বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে

শহীদুল্লাহ ফরায়জী ১ ডিসেম্বর , ২০২৫, ১৫:০০:২১

437
  • জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে

​বাংলাদেশের দীৰ্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষাক্ত প্রবণতা গভীরভাবে প্রোথিত: যখনই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের মৌলিক রূপান্তরের সাহসী প্রস্তাবনা নিয়ে আসে বা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐকমত্যের পথ দেখায়, তখন তাঁদের যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাধারার মোকাবিলা না করে, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চারিত্রিক হননের মাধ্যমে হেয় করা হয়।

এটি ধারণার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই না করে, চিন্তাশীল মানুষটিকে সরাসরি নির্মূল করার এক কৌশল। এই মানসিকতা কেবল রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করে না— জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড এবং সুস্থ আলোচনার স্থানটিকেও ক্ষয়প্রাপ্ত করে।

সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে ঘিরে চলমান বিতর্ক এবং আলী রীয়াজকে লক্ষ্য করে ‘দুর্নীতি’, ‘সুবিধাভোগ’ কিংবা ‘বিদেশি’ বলে প্রচার চালানো—এগুলো শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংলাপভিত্তিক ও সমাধানমুখী রাজনীতির সম্ভাবনাকে নির্মূল করার সুদূরপ্রসারী নিষেধাজ্ঞা আরোপের সমতুল্য।

​যেখানে এই উদ্যোগটি রাষ্ট্রের জন্য একটি স্থায়ী ও সমাধানমূলক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করতে পারত, সেখানে তাকে বিতর্কিত করার প্রবণতা কেবল হতাশার নয়, গভীর এক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।

​ব্যক্তিগত সুনামের ওপর কালিমা লেপন ও ​আক্রমণের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো—এর বানোয়াট প্রকৃতি। জাতীয় স্বার্থে যখন দায়িত্বশীল নাগরিকেরা এগিয়ে আসেন, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভের মিথ্যা গল্প-কাহিনী প্রচার করা হয়। ​যাঁরা দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের নিরপেক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন, তাঁদের সুনাম অর্জনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

​রাষ্ট্রীয় স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে দায়িত্ব পালন করতে এসে যখন ব্যক্তিগত চরিত্রে এভাবে কালিমা লেপন করা হয়, তখন তা কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নয়, বরং ভবিষ্যতের যেকোনো জাতীয় ঐকমত্যের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদেরও নিরুৎসাহিত করে। ​

যাঁরা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে উল্টো তিরস্কার করা হয়—এই প্রবণতা প্রমাণ করে, একটি গোষ্ঠী আসলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং সংঘাতের সংস্কৃতিকেই জিইয়ে রাখতে চায়। এটি শুধু কমিশন বা ব্যক্তি আলী রীয়াজকে আক্রমণ নয়, সামগ্রিক ঐক্যের ধারণার ওপরই একটি আঘাত।

১.‘বিদেশি’ তকমা: যুক্তিহীনতার আশ্রয় ও ঐতিহাসিক কৌশল: 

যখন কোনো গঠনমূলক প্রস্তাব বা অপ্রিয় সত্যের মোকাবেলা করার মতো নৈতিক বা যুক্তিনিষ্ঠ সাহস থাকে না, ঠিক তখনই 'বিদেশি' বা 'বহিরাগত' ট্যাগটি আলোচনা বন্ধ করার ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কৌশলটি কোনো রাজনৈতিক মতবাদ নয়—এটি নিছক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব এবং কৌশলগত ভীরুতা।

এই অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কেবল ব্যক্তির ভাবমূর্তিকে নয়, বরং সমাজের সেই অংশটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যাঁরা সততা ও মেধার জোরে উন্নত একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখান। যে-জাতি তার মেধা, সম্পদ আর অভিজ্ঞতা দিয়ে বিশ্ব জয় করে পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর বুক ফুলিয়ে গর্ব করে, সেই জাতিই যখন জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা প্রদানকারীকে 'বিদেশি' বলে ঠেলে ফেলে দেয়, তখন এটি আর নিছক রাজনৈতিক খেলা থাকে না; তা পরিণত হয় জাতিগত আত্মমর্যাদার মর্মান্তিক এক ভাঙনে।

এমন বক্তব্য গভীর এক স্ব-বিরোধিতাকে নির্দেশ করে। যে-ব্যক্তি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড মজবুত করতে সাহায্য করেন, তাঁকেই তাঁর জ্ঞান বা সমালোচনার কারণে "বিদেশি" তকমা দেওয়া হয়। এই দ্বৈত আচরণ মূলত রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ফল, যার মাধ্যমে ভিন্নমতকে দমন করা বা তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার কৌশল। একইসঙ্গে এটি জাতিগত আত্মমর্যাদার ভাঙন ও প্রবাসীদের অর্জিত বৈশ্বিক জ্ঞানকে গ্রহণ করতে না পারার সামাজিক মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করে, যা জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ তৈরি করে।

২. অবদান যাচাইয়ের মানদণ্ড: ​রাষ্ট্রের উন্নতি কি কেবল জন্মস্থানের ওপর নির্ভর করে, নাকি ধারণা, প্রস্তাব ও নৈতিক দায়িত্বের ওপর বিচার করা উচিত? আলী রীয়াজ কিংবা তাঁর মতো চিন্তাশীল মানুষদের প্রবাসী পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়— তাঁদের ধারণা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কতোটা অবদান রাখছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত। ​

আজকের বিশ্বে জ্ঞান—সীমান্ত মানে না। যে-দেশ কেবল অর্থ (Remittance) চায়, কিন্তু প্রবাসীদের জ্ঞান (Expertise/Brain) চায় না, সে-দেশ কখনো আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজে পরিণত হতে পারে না। বাংলাদেশের উচিত Brain Gain-এর ধারণা—যেখানে প্রবাসী মেধা বাংলাদেশের চিন্তার শক্তি বাড়িয়ে তুলবে, সংকুচিত করবে না। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন সে ভিন্ন মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।

​৩. জাতীয় ঐকমত্য কমিশন: একটি বিরল নৈতিক উদ্যোগ: 

​গণঅভ্যুত্থানের পর যখন রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র ছিল, তখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন আদর্শিক ধারার রাজনৈতিক দলকে এক টেবিলে বসিয়ে জাতীয় সনদ (National Charter) প্রণয়ন করেছে। এটি নিছক রাজনৈতিক চুক্তি নয়—বরং সংলাপকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার এক নৈতিক প্রচেষ্টা। ​তাদের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা অবশ্যই আছে—কিন্তু তিনটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—

​১. কঠিন সময়ে মধ্যস্থতার দায়িত্ব নিয়েছেন।

২. দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে সংলাপের কাঠামো তৈরি করেছেন।

৩. জাতির প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছেন।

​এই সত্যগুলো ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধতার একটি চিহ্ন—একটি Moral Blueprint—যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। পৃথিবীর কারো পক্ষেই কোনো নিরঙ্কুশ সাফল্য বা সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব নয়।

৪. কেন এই উদ্যোগকে আক্রমণ করা হচ্ছে? প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ:

ব্যক্তিগত আক্রমণের কারণটি রাজনৈতিকের চেয়ে বেশি সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক।

​ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের ভয় (Threat to Status Quo): ঐকমত্য কমিশন যে- ‘জাতীয় সনদ’ তৈরি করেছে, তা ভবিষ্যতে ক্ষমতার চর্চা, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: নির্বাচন কমিশন, দুদক) এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে। যারা বিভাজনের ওপর রাজনৈতিক সুবিধা গড়ে তোলে—তারা এই সমঝোতা বা সংলাপকে ‘হুমকি’ মনে করে, কারণ সমঝোতা মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন।

​নৈতিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অসততা ও বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করে; তাই তারা ক্ষমতায় থাকতে চাওয়া গোষ্ঠীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ভালো মানুষরা মাঠ থেকে সরে যান এবং ভয় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের এক নীরব সংস্কৃতি।

​৫.সমাধান: চিন্তার নিরাপত্তা রক্ষা করা জরুরি: 

​বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত ক্ষেত্র আজ অর্থনীতি নয়—চিন্তার নিরাপত্তা। যুক্তি নয়, যখন চিন্তাশীল ব্যক্তিকেই আক্রমণ করা হয়—তখন রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।

​মতভেদকে ‘শত্রুতা’ নয়, ‘গবেষণার সম্ভাবনা’ হিসেবে দেখা; প্রস্তাবকে আক্রমণ, ব্যক্তিকে নয়। ​প্রবাসী চিন্তাবিদদের অবদানকে ‘Brain Drain’ নয়, ‘Brain Gain’ হিসেবে বিবেচনা করা।

​গণমাধ্যমে Character assassination নয়, Political debate উৎসাহিত করা।

​রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে আক্রমণ মানে ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে আক্রমণ। আজ যদি আমরা কাউকে তাঁর চিন্তার জন্য ঠেকাই— আগামীকাল আমাদের নিজের চিন্তাকেও থামিয়ে দেওয়া হবে। একটি জাতি তখনই পরিণত হয় যখন সে বুঝতে শেখে—

​চিন্তাবিদকে অপছন্দ করা যায়, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতাকে আক্রমণ করা যায় না।

একটি নৈতিক জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে—চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, কেবল নিরাপত্তা দিয়ে নয়, চিন্তার বহুমুখিতাকে সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সবার আগে প্রয়োজন। ​সমঝোতাকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা, মতপার্থক্যকে বিভেদ নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। ​নৈতিক মানুষকে রক্ষা করা, সততা ও নীতিনিষ্ঠাই আমাদের জাতীয় মেরুদণ্ড। এদের সুরক্ষা মানেই দেশের আত্মাকে রক্ষা করা। ​

কারণ, ভালো মানুষকে আড়ালে ঠেলে দেওয়া কিংবা তাঁদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—তা রাষ্ট্রকে তাঁর শ্রেষ্ঠ সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা। ​ভালো মানুষকে আড়ালে পাঠানো মানেই দেশকে অন্ধকারে পাঠানো।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

faraizees@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers