বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

শ্রদ্ধার্ঘ্য হেমাঙ্গ বিশ্বাস : হবিগঞ্জের জালালী কৈতর

মাঈনুদ্দীন দুলাল ২৪ নভেম্বর , ২০২৫, ১৬:৪৮:২৪

466
  • সংগৃহীত

"উপমহাদেশের কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মৃত্যু দিন ছিল ২২ নভেম্বর। শুধু গান নয় বাংলা কথাসাহিত্যেও আছে তার আঁচড়। তার জন্যে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। "

আমারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে ফাঁকা সময়ে পাড়ার চা দোকানে, চট্টগ্রাম শিল্পকলার বারান্দায় সকাল বিকেল আড্ডা দিচ্ছি। গুলতানি মারছি আবোল তাবোল। গ্রুপ থিয়েটারে আমাদের দলের শো বা রিহার্সেল থাকলে চেয়ার টেবিল টানছি।  কেউ কেউ টিউশনি করছি। আড্ডার ফাঁকে গিয়ে প্রাইভেটের খেপ মেরে আসছি। আমাদের কিছু বন্ধু চারণ সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ছিল। ওদের তালে পড়ে আমরাও পাড়ায় একটা গণসংগীত দল করলাম। নাম দিলাম "হাতিয়ার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী"। আমাদের দলপতি আজাদ। তার নেতৃত্বে আমারা কিছু গানও তুলে ফেল্লাম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে শুরু হল গণসংগীত পরিবেশন। সেই সময় আমাদের পরিচয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে।  আমাদের দলীয় পরিবেশনায় হেমাঙ্গের 'নাম তার ছিল জন হেনরি ',  'আমরা করব জয়' এ দুটি গান অবশ্যই থাকত।

তখন জানলাম হেনরি সম্পর্কে। আমাদের চেতনায় নাড়া দিল হেনরি আর শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম।

 জন হেনরি একজন আমেরিকান লোকগাঁথার কিংবদন্তি। তাকে নিয়ে কিংবদন্তি  গল্পের জন্ম হয় আফ্রিকান-আমেরিকান দিনমজুরদের মধ্যে। জন হেনরি রেলপথে স্টিল ড্রাইভারের কাজ করতেন। হাতুড়ি দিয়ে পাথর কাটাই ছিলো তার কাজ। লোকগাঁথায় বলা হয়েছে জন হেনরি যন্ত্রের সঙ্গে হাতুড়ি হাতে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে জিতেছিলেন এবং প্রচন্ড ক্লান্তিতে মৃত্যুবরণ করেন। তার এ কাহিনী নিয়ে অনেক গান,গল্প,নাটক  রচিত হয়েছে। বিশ্ব গণসংগীতের গুরু, কিংবদন্তী শিল্পী পল রবসন জন হেনরিকে নিয়ে গান গেয়েছেন। যেখানে জন হেনরি স্টিলের হাতুড়ি দিয়ে পাহাড় কাটার এক কিংবদন্তি শ্রমিক ছিলেন। জন হেনরি একটি হাতুড়ি ব্যবহার করে মেশিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। রবসন "জন হেনরি" গানটি গেয়ে শ্রমিক শ্রেণির সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। 

উপমহাদেশের গণসংগীত বলতে প্রথমেই নাম আসে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের।  তিনি এ বাংলার সন্তান। বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে জন্ম। তার রক্তে গান জন্মসূত্রেই। জারি-সারি, ভাটিয়ালি, পালাগান হাওড়ের হাওয়ায় ভেসে তার কন্ঠে আসন পেতেছে। যদিও তার সংঙ্গীত প্রতিভার বিকাশ পশ্চিম বঙ্গ তথা এ সময়ের ভারতে। কিন্তু তিনি দেশভাগের বেদনা,জন্মভূমির মায়া আজীবন বহন করেছেন। শেকড় ছেঁড়ার তাড়না বারবার তাকে তাড়িত করেছে। তাই তার কন্ঠে আকুতি হাওড়ের লিলুয়া বাতাসে ভেসে বেড়ায়, উদাত্ত বেদনায় তিনি গাইলেন "হবিগঞ্জের জালালী কৈতর,আমি সুনামগঞ্জের কুরা,সুরমা নদীর গাংচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়াল। ডানা ভাইঙ্গা পড়ছি আমি কোলকাতার উপর। "

সেই বেদনা তিনি সামাল দিয়েছেন মানুষের বেদনা ও সংগ্রামের সান্নিধ্যে এসে। বেদনা বিদ্ধ, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির গান গেয়ে। তাকে আমার বলতে পারি উপমহাদেশের গণসংগীতের কান্ডারী এবং অনুপ্রেরণা। গণসংগীত ছাড়াও তার দরদমাখা কন্ঠে এসেছে বহু লোকজ গান। যা এ মাটির সোঁদা গন্ধ মাখা। একটা জীবন তিনি যাপন করেছেন ব্রাত্যজনের সান্নিধ্যে ও শুশ্রূষায়।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জীবনী

বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জের মিরাশীর বাসিন্দা ছিলেন। ১৯১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তার জন্ম। পিতা হর কুমার বিশ্বাস ছিলেন চুনারুঘাট পরগনার জমিদার। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজে  ভর্তি হন। সেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। গ্রেফতার হন। ১৯৩৫ সালে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। তারপর যাদবপুর হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকেন এবং তিনি মুক্তি পান। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে আবার তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী ছিলেন। ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত আইপিটি-এর সপ্তম সর্বভারতীয় সন্মেলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নেতৃত্বে অসমের ৪০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি গণসংগীত সংগঠনে ও বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর তিনি মারা যান।

লেখক: সাংবাদিক
 
বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers