শনিবার, ৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২২ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

জাতির বিবেক তাজউদ্দীন আহমদের রক্তে লেখা ইতিহাসের আর্তনাদ

মো সাকিল তালুকদার ৪ নভেম্বর , ২০২৫, ১৬:২৫:৪৩

780
  • সংগৃহীতজাতির বিবেক

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কময়, হৃদয়বিদারক ও শিহরণ জাগানো একটি দিন। জাতির বুকে আঁকা হয় এক নৃশংসতম কালো অধ্যায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুরক্ষিত প্রাচীরের ভেতরেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের চার জাতীয় নেতা—ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এই হত্যাকাণ্ড ছিল যেন রাষ্ট্রের বুক চিরে বজ্রাঘাত, যা বাঙালি জাতির মূল্যবোধ, স্বাধীনতার চেতনা ও রাজনৈতিক নৈতিকতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

১৯৭১ সালের মহাসংকটময় সময়ে, যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, ঠিক সেই ভয়াবহ শূন্যতায় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও অদম্য দেশপ্রেমের ফলেই গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম বৈধ সরকার—যা ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় এই সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয় এবং তাজউদ্দীন আহমদই “মুজিবনগর” নামকরণ করেন, যা তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী ঘোষণা করেন। লক্ষণীয় যে, এই সরকার ছিল কোনো অস্থায়ী সরকার নয়; বরং এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সকল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সততা, নীতি, আদর্শ, প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়কত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—বাংলার মাটিতে যার তুলনা আজও বিরল। তাকে কারাগারের ভেতর হত্যা করা ছিল কেবল একজন মানুষকে নির্মূল করা নয়—এ ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও স্বাধীনতা-চেতনার মেরুদণ্ডে আঘাত। ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল বাংলাদেশের আত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে, ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—মহত্ত্ব, আদর্শ ও সত্যের মৃত্যু হয় না। তাজউদ্দীন আহমদ আজও বাঙালির বিবেক, চেতনা ও গৌরবের অমর আলোকস্তম্ভ।

জেল হত্যা দিবস শুধু শোকের দিন নয়; এটি জাতীয় জীবনে নৈতিক অবক্ষয়, বিশ্বাসঘাতকতা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের হত্যাকাণ্ডের স্মরণ দিবস। একইসঙ্গে এটি প্রতিজ্ঞা পুনর্নবীকরণের দিন—যে আমরা বিশ্বাসঘাতকতার কাছে মাথা নত করিনি, করবো না।

এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পূর্ণ বিচার, এবং চার জাতীয় নেতার আদর্শকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। তরুণ প্রজন্মকে তাদের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে—বিকৃত ইতিহাস নয়, সত্য-ইতিহাস।

আজকের উন্নয়নশীল ও অগ্রসরমান বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ৩ নভেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—এই স্বাধীনতা, এই রাষ্ট্র, এই লাল-সবুজ পতাকা এসেছে অগণিত আত্মত্যাগ, রক্ত, ত্যাগ ও চোখের জলের বিনিময়ে। তাজউদ্দীন আহমদের আদর্শ, সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম ধারণ করা—এই দিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম পথ।

আমাদের অঙ্গীকার হোক—

  • এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
  • জাতীয় ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
  • আগামী প্রজন্মকে জানাতে হবে তাজউদ্দীন আহমদ ও তার সহযোদ্ধাদের প্রকৃত অবদান।

কারণ, তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন না কেবল একজন নেতা—তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বিবেক, নৈতিক শক্তি এবং স্বাধীনতার শেষ আশ্রয়ভূমি।

লেখক, গবেষক ও প্রাক্তন প্রভাষক, সিটি ইউনিভার্সিটি।

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers