সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

নজরুল-মানসে পরিবেশ-চেতনা

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৫ মে , ২০২৬, ১৬:২০:৩৩

333
  • নজরুল-মানসে পরিবেশ-চেতনা

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কাজী নজরুল ইসলামকে চিনেছে মূলত দ্রোহ, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক শ্রেণি-সংগ্রামের একনিষ্ঠ রূপকার হিসেবে। কিন্তু তাঁর এই বহুল আলোচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের সমান্তরালে যে এক নিবিড়, জীবনকেন্দ্রিক ও প্রকৃতিমনস্কতা ক্রিয়াশীল ছিল, তা সমকালের সমালোচনা-সাহিত্যের বৃত্তে বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। বর্তমান শতকের জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা আর বিপন্ন পৃথিবীর পটভূমিতে দাঁড়িয়ে যখন নজরুলের সাহিত্যকীর্তিকে নতুন করে পাঠ করা হয়, তখন সেখানে এক দূরগামী পরিবেশ-চেতনার বিস্ময়কর উন্মেষ ঘটতে দেখা যায়। নজরুলের এই পরিবেশ-মনস্কতা কোনো কৃত্রিম, নাগরিক বা বাহ্যিক লৌকিক দর্শন ছিল না; বরং তা ছিল তাঁর জীবনের রুক্ষ বাস্তব ও মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক অনন্য শৈল্পিক নির্যাস। এর বাস্তব উৎস লুকিয়ে ছিল তাঁর শৈশবের খনি-অঞ্চল আসানসোল-রানীগঞ্জের রুক্ষ লাল মাটি, বর্ধমানের উন্মুক্ত প্রান্তর এবং পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার নদী-মেখলা ও আরণ্যক প্রকৃতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গভীরে।

শৈশব ও কৈশোরে দেখা প্রকৃতির এই রূপান্তর নজরুলের অবচেতনে এক গভীর পরিবেশগত সংবেদনশীলতার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে আসানসোলের কয়লাখনি অঞ্চলে লেটো দলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সময়, ব্রিটিশ পুঁজিবাদের মাধ্যমে মাটির বুক চিরে লুণ্ঠনমুখী সম্পদ আহরণ এবং আদিম আরণ্যক প্রকৃতির যে ক্ষতবিক্ষত রূপ তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন, তা-ই তাঁকে পরবর্তীকালে পরিবেশ-সমালোচনার এক দূরদর্শী কণ্ঠস্বরে রূপান্তরিত করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রবর্তিত ১৮৭৮ সালের কঠোর ‘অরণ্য আইন’ যখন গ্রামীণ ও লোকায়ত মানুষের আদিম আরণ্যক অধিকার কেড়ে নিয়ে বন-জঙ্গলকে কেবলই কাঠের খনি বা কাঁচামাল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিণত করেছিল, নজরুল তখন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে প্রকৃতির এই বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে অবচেতনেই এক মহাশৈল্পিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘রুদ্র-মঙ্গল’ প্রবন্ধগ্রন্থের, বিশেষত ‘ধূমকেতু’ ও ‘রুদ্র-মঙ্গল’ প্রবন্ধের অন্তরালে প্রকৃতির এই যান্ত্রিক বিনাশের প্রতি এক গভীর আত্মিক বেদনাবোধ ও ক্ষোভ লুকিয়ে ছিল, যা আধুনিক পরিবেশ-সমালোচনার তাত্ত্বিক ভিত্তিকে স্পর্শ করে।

নজরুলের এই পরিবেশ-দর্শনের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এক সর্বাত্মক প্রাণময়তার ওপর, যেখানে প্রকৃতি কোনো জড় বস্তু বা মানুষের ভোগের জন্য তৈরি কোনো নিষ্ক্রিয় মঞ্চ নয়, বরং এক স্বয়ংশাসিত জীবন্ত সত্তা। তিনি প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে কোনো কৃত্রিম বা দ্বান্দ্বিক বিভাজন খোঁজেননি; বরং বিশ্ব-প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের অন্তরে এক পরম ও জীবন্ত চেতনার প্রবাহ অনুভব করেছেন। মানুষের আধিপত্যকামী ও মানবকেন্দ্রিক অহমিকার বিরুদ্ধে তাঁর এই ভাবনার সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমাণ মেলে ১৯২২ সালে ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যে সংকলিত তাঁর বিখ্যাত ‘সিন্ধু’ কবিতায়। সমুদ্রের বিশালতাকে তিনি কেবল একটি ভৌগোলিক উপাদান হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে মানুষের সুখ-দুঃখের সমভাগী এক আদিম সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সাগরের অনন্ত গর্জনের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে কবি প্রশ্ন করেছেন:

​“কী কথা বলিতে চাও তরঙ্গের করতালিতে? /

ওগো সিন্ধু, ওগো বন্ধু, ওগো আদিম চপল!”

মানুষের সৃষ্টির বহু আগে থেকে টিকে থাকা এই আদিম প্রকৃতিকে ‘বন্ধু’সম্বোধন করার মাধ্যমে নজরুল প্রমাণ করেছেন যে, মানুষ প্রকৃতির অধীশ্বর বা শোষক নয়, বরং এই বিশাল বাস্তুসংস্থানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। প্রকৃতির এই চিরন্তন রূপের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের জাগতিক অহংকার যে কতটা তুচ্ছ এবং ক্ষণভঙ্গুর, তা তিনি অনন্য নান্দনিকতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবির এই সর্বাত্মক প্রকৃতি-ভাবনা কেবল মুগ্ধতার স্তরে থমকে থাকেনি, তা সুনির্দিষ্ট রূপ পেয়েছে তাঁর ঋতুভিত্তিক গান ও কবিতায়। প্রকৃতি যখন শুষ্ক ও জীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল ঋতুর রৈখিক পরিবর্তন থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক নিজস্ব শোধনপ্রক্রিয়া ও পুনরুজ্জীবন। তাঁর ‘ফণি-মনসা’ (১৯২৬) কাব্যের ‘চৈতি হাওয়া’ কবিতায় আমরা দেখি, শুষ্ক চৈত্র বাতাস কীভাবে জড়তাকে ঝেড়ে ফেলে নতুনের পথ সুগম করে। কবি লিখছেন:

​“আসিল যখন চৈতি হাওয়া শুষ্ক পাতা ঝরিয়ে, /

ওগো উদাসীন, তুমি কি তখনো রইবে ঘুমে জড়িয়ে?”

এই যে ঝরা পাতার গান, তা আসলে প্রকৃতির সেই চিরন্তন  নিয়মের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ধ্বংস ও সৃষ্টি একে অপরের পরিপূরক। আধুনিক উপভোক্তা মানুষ যখন নিজের স্বার্থে প্রকৃতির এই স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে, তখন নজরুলের এই ঋতু-ভাবনা আমাদের এক অনন্য পরিবেশগত সতর্কবার্তা প্রদান করে। নজরুলের প্রলয়-ভাবনা আসলে শোষিত ধরিত্রীরই এক রুদ্র আত্মরক্ষা। তিনি জানতেন প্রকৃতি যখন নিজেই নিজের ভারসাম্য ফেরাতে রুষ্ট হয়ে ওঠে, তখন মানুষের সমস্ত যান্ত্রিক অহংকার ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। শুধু শুষ্ক প্রকৃতিই নয়, মরুভূমির রুক্ষতা ও তার ভেতরের প্রাণের স্পন্দনকেও নজরুল গভীর দার্শনিকতায় আবাহন করেছেন তাঁর ‘মরু-ভাস্কর’ (১৯৫১) কাব্যে, যেখানে তপ্ত বালুকারাশিও এক গভীর আধ্যাত্মিক ও পরিবেশগত শুচিতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

শুধু এই রুদ্র রূপই নয়, বাংলার নদী ও জলজ প্রকৃতির প্রতি নজরুল দেখিয়েছেন এক নিবিড় আত্মিক টান। তবে তা কেবল বিরহের প্রতীকী পটভূমি ছিল না। নজরুলের বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘বর্ষা-বিদায়’-এ প্রকৃতির এই আবর্তনের চিত্রটি মানুষের কৃত্রিম জীবনযাত্রার বাইরে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে ফুটে উঠেছে। সেখানে তিনি গেয়ে ওঠেন:

​“ঝরিছে অঝোরে শ্রাবণের ধারা, নদী নালা জলে ভাসি’ /

ধরণীর বুকে জাগিছে ব্যাকুল এক করুণ মধুর হাসি।”

নদী ও মেঘের এই যে স্বাভাবিক প্রবাহ, তাকে শাসন, বাঁধ বা শোষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার আধুনিক যে আগ্রাসী উপভোক্তা মনস্তত্ত্ব, নজরুল তার বিপরীতে গিয়ে প্রকৃতির এই চিরায়ত নিয়মের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তাঁর গান ও কবিতায় নদী কোনো কৃত্রিম ভূ-রাজনৈতিক সীমানায় আবদ্ধ নয়, তা জীবনের এক প্রবহমান ধারা, যা নদী ও জলাভূমির প্রাকৃতিক অধিকার সুরক্ষার আধুনিক পরিবেশগত ধারণাকে বহু আগেই স্পর্শ করেছিল। ১৯২২ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার বিভিন্ন সম্পাদকীয়তে তিনি বারবার পরাধীন ভারতের সম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি এদেশের নদী ও অরণ্যবিনাশী ঔপনিবেশিক নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, যা পরিবেশ-রাজনীতির এক প্রাথমিক খসড়া।

নজরুলের পুষ্প-ভাবনা এবং লতাগুল্মের প্রতি অনুরাগ তাঁর কাব্যের নামকরণেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩), ‘ফণি-মনসা’ (১৯২৬) কিংবা ‘ছায়ানট’ (১৯২৫)। তিনি প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানের মাঝেও প্রাণের স্পন্দন এবং এক গভীর লোকায়ত প্রকৃতির সুর অনুভব করেছেন। তাঁর বর্ষার গানে এই আরণ্যক প্রেম যেন আরও বেশি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। “এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেওয়া” গানে কবি প্রকৃতির সবুজ ও স্নিগ্ধ রূপকে আবাহন জানিয়েছেন পরম মমতায়। নজরুল খুব ভালো করেই জানতেন যে, মাটির উর্বরতা আর বাতাসের নির্মলতার ওপরই মানবসভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করে। তাই তাঁর লেখনীতে প্রকৃতি কোনো বাহ্যিক অলঙ্কার হিসেবে আসেনি, এসেছে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য চালিকাশক্তি হিসেবে।

​কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকে কেবল প্রথাগত রাজনৈতিক বিদ্রোহের ফ্রেমে আটকে রাখলে তাঁর চিন্তার এই সবুজ ও দূরগামী দিগন্তটি আমাদের অচেনাই থেকে যাবে। আজকের এই তপ্ত পৃথিবীতে, যেখানে নির্বিচারে অরণ্য নিধন হচ্ছে এবং ধরিত্রী তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাচ্ছে, সেখানে নজরুলের এই পরিবেশ-মনস্কতা এক অনন্য বৈশ্বিক দিশারী। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে প্রকৃতির রুদ্র রূপকে শ্রদ্ধা করতে হয় এবং কীভাবে তার কোমল রূপকে ভালোবেসে বুকে আগলে রাখতে হয়। নজরুলের সেই বিখ্যাত সাম্যবাদী পঙ্ক্তি:

​“গাহি সাম্যের গান— /

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”

এই সাম্যবাদকে কেবল সামাজিক শ্রেণি-সংগ্রাম বা কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বিপ্লবের সংকীর্ণ ফ্রেমে না দেখে, নজরুলের সামগ্রিক জীবনদর্শনের আলোকে পাঠ করলে এর একটি গভীর ‘প্রাণতাত্ত্বিক সাম্য’ বা মহাজাগতিক মৈত্রীর রূপ উন্মোচিত হয়। নজরুলের দর্শনে এই ‘মানুষ’নিখিল প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী কোনো স্বৈরাচারী সত্তা নয়; বরং সে বিশ্ব-প্রকৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষকে মহীয়ান করার অর্থই হলো তার চারপাশের জীবমণ্ডল, অরণ্য ও নদীকে রক্ষা করা—কারণ পরিবেশের বিনাশ ঘটলে মানুষের অস্তিত্বও বিপন্ন হতে বাধ্য। নজরুলের এই সাম্যভাবনাকে পরিবেশ-সাম্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করলেই কবির এই কালজয়ী জীবনবীক্ষার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।

বাহাউদ্দিন গোলাপ,

(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers