বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ , ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

নীতি ও ক্ষমতার বিপরীত স্রোত

​বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৩ জুলাই , ২০২৬, ২০:২৩:১৭

445
  • নীতি ও ক্ষমতার বিপরীত স্রোত

ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ আর সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে তাজউদ্দীন আহমেদ নিছক ইতিহাসের কোনো পুরোনো নাম নন; তিনি রাজনৈতিক সততা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞার এক বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড। ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ক্ষমতার কোলাহল এড়িয়ে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল রণকৌশলী হয়ে উঠেছিলেন, তা বুঝতে কোনো আবেগের প্রয়োজন পড়ে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়া এবং পরবর্তীতে কারাবন্দি অবস্থায় আইন ডিগ্রি অর্জনের সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল স্পষ্ট। ক্ষমতার হাতবদল মানেই স্বাধীনতা নয়; সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের অবসান না হলে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়।

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি রাজপথে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম মূল সংগঠক ছিলেন তাজউদ্দীন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সময় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। মুক্তি পেয়ে নিজেকে পুরোদমে সংগঠনের কাজে সঁপে দেন এবং ১৯৫৩ সালে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তৎকালীন প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীকে নিজ এলাকায় বিপুল ভোটে হারিয়ে তরুণ বয়সেই রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন তিনি।

১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফার আইনি ও অর্থনৈতিক ভিত তৈরির মূল রূপকার ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ। ৬ দফার মূল পুস্তিকা ‘আমাদের বাঁচার দাবি: ৬-দফা কর্মসূচি’-র বিশদ ব্যাখ্যা ও গাণিতিক যুক্তির নেপথ্যে ছিল তাঁর মেধা। পরবর্তীতে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ‘নির্বাচনি ইশতেহার’ খসড়া করা এবং বিখ্যাত প্রচারপত্র ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’-র অর্থনৈতিক উপাত্ত সংকলনেও তাঁর কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। ১৯৬৮-র আগরতলা মামলার আইনি কৌশল সাজানো এবং ‘৬৯-র গণঅভ্যুত্থান থেকে ’৭০-র নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে আস্থাভাজন ও মননশীল নীতি-সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যা শুরু হলে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে, সম্পূর্ণ একক দায় কাঁধে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন তাজউদ্দীন। ৩ এপ্রিল দিল্লির ১ সফদারজং রোডে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটিই ছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক বুনিয়াদ। ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া তাঁর ভাষণটি বিবিসি ও আকাশবাণীতে প্রচারিত হলে বিশ্ব সম্প্রদায় প্রথম জানতে পারে—বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছে। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে শপথ নিয়ে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র।”

যুদ্ধ চলাকালীন কোলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের কার্যালয়ে কাঠের চেয়ারে ঘুমানো, নিজের কাপড় নিজে কাচা কিংবা মোমবাতির আলোয় মানচিত্রে যুদ্ধের গতিপথ আঁকা ছিল তাঁর নিত্যদিনের দাপ্তরিক জীবন। মুক্তিসেনাদের জন্য নিজের হাতে সোয়েটার বুননের ঘটনাটি ছিল আড়ম্বরহীন আচরণের এক প্রত্যক্ষ উদাহরণ। শেখ মুজিবের নামে যৌথ সামরিক কমান্ড গঠন, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে মিত্রতার ভারসাম্য রক্ষা করা এবং সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে সবাইকে এক সূত্রে গাঁথার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি। ৯ মাসে মাত্র ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা বাজেটে পুরো যুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনা এবং প্রতিটি পয়সার আন্তর্জাতিক মানের অডিট হিসাব রাখা ইতিহাসে প্রশাসনিক সততার বিরল দলিল। ৬ ডিসেম্বর ভুটানের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায় ছিল তাঁর কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির বড় সাফল্য।

রাজনৈতিক এই পথচলায় খোন্দকার মোশতাকদের গোপন চক্রান্ত এবং ‘মুজিব বাহিনী’র সমান্তরাল সামরিক চাপ—নিজের দলের ভেতরের এই বৈরী স্রোতকে তিনি সামলেছেন সম্পূর্ণ অবিচল থেকে। কোনো সস্তা বিতর্ক বা কাদা ছোড়াছুড়িতে না গিয়ে তিনি কাজের নীতিতে বিশ্বাস রেখেছিলেন। থিয়েটার রোডের দাপ্তরিক কাজের টেবিলকেই বানিয়েছিলেন তাঁর মূল লড়াইয়ের ময়দান।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রায় শূন্য বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, চালু করেন নিজস্ব মুদ্রা ‘টাকা’এবং ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পেশ করেন স্বাধীন দেশের প্রথম বাজেট। অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানদের নিয়ে গঠন করেন স্বাধীন ‘পরিকল্পনা কমিশন’, যা ছিল রাজনীতির ওপর দূরদর্শী অর্থনীতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক বস্তুনিষ্ঠ প্রচেষ্টা। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী লুটপাটের বিরুদ্ধে তাঁর জিরো-টলারেন্স অবস্থান প্রমাণ করে তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

​স্বাধীনতার পর একটি নব্য স্বাধীন দেশে বিদেশি মিত্রবাহিনীর অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে—এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তাজউদ্দীন আহমেদ শুরু থেকেই গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সিভিল প্রশাসনের একক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার স্বার্থে তিনি ভারতীয় মিত্রবাহিনী দ্রুত প্রত্যাহারের বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অবস্থান নেন। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তাজউদ্দীন আহমেদ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও দাপ্তরিক রূপরেখা তৈরিতে প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেন। এরই ফলশ্রুতিতে, মাত্র তিন মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চের মধ্যেই ভারতীয় মিত্রবাহিনী সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করে—যা বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরল ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

১৯৭৪-এর চরম দুর্ভিক্ষকালেও তিনি রেশনের বাইরে একছটাক অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন—যা একজন শাসকের রাজনৈতিক নৈতিকতার উজ্জ্বল নজির। যুক্তরাষ্ট্রের শর্তযুক্ত খাদ্যসাহায্য (পিএল-৪৮০) প্রত্যাখ্যান এবং বিশ্বব্যাংকের অন্যায্য নির্দেশের সামনে নতিস্বীকার না করায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত তৈরি হলে, ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবরে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

​পদ ছাড়ার পর সরকারি গাড়ি-বাসভবন ছেড়ে দেয়া, সংসার চালাতে প্রিয় বই বিক্রি করা কিংবা উপহারের কলম-ঘড়ি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ঘটনা ক্ষমতার বিপরীতে তাঁর আজীবন লালিত নির্মোহ দর্শনেরই প্রকাশ। তাঁর ডায়েরি ও প্রশাসনিক নোটবুকগুলো আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য প্রামাণ্য দলিল। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে তিনি আদর্শিক জায়গা থেকে শেখ মুজিবকে সতর্ক করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার বৃত্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এক গভীর রাজনৈতিক অন্ধকার নেমে আসে। সেই চরম সংকটকালেও খোন্দকার মোশতাক সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার আপস বা ক্ষমতার অংশীদারত্বে যাননি তাজউদ্দীন আহমেদ। ফলে ২২ আগস্ট গৃহবন্দি অবস্থা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাপ্রকোষ্ঠের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি থেকেও তিনি নিজের নীতি ও রাজনৈতিক আদর্শে ছিলেন অবিচল। পরবর্তীতে ৩ নভেম্বরের মধ্যরাতে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে কারাবন্দি অবস্থায় ঘাতকের বুলেটে ও বেয়োনেটের আঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। এই হত্যাকাণ্ড কেবল এক ব্যক্তিসত্তার অবসান ছিল না; তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক রূপকারকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক চক্রান্ত।

​ক্ষমতার মোহ, পদ-পদবির লোভ এবং রাজনৈতিক চাটুকারিতার ভিড়ে তাজউদ্দীন আহমেদের জীবন ও দর্শন আজ কেবল অতীত ইতিহাস নয়, অত্যন্ত জীবন্ত এক পাঠ। একটি জাতিকে কীভাবে সুশাসন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সততার বুনিয়াদে গড়ে তুলতে হয়—নিজের জীবন ও রক্ত দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। তাজউদ্দীন আহমেদের নির্মোহ ও ঋজু রাজনৈতিক জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী এবং ক্ষমতার অলিন্দে তৈরি হওয়া শব্দগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়, কিন্তু নীতি ও দূরদর্শিতার প্রদীপ ইতিহাসের পাতায় চিরকাল আলো ছড়িয়ে যায়।

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী।  সভাপতি, ৭১’র চেতনা)

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers