বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ঐতিহাসিক সেতুর হাতছানি: ভোলা–বরিশাল সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

মো. সাকিল তালুকদার ২৮ নভেম্বর , ২০২৫, ০০:৩২:৪২

3K
  • ঐতিহাসিক সেতুর হাতছানি: ভোলা–বরিশাল সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি

দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বহু কথা, বহু প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বরিশাল–ভোলা সেতুর প্রশ্নে বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র—ঘোষণা আছে, কিন্তু কাজের গতি নেই। অথচ এই সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনজীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে—এ কথা নতুন নয়। প্রশ্ন হলো: এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রকল্প কেন এখনও ফাইলবন্দি?

ভোলা দেশের বৃহত্তম দ্বীপজেলা; কৃষি, মৎস্য, গ্যাস—সব দিক থেকেই সম্ভাবনাময়। কিন্তু নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থান তাকে স্বাভাবিক উন্নয়নধারার বাইরে ঠেলে রেখেছে দীর্ঘদিন।

ভোলা থেকে বরিশাল কিংবা রাজধানীতে যাওয়ার পথে প্রতিটি মানুষকে আজও লঞ্চ, স্পিডবোট ও বাসের ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়। জরুরি রোগী বা গর্ভবতী মায়ের জন্য এটি যে কেবল দুর্ভোগ নয়, জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করে—এ কথা যারা নীতিনির্ধারক, তাদের অজানা থাকার কথা নয়।

পদ্মা সেতু হলো, দক্ষিণাঞ্চল কেন অপেক্ষায়?

পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে, ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীবনমান বদলে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে, মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে, অর্থনীতি পেয়েছে নতুন গতি। কিন্তু একই সময়ে দক্ষিণ-কেন্দ্রিক বরিশাল–ভোলা অঞ্চলের মানুষ এখনো পুরনো দুর্ভোগে আটকে আছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন? দক্ষিণাঞ্চলের একাংশে উন্নয়ন উল্লম্ফন, আরেক অংশে উন্নয়ন স্থবির—এ বৈষম্য দূর করার দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়?

বরিশাল–ভোলা সেতু নির্মাণ হলে বরিশাল বিভাগ পুরোপুরি দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। এক ঘণ্টার মতো সময়েই ভোলা থেকে বরিশাল; কয়েক ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। ফলে ব্যবসা, পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন—সবক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটবে।

একের পর এক সমীক্ষা—বাস্তবায়ন কবে?

ভোলা–বরিশাল সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রাথমিক নকশা, ব্যয় পর্যালোচনা—সবই হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থায়নে এসেছে ধীরগতি। জনগণের প্রশ্ন—কত বছর ধরে "সমীক্ষা" চলবে? উন্নয়ন কি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

একদিকে সেতুকে কেন্দ্র করে জনআকাঙ্ক্ষা তুঙ্গে, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। নতুন সরকার দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আনতে চায় বলে ঘোষণা দিয়েছে; সে ক্ষেত্রে ভোলা–বরিশাল সেতু একটি লিটমাস টেস্ট। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নজর রাখছে সরকার কত দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে এ প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়।

অর্থনীতির চাকা ঘুরবে—কিন্তু শর্ত একটাই: সেতু চাই

ভোলা গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা। কৃষিজ উৎপাদন, মাছ আহরণ, লবণ, দুধ, সবজি—সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম উৎপাদনশীল অঞ্চল। কিন্তু বাজারজাত করতে হয় নদীপথের সীমাবদ্ধতা নিয়ে। সড়ক যোগাযোগ পেলে বিনিয়োগকারীরা ভোলায় শিল্পকারখানা স্থাপনে আগ্রহী হবে, আধুনিক লজিস্টিকস গড়ে উঠবে, তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

বরিশাল থেকে ভোলার পণ্য পরিবহনের খরচ কমে আসবে, বাজার বিস্তৃত হবে। দক্ষিণাঞ্চল সমৃদ্ধ হলে দেশের সার্বিক জিডিপিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হবে। অর্থাৎ, বরিশাল–ভোলা সেতু একটি জাতীয় অর্থনৈতিক টুল—এটি শুধু একটি জেলা বা বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প নয়।

দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণাঞ্চলে সেতুর গুরুত্ব আরও বেশি

প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত উদ্ধার, ত্রাণ বা চিকিৎসা পৌঁছে দিতে নদী পাড়ি দিতে হয়—যা সময়সাপেক্ষ। স্থায়ী সড়কসেতু থাকলে জরুরি সেবা দ্বিগুণ গতিতে পৌঁছানো সম্ভব। এজন্যই এই সেতুকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো’ হিসেবেও দেখা জরুরি।

জনগণের দাবি—এবার সিদ্ধান্ত চাই

সময়সীমাহীন বৈঠক, সিদ্ধান্তহীনতা ও কাগুজে সমীক্ষা দিয়ে উন্নয়ন হয় না। বরিশাল–ভোলা সেতুর মতো একটি কৌশলগত প্রকল্প আরও দেরি করার সুযোগ নেই। দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ বছরের পর বছর ধরে এ সেতুর জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রতিটি নির্বাচনেই এই সেতুর প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই—এমন পরিস্থিতি জনগণের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সরকার চাইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই এটিকে ‘ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, বিদেশি বা দেশীয় অর্থায়ন সূত্র নিশ্চিত করা, এবং প্রকল্পের সময়সীমা নির্ধারণ—এগুলো এখন সময়ের দাবি।

যে উন্নয়ন মানুষের জীবনে পৌঁছায়, সেটাই প্রকৃত উন্নয়ন

বরিশাল–ভোলা সেতু বাস্তবায়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়—এটি মানুষের জীবনমান স্বাভাবিক ও নিরাপদ করা, ব্যবসা সহজ করা, বৈষম্য কমানো, এবং জাতীয় উন্নয়নকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ কোনো অনুগ্রহ চাইছে না; তারা চাইছে ন্যায্য অধিকার—যে অধিকার থেকে তারা বছরের পর বছর বঞ্চিত।

পদ্মা সেতুর সফলতা দেখিয়েছে—বাংলাদেশ নিজের টাকায় বড় প্রকল্প করতে পারে। তাহলে ভোলা–বরিশাল সেতুর ক্ষেত্রে দ্বিধা কেন? দক্ষিণাঞ্চল কি উন্নয়ন মানচিত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ?

উপসংহার

ভোলা–বরিশাল সেতু সময়ের দাবি, জনগণের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার দাবি। যদি সত্যিই দেশকে সমানভাবে এগিয়ে নিতে হয়, তবে দক্ষিণাঞ্চলের অপেক্ষা আর দীর্ঘায়িত করা যাবে না। উন্নয়নকে ঢাকার বাইরে এবং নদীবেষ্টিত অঞ্চলগুলোর জীবনে পৌঁছে দিতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আজকের সত্য একটাই: ভোলা–বরিশাল সেতু শুধু ভবিষ্যতের প্রকল্প নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যত। অপেক্ষা নয়, এখন প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দ্রুত বাস্তবায়ন।

 লেখক: গবেষক, মানবাধিকার কর্মী,প্রাক্তন প্রভাষক, সিউবি।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers