বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

বিপন্ন পৃথিবী, বিপন্ন নারী

সুমন মোস্তফা ২৩ এপ্রিল , ২০২৬, ২০:২৫:৩৬

148
  • বিপন্ন পৃথিবী, বিপন্ন নারী

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন আজ এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তবে এই সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না-নারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।

উন্নয়নের নামে বন উজাড়, লাগামহীন শিল্পায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে, বিশেষ করে নারীদের ওপর। কারণ, তাদের দৈনন্দিন জীবন প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত পানি সংগ্রহ, খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবার পরিচালনায় তারা পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নারীদের দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার পর আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে তারা পড়েন নতুন সংকটে। সেখানে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর শৌচাগার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব কিন্তু গুরুতর প্রভাব পড়ে নারীর স্বাস্থ্যে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির ব্যবহার প্রজনন স্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। অনিয়মিত ঋতুচক্র, সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ এবং মাতৃস্বাস্থ্যের জটিলতা বাড়ছে। অথচ এই সংকটের জন্য নারীরা দায়ী নন—তবু তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

হাওর অঞ্চলেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। বন্যা বা খরার কারণে ফসল নষ্ট হলে খাদ্য সংকট তৈরি হয়, আর তখন নারীরাই নিজের প্রয়োজন ত্যাগ করে পরিবারের অন্যদের অগ্রাধিকার দেন। ফলে পুষ্টিহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক চাপ তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে-যা খুব কমই আলোচনায় আসে।

এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু মোকাবিলায় জেন্ডার সংবেদনশীল পরিকল্পনা অপরিহার্য। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে নারী ও শিশু-বান্ধব করা, নারীর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিশোরীদের মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপকূল ও হাওর অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা আরও স্বাবলম্বী হবে এবং সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করবে।

সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত নয়; এটি একটি সামাজিক ও জেন্ডারভিত্তিক সংকট। তাই নীতিনির্ধারণে নারীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ে নারীরা কেবল ভুক্তভোগী নন-তারা পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের কণ্ঠকে গুরুত্ব দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers