মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

১৯৭০ সালের সেই রাত, যখন থেমে গিয়েছিল উপকূলের জীবন

মো. সাকিল তালুকদার ১২ নভেম্বর , ২০২৫, ১৬:১৬:৪৭

878
  • সংগৃহীত

আজ সেই দিন-১২ নভেম্বর। এই দিনটি বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) উপকূলবাসীর জীবনে এক বিভীষিকাময় কালরাত হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭০ সালের এই দিনে, বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা সাইক্লোন' ঘণ্টায় প্রায় ২২০-২৫০ কিলোমিটার গতির বাতাস এবং ভোলার বিস্তীর্ণ জনপদ-তজুমদ্দিন, মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহনসহ বৃহত্তর বরিশাল ও নোয়াখালী অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলো পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে।

আনুমানিক ১৫ থেকে ৩০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস যখন লোকালয়ের ওপর আছড়ে পড়েছিল, তখন প্রকৃতির সেই রুদ্রমূর্তি থেকে বাঁচতে পারেনি কোনো মানবসন্তান, থেকে গৃহপালিত প্রাণী। ভুক্তভোগীদের বিবরণে উঠে আসে মর্মান্তিক সব চিত্র—গাছে ঝুলে থাকা মানুষের মৃতদেহ, কাদা-পানিতে ভেসে যাওয়া অসংখ্য লাশ আর লাশের সৎকার করতে না পারার চরম অসহায়ত্ব।

প্রকৃতির এই তাণ্ডবে প্রায় ১০ লক্ষাধিক (বিভিন্ন সূত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ উল্লেখ করা হয়েছে) নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যার অধিকাংশই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের নিম্নাঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যান। মানুষের পাশাপাশি ভেসে গিয়েছিল অসংখ্য গবাদিপশু, নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ঘরবাড়ি, ফসল ও জনপদ। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই ছিল এককভাবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়।

প্রকৃতির রোষ মানুষের অসহায়তা

ভয়াল ১২ নভেম্বরের সেই রাতটি ছিল রোজার মাস, অনেকেই গভীর ঘুমে মগ্ন। কোনো প্রকার কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা বা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায়, উপকূলের মানুষ প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়সম জলোচ্ছ্বাসে সবকিছু ভেসে যায়। গ্রামকে গ্রাম পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।

স্বজনহারা মানুষের আহাজারি, লাশের স্তূপ, কাদা-পানিতে ভেসে যাওয়া মানুষের দেহ—সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। শুধু মানবদেহই নয়, লক্ষ লক্ষ গবাদিপশুর মৃতদেহও ভেসে গিয়েছিল সাগর-নদী-খালে। এই শতাব্দীর সেরা প্রাণঘাতী বিপর্যয়ের ক্ষত আজও উপকূলের মানুষের মনে দগদগে।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চরম উদাসীনতা

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা যেখানে চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, সেখানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, অমানবিক এবং চরম উদাসীনতার দলিল। মূলত এই ঘূর্ণিঝড়টিই ছিল তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য এবং দূরত্বের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

১. তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যে বিলম্ব: এত বড় একটি জাতীয় বিপর্যয়ের পরও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানসহ কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের কয়েকদিন পরেও যখন দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়, তখন সরকারের টনক নড়ে। ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয় অত্যন্ত বিলম্বে এবং তা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল।

২. ক্ষয়ক্ষতিকে লঘু করে দেখা: প্রাথমিক পর্যায়ে পাকিস্তান সরকার এই ধ্বংসলীলাকে অস্বীকার করার বা এর ভয়াবহতা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। দেশি-বিদেশি মিডিয়া এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্বীকার করতে তারা বাধ্য হয়।

৩. প্রশাসনিক গাফিলতি ও অবহেলা: দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, পানীয় জল, ওষুধ, এবং সৎকার কাজের ব্যবস্থা করতে প্রশাসন চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি, ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসলীলা পরিদর্শনের জন্য ইয়াহিয়া খান দেরিতে আগমন করেন এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত সফরও ছিল লোক-দেখানো।

৪. রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ: পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে সব সময়ই কলোনি বা উপনিবেশের চোখে দেখত। তাদের এই উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবন ও সম্পদ তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত না। এই বিপর্যয়ের পর সরকারের নির্লিপ্ততা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

স্বাধীনতার বীজমন্ত্র

১৯৭০ সালের এই ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে সৃষ্ট রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রধান অনুঘটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। একদিকে প্রকৃতির রোষ, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর চরম অবহেলা—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রহার বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য আরও বেশি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তোলে।

স্বৈরাচারী সরকারের এই অমানবিক আচরণের পরই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উপলব্ধি করে যে, তাদের নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষার জন্য একটি নিজস্ব ও দায়িত্বশীল সরকার অপরিহার্য। এই দুর্যোগের অব্যবহিত পরেই অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একাট্টা হয়ে নিজেদের অধিকারের পক্ষে রায় দিয়েছিল।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি লক্ষ লক্ষ স্বপ্ন, পরিবার এবং জীবনের অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক।

কিন্তু এই ভয়াবহতার মধ্যেও একটি রাজনৈতিক বার্তা নিহিত ছিল। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকারের চরম উদাসীনতা ও ত্রাণ কার্যক্রমে নজিরবিহীন ব্যর্থতা এই অঞ্চলের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। দুর্যোগের ভয়াবহতা প্রকাশের পরও তাদের চরম অবহেলা প্রমাণ করে যে, পূর্ব বাংলাকে তারা কলোনি ছাড়া আর কিছুই মনে করত না। এই মানবিক সংকটে সরকারের এই ঔদাসীন্যই তৎকালীন জনগণের মধ্যে স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্রুত দুর্গত এলাকায় ছুটে গিয়েছিলেন, উপকূলীয় এলাকা সফর শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হোটেল শাহবাগে (বর্তমানে পিজি হাসপাতাল ঢাকা) দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতা ও বাঙালির অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে বলেছিলেন, “দুর্গত এলাকা আমি সফর করে এসেছি। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে।

এভাবে আমরা মানুষকে মরতে দিতে পারি না। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এখনো দুর্গত এলাকায় আসেন নাই। আমরা যে কত অসহায় এই একটা সাইক্লোন তা প্রমাণ করেছে। আরো একবার প্রমাণিত হলো যে, বাংলার মানুষ কত অসহায়!” কিন্তু সরকারের অসহযোগিতা ও নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই ঘূর্ণিঝড় পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

আমাদের অঙ্গীকার

ভবিষ্যতে যেন আর কোনো ১২ নভেম্বরের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য প্রয়োজন টেকসই এবং কার্যকর উদ্যোগ। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে—

  • উপকূলীয় সুরক্ষা: উপকূলজুড়ে স্থায়ী, মজবুত ও উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
  • সতর্কতা ও যোগাযোগ: প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুততম সময়ে সঠিক দুর্যোগ সতর্কতা বার্তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • দুর্যোগ প্রস্তুতি: পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা।
  • তহবিল ও প্রশিক্ষণ: দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণকে প্রাথমিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত করা।

ভয়াল ১২ নভেম্বরের এই করুণ ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। আজকের বাংলাদেশে উন্নত আবহাওয়া বার্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকলেও, উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মজবুতিকরণ, পর্যাপ্ত আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মাণ এবং একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা সর্বদা সজাগ রাখা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

আজ এই ভয়াল দিনে আমরা কেবল নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করি না, বরং আমাদের দায়িত্ব হলো সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। বিগত অর্ধশতকে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও আজও অনেক এলাকায় মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়নি, যা প্রকৃতির এমন ভয়াবহ আক্রমণের সামনে অসহায়ত্বের সৃষ্টি করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা এখন আমাদের হাতে। কিন্তু এই সুবিধাগুলো যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক: লেখক,গবেষক,মানবাধিকার কর্মী ও প্রাক্তন প্রভাষক, সিটি ইউনিভার্সিটি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers