্কর এবং ঘৃণ্য কর্মকান্ডও ঘটছে। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র এ সব ভয়ঙ্কর অমানবিক কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধ না করে নিরবে মেনে নিচ্ছে যা প্রশ্রয় দেয়ার নামান্তর। সমাজের চারিদিক আইনের অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিভাবকত্ব এবং রাষ্ট্রশক্তির প্রতিনিধি রুপে স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিষ্ঠানই এসব ঘৃণ্য কাজ মোকাবেলা করার কোন উদ্যোগই নিচ্ছে না। এসব কাজ যে মানবতাকে পদদলিত করার ঘৃণ্য কৌশল এবং যারা এই নিষ্ঠুর ভয়ঙ্কর কাজে যুক্ত তারা যে আইনের কোন অনুকম্পা লাভ করতে পারবে না তা আমরা প্রকাশ করতে পারিনি।

এসব ঘৃণ্য কাজ যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এ সব থেকে বিরত থাকার জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করার উদ্যোগ আমরা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোনভাবেই নেইনি। রাজনৈতিক কারণে সাঁড়াশি অভিযান চিরুনি অভিযান কত কিছু পরিচালিত হয় আর মানবতা ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিতে আমাদের রাষ্ট্র অক্ষম। যেসব এলাকায় এসব জঘন্য কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে সেসব এলাকার বিবেকবান মানুষ, ছাত্র যুবক কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না সঠিক নির্দেশনার অভাবে।

এ ধরণের নিষ্ঠুরতা যে মানবসমাজের অস্থিমজ্জাকে বিদ্ধ করে ফেলছে তা আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র কেউই অনুধাবন করতে পারছেনা। এ সকল কাজ যে আত্মতৃপ্তির কাজ নয় বরং অভিশাপের তা আমরা বলতে পারিনি। মাকে ফেলে যাবার সংবাদ, মাটির দেহ মাটি পাবে না এ সংবাদ ব্যাপক মানুষের মনে কি বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে বা কি পরিমাণ হতাশার জন্ম দেয় আমরা কেউ তা উপলব্ধি করিনি। মাকে যখন ফেলে আসে মার মনে মানুষের এই জগত নিয়ে কি চিন্তার উদয় হয়-কি নির্মম পীড়ণ মাকে পিষ্ট করে ফেলে তা আমরা কেউ জানিনা।

এত নিষ্ঠুর এত নির্মম এত অমানবিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ যখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের নাগরিকদের কী বিরুপ ধারণাই না জন্মায়। তখন মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সরকারের অন্যায়ের অপশাসনের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করলেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির অজুহাতে গ্রেপ্তার মামলা হাতকড়া কারাগার নিশ্চিত হয়ে যায়। কথায় কথায় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে সরকার কতজন সাংবাদিক কতজন নাগরিককে এ যাবৎ গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে তা আমাদের জানা নেই। এখন যারা নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রদর্শন করে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বর্বর অমানবিক নিষ্ঠুর রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করে ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তখন সরকারের কাছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার কোন তাগিদই সৃ্ষ্টি হলো না।

লাশ দাফন করতে না দেয়ার মত গর্হিত কাজ, পুলিশের লাথিতে কৃষকের মৃত্যু এবং বিনা বিচারে মানুষের ক্রসফায়ারে রাষ্ট্রের মানহানি হয় না। অথচ মত প্রকাশ করলেই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।

মা'কে ফেলে দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা এখন রোল মডেল। অশ্রু বিসর্জন না করা এখন অধিকারে পরিণত হতে চলছে। মানুষ যদি ক্রমাগত অমানবিক নিষ্ঠুর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে সমাজ নরকের অন্ধকার গর্ভে নেমে যাবে। যে সমাজে সমবেদনা শুকিয়ে যাবে, মনুষ্যত্ব ধূর্ততায় রূপান্তরিত হবে সে সমাজ আর মানুষের থাকবে না। যে সমাজে বিবেকের জায়গা পশুত্ব দখল করে নেবে সে সমাজ নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনবে,, জীবনের পথ থেকে নিজেকে অনেক দূরবর্তী করে ফেলবে।

মানুষ জীবনের যে অধিকার নিয়ে জন্মায় সে অধিকারকে অবজ্ঞা করা যায় না, অসম্মানও করা যায় না। আর মানুষ যদি একবার পশুত্বের স্তরে নামতে শুরু করে সে নামতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আর তার আচরণ হয়ে পড়ে জড়পিন্ডের মতো। এই জড়ত্বই ক্রমাগতভাবে সকল মানবিক সত্তাকে গ্রাস করে ফেলে।

করোনার সর্বগ্রাসী ভীতি আমাদের মানবতা যেন অবরুদ্ধ করে না ফেলে। করোনায় আক্রান্ত হওয়া কোন অপরাধ নয়। করোনার ভয়ে যেন মানবতা ভীত না হয়। সন্তান বাবার পাশে থাকবে, ভাই বোনের পাশে থাকবে মানুষ মানুষের পাশে থাকবে। মানুষ অবিচ্ছেদ্য, মানুষ বিপুল সম্মানের। সমাজের জন্য প্রয়োজন মানবিক পরিবেশ। উন্নয়নের আকাশচুম্বী বিলাসী ভাবনা পরিত্যাগ করে মানবিক উন্নয়নের সহজ সরল স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করতে হবে। সমাজ যে ক্রমাগত অমানবিক ও অনৈতিক নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে তার দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। অপশাসন অপরাজনীতি অপসংস্কৃতি আমাদের ভিতরে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতার প্রতিধ্বনি অনুরণিত করছে, আমাদের ভিতর ভেঙ্গে তছনছ করে দিচ্ছে।

করোনার ভয়ংকরতার সময় আমরা যেভাবে ত্রাণ আত্মসাৎ করেছি এ সংস্কৃতির চূড়ান্ত রূপ এবং প্রবণতা নিয়ে আমরা কোন উদ্বেগ প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করছি না । কারণ আমরা সবাই লজ্জাহীনতায় ঢাকা পড়ে গেছি। মানুষের উদ্বেগ এবং আতঙ্ক যে প্রশমিত করতে হয় তা আমরা জানিনা। আমরা অন্ধকারের চেয়েও গভীরতর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি কিন্তু কেউ দেখতে পারছিনা।

আমরা একবারও ভাবছি না আমাদের জীবন প্রদীপ নিমিষেই নিভে যেতে পারে। এই মাটির নিচে আমার দেহ মিশে যাবে। ভালোবাসা মানবিকতা বিলিয়ে দিলে শেষ হয় না বেঁচে থাকা সার্থক হয়।

আমরা একবারও ভাবি না যে এখানে রাজপ্রসাদও থাকবে না কুঁড়েঘরও থাকবে না, সব বিলীন হবে। জীবন খুব ক্ষণস্থায়ী কিন্তু নিরর্থক বা লক্ষ্যহারা নয়।

মানবিকতা চিরতরে লুপ্ত করে দিলে সেটা মানুষের জীবন হয় না। জীবনের একটা ন্যায্যতা থাকতে হয়। অমানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানুষকে ক্রমাগত নিঃস্বার্থ ও পবিত্র করে তুলে। আমরা একটা নিষ্ঠুর বর্বর গাড়ল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারিনা। আমরা মানব ইতিহাসের আবর্জনা হতে চাই না।

বিশ্ব বিখ্যাত লেখক হাওয়ার্ড ফাস্ট বলেছেন পাথরও কাঁদে, যে বালির উপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাই তাও যন্ত্রণায় কাতরায় কিন্তু আমরা কাঁদি না।

লেখক: গীতিকার

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers