বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

এ ট্রিবিউট টু সলিল চৌধুরী!

রেজা ঘটক ২২ নভেম্বর , ২০২৫, ১৬:৪৪:৪৯

552
  • এ ট্রিবিউট টু সলিল চৌধুরী!

বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক বহুমুখী প্রতিভার নাম সলিল চৌধুরী। তিনি ছিলেন সুরকার, গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক, সংগঠক, লেখক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক।

এক কথায় একাধিক ধারার শিল্পী হিশেবে সলিল চৌধুরী নিজের জাত চিনিয়েছেন। সলিল চৌধুরীর গান মানে যেন শুধু কোনো একটা গান নয়, বরং একসঙ্গে অনেক গানের ঠাসবুনটে তৈরি এক অপূর্ব বিশাল সমাবেশ।

একটি বিরাট রঙিন কার্পেটকে বাইরে থেকে দেখে একক মনে হলেও তার মধ্যে যেমন থাকে অসংখ্য রঙিন সুতার সূক্ষ্ম নকশা। তেমনি সলিল চৌধুরীর গানের বাঁকে বাঁকে ছিল নানান মাত্রার ও বৈচিত্র্যময় ঠাসবুনট।

শৈশব ও কৈশোর:

সলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের (গাজীপুর) চিংড়িপোটা গ্রামে এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী আসামের লতাবাড়ি চা বাগানে ডাক্তারি করতেন। বাবার কাছেই সলিল চৌধুরীর সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি।

জ্যাঠাতো দাদা নিখিল চৌধুরীর কাছেও তিনি সংগীতের তালিম গ্রহণ করেন। মূলত নিখিল চৌধুরীর ঐক্যবাদন দল 'মিলন পরিষদ'-এর মাধ্যমেই গানের জগতে তিনি শৈশবেই সম্পৃক্তি। তাঁর শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে আসামের চা বাগানে। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুভাষগ্রামে, (পুরাতন নাম কোদালিয়া) মামার বাড়িতে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। হারিনাভি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং উচ্চ মাধ্যমিক (আইএসসি) পাশ করেন। এরপর কলকাতার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।

কর্মজীবন:

ছোটবেলায়, চার-পাঁচ বছর বয়সে চা–শ্রমিকদের গান, গ্রামীণ সংগীত এবং আসামি লোকগান দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। অন্যদিকে বাবার সংগ্রহের বাখ, বিটোফেন ও মোজার্টের গ্রামোফোন রেকর্ড তাঁকে পাশ্চাত্য ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের প্রতিও আগ্রহী করে তোলে। পাশাপাশি প্রকৃতির রহস্যময় সুর, বনের পাতার মর্মর শব্দ আর পাখির ডাক শুনতে শুনতে তিনি বড় হয়েছেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি তার পিতার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন। তাঁর পিতা চা বাগানের কুলি এবং স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের সাথে মঞ্চ নাটকের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরপরই তিনি সঙ্গীত জ্ঞানে পরিপক্কতা লাভ করেন। এসময় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৪৪ সালে যখন তরুণ সলিল স্নাতক পড়াশোনার জন্য যখন কলকাতায় আসেন, তখনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-এ (Indian Peoples Theater Association) যোগ দেন। এ সময় তিনি গণসঙ্গীত লেখা ও সুর করা শুরু করেন।

আইপিটিএ এর সাংস্কৃতিক দলটি বিভিন্ন শহর এবং গ্রামগঞ্জে ভ্রমণ করতে থাকে, যা এই গানগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। বিচারপতি , রানার এবং অবাক পৃথিবীর মত গানগুলো তখন সাধারণ জনতার কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গাঁয়ের বধু'র মত গান তখন বাংলা সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিল, যা মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি সুর করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে তখনকার প্রায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী এসব গান গেয়েছেন। এর মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

চলচ্চিত্র কর্মজীবন:

সলিল চৌধুরী ১৩টিরও বেশি ভাষায় প্রায় ১০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তাঁর সুরারোপিত গানগুলি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ইতিহাসে ক্লাসিক হিসেবে গণ্য হয়।

তাঁর প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র 'পরিবর্তন' মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে। তিনি প্রায় ৭৫টির বেশি হিন্দি চলচ্চিত্র, ৪০টির বেশি বাংলা চলচ্চিত্র, প্রায় ২৬টি মালয়ালম চলচ্চিত্র এবং বেশ কিছু মারাঠী, তামিল, তেলুগু, কান্নাডা, গুজরাতি, ওড়িয়া এবং অসামীয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

তাঁর ৪১টি বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল 'মহাভারতী' যা ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়।

১৯৫৩ সালে বিমল রায় পরিচালিত 'দো ভিঘা জামিন' চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সলিল চৌধুরীর হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে অভিষেক ঘটে। সলিল চৌধুরীর ছোট গল্প 'রিকসাওয়ালা' অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত।

এই চলচ্চিত্রটি তাঁর কর্মজীবনকে নতুন মাত্রা যোগ করে যখন এটি প্রথমে ফিল্মফেয়ার সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নেয়।

বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে ২০ বছর কাজ করার পরে সলিল চৌদুরী ১৯৬৪ সালে 'চেম্মীন' চলচ্চিত্র দিয়ে মালয়ালম চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। তাঁর মালয়ালম গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

বিখ্যাত চলচ্চিত্র:

সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:

'দো বিঘা জমিন' (Do Bigha Zamin) (১৯৫৩, হিন্দি): বিমল রায় পরিচালিত এই কাল্ট ক্লাসিক চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত পরিচালনা সলিল চৌধুরীর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। এই ছবিটি তাঁর লেখা একটি ছোটগল্প 'রিকশাওয়ালা' অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল।

'মধুমতী' (Madhumati) (১৯৫৮, হিন্দি): এই চলচ্চিত্রের সঙ্গীত তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।

'আনন্দ' (Anand) (১৯৭১, হিন্দি): হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে তাঁর সুরারোপিত গানগুলি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

'চেম্মীন' (Chemmeen) (১৯৬৫, মালয়ালম): এই মালয়ালম চলচ্চিত্রের সঙ্গীত তাঁকে জাতীয় স্তরে খ্যাতি এনে দেয় এবং এটি জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র ছিল।

'পরখ' (Parakh) (১৯৬০, হিন্দি): এই চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছিল।

'ছোটি সি বাত' (Chhoti Si Baat) (১৯৭৬, হিন্দি): বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত এই ছবির গানগুলিও শ্রোতাদের মন জয় করেছিল।

'কাবুলিওয়ালা' (Kabuliwala) (১৯৬১, হিন্দি): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

'মৃগয়া' (Mrigayaa) (১৯৭৬, হিন্দি)। মৃণাল সেনের এই হিন্দি ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন।

'অকালের সন্ধানে' (Akaler Shandhaney) (১৯৮০, বাংলা)। মৃণাল সেনের এই হিন্দি ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন।

এছাড়াও তিনি বাংলা চলচ্চিত্র 'পরিবর্তন' (Poribartan) (১৯৪৯), 'পাশের বাড়ি' (Pasher Bari) (১৯৫২), 'গঙ্গা' (Ganga) (১৯৬০) এবং আরও অনেক চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।

সলিল চৌধুরীর জনপ্রিয় গান: সলিল চৌধুরীর সুরারোপিত কিছু চিরস্মরণীয় গান:

বাংলা গান:

গাঁয়ের বধূ, আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা, ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা, দূর নয় বেশি দূর, না মন লাগে না, ধিতাং ধিতাং বোলে, সাত ভাই চম্পা জাগোরে ইত্যাদি।

হিন্দি গান:

ধরতি কহে পুকারকে,/ বীজ বিছালে প্যার কে, /মৌসম বিতা যায়, মৌসম বিতা যায়’- চলচ্চিত্র: দো বিঘা জমিন

অ্যায় মেরে পেয়ারে ওয়াতন (Aye Mere Pyare Watan) - চলচ্চিত্র: কাবুলিওয়ালা

কহি দূর জব দিন ঢল জায়ে (Kahin Door Jab Din Dhal Jaye) - চলচ্চিত্র: আনন্দ

জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি (Zindagi Kaisi Hai Paheli) - চলচ্চিত্র: আনন্দ

দিল তড়প তড়প কে কহ রহা হ্যায় (Dil Tadap Tadap Ke Kah Raha) - চলচ্চিত্র: মধুমতী

আজা রে পরদেশি (Aaja Re Pardesi) - চলচ্চিত্র: মধুমতী

চড় গয়ি পাপি বিছুয়া  - চলচ্চিত্র: মধুমতী

ঘড়ি ঘড়ি মেরা দিল ধড়কে - চলচ্চিত্র: মধুমতী

সুহানা সফর অর ইয়ে মৌসম (Suhana Safar Aur Yeh Mausam) - চলচ্চিত্র: মধুমতী

ও সজনা বরখা বাহার আয়ে (O Sajna Barkha Bahar Aayi) - চলচ্চিত্র: পরখ

না জানে কিউঁ হোতা হ্যায় (Na Jane Kyon Hota Hai) - চলচ্চিত্র: ছোটি সি বাত

মালয়ালম গান:

মালারকদি পোল (Malarkodi Pole) - চলচ্চিত্র: চেম্মীন

তাঁর গানগুলি লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং শ্যামল মিত্রসহ আরও অনেক কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘আনন্দ’, ‘ছায়া', ‘পরখ’, ‘মেরে আপনে’ ইত্যাদি ছবিতে জনপ্রিয় হয়েছিল সলিল চৌধুরীর সুর।

চলচ্চিত্রের জন্য লেখালেখি:

'দো বিঘা জমিন' (Do Bigha Zamin): মূলতঃ সলিল চৌধুরীর লেখা একটি বাংলা ছোটগল্প 'রিকশাওয়ালা' (Rickshawala) অবলম্বনে বিখ্যাত পরিচালক বিমল রায় হিন্দি চলচ্চিত্র 'দো বিঘা জমিন' তৈরি করেন। এই ছবিটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জেতে। সলিল চৌধুরী এই ছবির কাহিনীকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

'পিঞ্জরে কে পাঞ্ছি' (Pinjre Ke Panchhi): ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি চলচ্চিত্র 'পিঞ্জরে কে পাঞ্ছি' পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী নিজেই এবং এই ছবিটির গল্প ও চিত্রনাট্য তাঁর নিজেরই লেখা ছিল।

অন্যান্য লেখা: তিনি বেশ কিছু ছোটগল্প এবং নাটকও লিখেছিলেন, যার মধ্যে কয়েকটি হলো 'ড্রেসিং টেবিল' (Dressing Table) এবং 'শূন্য পূরণ' (Sunya Puron)। তাঁর লেখা নাটক 'চাল চোর' (Chaal Chore) মঞ্চস্থ হয়েছিল। এই লেখালেখির মাধ্যমেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও সামাজিক সচেতনতা ফুটে উঠত।

অপ্রকাশিত চলচ্চিত্র: তিনি একটি বাংলা চলচ্চিত্র 'এই ঋতুর এক দিন' (Ei Ritur Ak Din) লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং সেটি পরিচালনাও করতে চেয়েছিলেন, যদিও ছবিটি শেষ পর্যন্ত তৈরি হয়নি।

গীতিকার সলিল চৌধুরী:

সলিল চৌধুরী একজন প্রতিভাবান গীতিকার ছিলেন। যদিও তিনি বেশিরভাগ সময় সুরকার হিসেবেই পরিচিত। বহু কালজয়ী গানের কথা তাঁরই লেখা। তাঁর লেখা গানগুলির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর সামাজিক চেতনা, রাজনৈতিক দর্শন এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।

সলিল চৌধুরীর গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য:

সমাজতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাব: সলিল চৌধুরী বামপন্থী রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর লেখা অনেক গানে মেহনতি মানুষের জীবন সংগ্রাম, শোষণ এবং বিপ্লবের কথা ফুটে উঠেছে। 'দূর নয় বেশি দূর' এবং 'ধিতাং ধিতাং বোলে' গানগুলোতে এই রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট।

গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি: তিনি তাঁর শৈশবের গ্রামীণ জীবন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য নিজের গানে তুলে ধরেছেন। 'গাঁয়ের বধূ' গানটি এর একটি নিখুঁত উদাহরণ, যা বাংলা গানের জগতে একটি মাইলফলক হিসেবে পরিচিত।

দার্শনিক গভীরতা: তাঁর কিছু গানে জীবনের গভীর দর্শন ও প্রশ্নবোধক বিষয়াবলী উঠে এসেছে। 'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা' গানটিতে মানুষের অস্তিত্ব এবং ভাগ্যের প্রশ্ন রয়েছে।

সলিল চৌধুরীর লেখা কিছু জনপ্রিয় গান:

'গাঁয়ের বধূ': এই গানটি বাংলা লোকগীতির এক অনন্য রূপ এবং এটি তাঁর নিজের লেখা।

'ধিতাং ধিতাং বোলে': এটি মূলত একটি গণনাট্যের গান ছিল, যা পরে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা': এই দার্শনিক গানটি তাঁর লেখা।

'দূর নয় বেশি দূর': এটিও একটি রাজনৈতিক ও আশাবাদী গান।

'ও আলোর পথযাত্রী': এটি একটি উদ্বোধনী গান যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রেরণা জুগিয়েছিল।

এছাড়াও, হিন্দি চলচ্চিত্রেও তিনি কিছু গানের কথা লিখেছিলেন, যদিও সেখানে তিনি মূলত সুরকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। মালয়ালম চলচ্চিত্রেও তিনি গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন। সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত এবং কথা উভয় ক্ষেত্রেই তার বহুমুখী প্রতিভা এবং গভীর সংবেদনশীলতার ছাপ স্পষ্ট।

সাহিত্যে সলিল চৌধুরী:

সঙ্গীতের পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যিক অবদান তাঁর সৃজনশীলতার গভীরতা প্রমাণ করে। সলিল চৌধুরী ছিলেন একজন প্রতিভাবান লেখক ও কবি, যিনি সঙ্গীত ছাড়াও বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ছোটগল্প, নাটক, কবিতা এবং প্রবন্ধ।

সলিল চৌধুরীর সাহিত্যকর্মের প্রধান দিকগুলি:

ছোটগল্প:

তিনি বেশ কয়েকটি ছোটগল্প রচনা করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছোটগল্প 'রিকশাওয়ালা', যা পরে বিমল রায়ের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র 'দো বিঘা জমিন' (১৯৫৩) হিসেবে নির্মিত হয়। তাঁর গল্পের মূল বিষয় ছিল গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের সংগ্রাম, শোষিত মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক বৈষম্য। তাঁর লেখা অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে 'ড্রেসিং টেবিল'।

নাটক:

সলিল চৌধুরী নাটকও লিখেছেন। তাঁর লেখা একটি জনপ্রিয় নাটক 'চাল চোর', যা মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকের মাধ্যমেও তিনি সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা এবং তৎকালীন সমাজের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে চেয়েছেন।

প্রবন্ধ ও সঙ্গীত বিষয়ক লেখা:

তিনি সঙ্গীত তত্ত্ব, পশ্চিমা সঙ্গীত এবং ভারতীয় সঙ্গীতের মিশ্রণ নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখেছেন। যেখানে তাঁর সঙ্গীত দর্শন এবং গবেষণা ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় 'সঙ্গীতের ভুবনে' নামে একটি বই লেখার কাজ শুরু করেছিলেন, যেখানে তিনি সঙ্গীতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু বইটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

কাব্যিক ভাষা:

তাঁর গানগুলোর মতোই তাঁর লেখা গল্প ও নাটকের ভাষা ছিল অত্যন্ত কাব্যিক, মর্মস্পর্শী এবং বাস্তবধর্মী। সলিল চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতার প্রকাশ ছিল। তাঁর লেখালেখি তাঁর সঙ্গীতের মতোই সমাজসচেতন এবং শৈল্পিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ।

বিপ্লবের সুর:

সলিল চৌধুরী ছিলেন ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিটিএ) সক্রিয় সদস্য। বাম আদর্শকে তিনি সংগীত থেকে আলাদা করতে পারতেন না। তাঁর সংগীত যে বামপন্থী রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল, সে কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। গণসংগীত রচনার মাধ্যমে তাঁর গানের জগতে প্রবেশ।

১৯৪৫ সালে বিদ্যাধরী নদীর ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত চাষিভাইদের জন্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে তিনি তৈরি করেছেন তাঁর প্রথম গণসংগীত, ‘দেশ ভেসেছে বানের জলে/ ধান গিয়েছে মরে।’ একই সময়ে কৃষক আন্দোলনে সক্রিয় কৃষকদের হয়ে তিনি তৈরি করেছেন, ‘পৌষালি বাতাসে পাকা ধানের বাসে’, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে/ ধান দেব মেপে’, ‘তোমার বুকে খুনের চিহ্ন খুঁজি এই আঁধারের রাতে’।

১৯৪৬ সালের নৌ বিদ্রোহ সমর্থন করে সলিল চৌধুরী লিখলেন ‘ঢেউ উঠছে/ কারা টুটছে’। সলিল চৌধুরী আত্মজীবনীতে লিখেছেন- ‘কমরেড বীরেশ মিশ্র ডেকে বললেন, উত্তরবঙ্গের রেলশ্রমিকদের মধ্যে ঘুরেফিরে গান বাঁধতে হবে। রেলগাড়ির চাকার শব্দে যে ছন্দের স্পন্দন, তা থেকেই গান তৈরি হলো “ঢেউ উঠছে/ কারা টুটছে/ আলো ফুটছে/ প্রাণ জাগছে, জাগছে, জাগছে।”

তেভাগা আন্দোলন নিয়ে সলিল চৌধুরী গান বাঁধলেন, ‘হেই সামালো ধান হো’, ‘মানবো না এ বন্ধনে’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’। যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘জন্মভূমি’, ‘হাতে মোদের কে দেবে’, ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’, ‘কালো মেয়ে’, ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে’ ও ‘শান্তির গান’ প্রভৃতি অনবদ্য স্মরণীয় গান রচনা ও সুরকার হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।

ক্যয়ার ধারা:

বিদেশি ক্যয়ারের ধারায় আকৃষ্ট হয়ে সলিল চৌধুরী বোম্বে ইয়ুথ কয়্যার তৈরি করেন। এরপর ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার ও ন্যাশনাল ইয়ুথ ক্যয়ার তৈরি করতে হাত লাগান। ১৯৭৯ সালে তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় ক্যালকাটা কয়্যার৷ তারপর তিনি তৈরি করলেন কলকাতা কয়্যার।

৪৬ বছরে পা দিয়েছে কলকাতা কয়্যার। ক্যালকাটা কয়্যারের ডিরেক্টর তথা সুরকার কল্যাণ সেন বরাট বলন, যে ধারা সলিল চৌধুরী গণসংগীতে নিয়ে এসেছিলেন, সেটি কয়্যারের ধারা।

যেটি এসেছে ইউরোপিয়ান চার্চ থেকে। সেই ধর্মীয় সংগীতের ধারাকে সেকুলারভাবে ব্যবহার করে বোম্বে ইয়ুথ কয়্যার তৈরি করেন। গণনাট্য সংঘে তিনি এই অভিনব ধারার প্রচলন করেন। সলিলদা এখানে কয়্যার গানের জনক। সলিলদার সব গানেই, এমনকি আধুনিক গানেও সব সময় একটা প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকত।

১৯৪৯ সালে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সলিল চৌধুরীর নাম ছড়িয়ে পড়ল। যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় রেকর্ড করলেন ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’। বিষয়, সুর ও আঙ্গিকে একদমই স্বতন্ত্র এই গান। এরপর ‘অবাক পৃথিবী’, ‘রানার‘,  ‘ঠিকানা’, ‘পালকি চলে’ ইত্যাদি কবিতাতে তিনি সুর সংযোজন করেন।

গণসংগীতের ধারাতে নবজোয়ার আনে হেমন্ত-সলিল জুটির ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘পথে এবার নামো সাথি’। জনপ্রিয় হয় ‘শোনো কোনো একদিন’, ‘দুরন্ত ঘূর্ণির’, ‘আমি ঝড়ের কাছে’, ‘আমায় প্রশ্ন করে’ ইত্যাদি গান।

আধুনিক বাংলা গান:

সলিল চৌধুরীর সুরে লতা মঙ্গেশকরের গান কে না শুনেছে, ‘উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’, ‘মনের বসন্ত এসো’, ‘সাত ভাই চম্পা, ‘না যেয়ো না’, ‘ওগো আর কিছু তো নাই’, ‘ও মোর ময়না গো’, ‘পামাগারেসা’।

এসব গানের প্রসঙ্গে হৈমন্তী শুক্লা বলেন, ‘ছোটবেলায় ওর তৈরি লতাজির গাওয়া “আজ নয় গুনগুন”, “ও বাঁশি কেন” আমরা নিজেরাই গাইতাম। তখন তাঁকে চিনতাম না৷’

সলিল চৌধুরীর শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীত মেশানোর রীতি কেমন লাগত? হৈমন্তী শুক্লা বলেন, ‘খুব ভালো লাগত। এত ভালো লাগত যে বলে বোঝানো যাবে না। “মন বন পাখি চন্দনা” গানটা একাধারে শাস্ত্রীয় ও ওয়েস্টার্ন। এই গানটাতে খুব তান সারগম ছিল। উনি গানটা রেকর্ডের পর ছেলেমানুষি করে বলেছিলেন, “তোর ওস্তাদদের এই গানটা একটু শুনিয়ে দিস, গানটা কেমন বানিয়েছি!”

সলিল চৌধুরীর সুরে বাংলা গান গেয়েছেন কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সুবীর সেন, পিন্টু ভট্টাচার্য, অনুপ ঘোষাল, সাগর সেন, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী প্রমুখ প্রথিতযশা সংগীত শিল্পী।

ছোটদের গান:

একসময় বাঙালির শৈশব মানে বাড়িতে সলিল চৌধুরীর ছোটদের গানের ক্যাসেট অবশ্যই থাকবে। সেই ক্যাসেটের ওপর থাকত অল্প বয়সী অন্তরা চৌধুরীর হাসিমুখ। ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’, ‘সোনা ব্যাঙ ও কোলা ব্যাঙ’, ‘এক যে ছিল মাছি’, ‘হবু চন্দ্র গোবু চন্দ্র’, ‘পুজোর গন্ধ এসেছে’, ‘ইসকাবনের দেশে’, ‘খুকুমণি গো সোনা’, ‘ও মাগো মা’ ইত্যাদি গান বাঙালি শিশুদের কাছে এখনো সমান জনপ্রিয়।

সলিলকন্যা গায়িকা অন্তরা চৌধুরী বলেন, ‘অন্যান্য গানের মতোই সলিল চৌধুরীর ছোটদের গানে শুধু প্রাঞ্জল ভাষা বা স্বচ্ছ ধারণা নয়, তার মধ্যে মানুষের কথা ও সামাজিক বার্তা থাকে। পাশাপাশি বাবার যে সুর, এটা একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে গানে। আমার মতে এই গান চিরকাল থাকবে। বাচ্চারা এখনো এই গানগুলো খুব মজা করে গায়। এই গান কোনোদিন পুরোনো হবে না।’

বাংলাদেশ–যোগ:

সলিল চৌধুরীর বিপ্লবী শিল্পীসত্তা বিশ্বের বিভিন্ন মুক্তিকামী জনতার সপক্ষে সর্বদা সোচ্চার ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়েও সলিল চৌধুরীর গান রেখেছে প্রেরণাদায়ক ভূমিকা।

১৯৭১ সালের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বেজেছে ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’,‘মানবো না এ বন্ধনে’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’ ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’ এসব গান।

বাংলাদেশের দুটি চলচ্চিত্র সলিল চৌধুরী সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৭২ সালে মমতাজ আলী পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘রক্তাক্ত বাংলা’ ও ১৯৭৯ সালে আলমগীর কবির পরিচালিত ‘রূপালী সৈকতে’। ‘রক্তাক্ত বাংলা’ চলচ্চিত্রে ‘ও দাদাভাই’ জনপ্রিয় এই গান বাংলাদেশে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া একমাত্র গান। দুটি ছবিতে মোট আটটি গান ছিল, যেগুলোর শিল্পী ছিলেন মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, শ্যামল মিত্র, তালাত মাহমুদ ও সবিতা চৌধুরী।

বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা:

সলিল চৌধুরী ছিলেন এমন এক সংগীত পরিচালক, যিনি প্রায় সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। রাজ কাপুর একবার বলেছিলেন, সলিলদা এমন প্রতিভাধর যে তবলা থেকে সরোদ, পিয়ানো থেকে পিকোলো—সবই বাজাতে পারতেন। সলিলদা ভারতীয় জনপ্রিয় সংগীতকে শিখিয়েছিলেন, কীভাবে ব্যতিক্রমী পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যায়। তিনি ব্যবহার করেছিলেন ওবো, ফ্রেঞ্চ হর্ন, ম্যান্ডোলিন, স্যাক্সোফোন ইত্যাদি’

সলিল চৌধুরীর লেখা ‘আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে, অকুল দরিয়ার বুঝি কুল নাই রে’ গানটি রেকর্ড করার সময় মান্না দে’র টিমে অ্যাকোর্ডিয়ান যিনি বাজাতেন, বোম্বের মিস্টার মুরকি, তিনি বলেছিলেন, মান্নাদা, মাটির গান তোমার গলায় খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গান।

এমন অভিযোগ অনেকবারই উঠেছে যে সলিল চৌধুরীর গানে পশ্চিমা প্রভাব বেশি। তিনি নিজে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘হারমোনিয়ামও মূলত পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র। সময়ের স্বাদ অনুযায়ী সংগীতকে সব সময় নতুন রূপে রূপান্তরিত হতে হবে। তবে এই যাত্রায় নিজের ঐতিহ্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’

টেবিল টেনিসের নেশা:

সঙ্গীতজগতের অনেকেই তাঁকে সুরের গুরু মনে করেন। বাংলা গানে হেমন্ত-সলিল জুটি বা লতা-সলিলের গান শ্রোতাদের কাছে চিরকাল প্রিয় থাকবে। খ্যাপাটে স্বভাবের জন্যও পরিচিত ছিলেন সলিল চৌধুরী। গুলজার যেমন নিজের লেখায় জানিয়েছেন, তিনি দেখেছেন, টেবিল টেনিস খেলা মানুষটা পরক্ষণেই কেমন করে পিয়ানো নিয়ে সুর তুলতে মগ্ন হয়ে পড়লেন। এমনই ছিল সলিলের ‘সৃষ্টিশীল খ্যাপামি’।

সলিল চৌধুরীর সুর করা ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো’ গান প্রসঙ্গে জানা যায়, এক রাতে শ্যামল মিত্রের বাড়িতে থাকাকালে হঠাৎ নাকি ঘুম থেকে উঠে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে ‘ডাকিনী যোগিনী এল শত নাগিনী’ অংশটির সুর করতে লেগে পড়েন। গানটির এটি দ্বিতীয় অংশ।

তার আগপর্যন্ত প্রথম অংশেরই সুরটা তৈরি হয়েছিল। বাকিটা হয়ে ওঠেনি। পরে হৈমন্তী শুক্লাও সলিলের চরিত্রের এই বিশেষ দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘ভালোবাসি বলেই ভালোবাসি বলি না’ গানটি টানা তাঁকে দেননি। দিয়েছেন ধাপে ধাপে। সলিল চৌধুরীর গানে আরও একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তাঁর ছন্দের ব্যবহার। এ বিষয়ে তাঁকে বাংলা গানের সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলা চলে।

গ্রন্থতালিকা:

কবিতা: প্রান্তরের গান, সলিল চৌধুরীর গান (১৯৮৩), জীবন উজ্জীবন (আত্মজীবনী)।

চলচ্চিত্র তালিকা: পরিবর্তন, দুই বিঘা জমি, মায়া, কাবুলিওয়ালা, মধুমতি, পিঞ্জরে কে পাঞ্ছি, ড্রেসিং টেবিল, শূন্য পূরণ, চাল চোর, এই ঋতুর এক দিন।

পুরস্কার:

১৯৫৮ সালে মধুমতি সিনেমার জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা সঙ্গীত পরিচালক।

১৯৬৫ সালে 'চেম্মীন' মালয়ালম চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার।

১৯৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আলাউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার। 

১৯৮৮ সালে সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার।

২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা (মরণোত্তর)

ব্যক্তিগত জীবন:

১৯৫২ সালে সলিল চৌধুরী বিয়ে করেন চিত্রকর জ্যোতি চৌধুরীকে। তাঁদের তিন কন্যাসন্তান অলোকা চৌধুরী, তুলিকা চৌধুরী ও লিপিকা চৌধুরী। পরে গায়িকা সবিতা চৌধুরীকে বিয়ে করেন, এই সংসারে তাঁদের দুই কন্যা অন্তরা চৌধুরী ও সঞ্চারী চৌধুরী এবং দুই পুত্র সঞ্জয় চৌধুরী ও ববি চৌধুরী।

১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৬৯ বছর বয়সে সলিল চৌধুরী কলকাতায় পরলোকগমন করেন।

শেষকথা:

সিনেমার গান নিয়ে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বছরের পর বছর নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরি করেছে চলচ্চিত্র সংগীত। তাই যদিও চলচ্চিত্রগুলো ভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়, গানগুলো সেই ভাষা না জেনেও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আমি ১৩টি ভাষায় গান রচনা করে দেখেছি, গানগুলোর কথা যতই সাধারণ হোক না কেন, মানুষ সংগীতকে গ্রহণ করে। এভাবেই একটি বিশেষ ও সর্বজনীন পরিচয় পায় চলচ্চিত্রের সংগীত।’

সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা মনে করেন, সলিল চৌধুরী নিজের সময়ের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। উনি সেই সময় যে গান করে গিয়েছেন, তা আজকের দিনে ভীষণভাবে প্রযোজ্য। যেমন ওয়েস্টার্ন, তেমনি ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যালে ওর খুব দখল ছিল।

সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতে আধুনিকতার সঙ্গে লোকসঙ্গীত, পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সুর, জ্যাজ ও গণসংগীতের অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। তাঁর সুরে একাধারে রোমান্টিকতা, প্রতিবাদ, সামাজিক সচেতনতা এবং বৈচিত্র্যময় মেলোডি ধরা পড়ে।

তিনি ছোটগল্প লিখতেন এবং শক্তিশালী গল্পকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর লেখা গল্প থেকে বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সলিল চৌধুরী ভারতীয় সঙ্গীতে আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তাঁর সুর আজও সমান জনপ্রিয়, এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁর গান পুনর্নির্মাণ করে থাকেন।

জন্মশতবর্ষে এই প্রখ্যাত গুণী শিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers