মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১ , ১৬ মুহররম ১৪৪৬

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

শত বছরেও দেখেনি কেউ এত পানি

ইউসুফ আলী বাচ্চু ৩ জুন , ২০২৪, ১৪:১৭:৩২

282
  • ছবি: নিউজজি২৪

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিনে দিনে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। গত ২ দশকে বেশ কয়েকটি বন্যা, খরা, অতি খরা তা প্রমাণ করে। এ বছর তাপমাত্রা প্রায় ৪৩ ডিগ্রী অতিক্রম করে। ফলে অসহ্য গরমে মানুষসহ সকল প্রাণিকূল তা অনুধাবন করে। হিটস্ট্রোকে মারা যায় বেশ কয়েকজন। পাশাপশি বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে জ্যমিতিক হারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, মানব বসতি এবং সমাজের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। মানুষের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী।

বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে তীব্র বৃষ্টিপাতসহ বিশ্বজুড়ে আরও চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটছে এবং পরবর্তীতে আরও বাড়বে। আবার কিছু কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে জলবায়ু পরিবর্তন এই বিধ্বংসী বৃষ্টি ও বন্যার কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিক আবহাওয়া ব্যবস্থার মধ্যেও বিপুল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা ছিল। মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে আগের চেয়ে ঘনঘন সামুদ্রিক ঝড় হচ্ছে। পৃথিবীর শুকনো অঞ্চলগুলোতে আগের চেয়ে বেশি বৃষ্টি ও বৃষ্টিজনিত বন্যা হচ্ছে। আর আর্দ্র অঞ্চলগুলো হয়ে পড়ছে আগের চেয়ে শুকনো। এ ধরনের পরিবর্তনগুলোকে এক কথায় বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মেরু অঞ্চলের বরফস্তর বা পর্বতমালার হিমবাহ অথবা সমুদ্রে ভাসমান বরফের বিশাল খণ্ডগুলো গলে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলো নোনা পানির নিচে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ হারাচ্ছে তার বাসস্থান, কৃষিজমি ও নিরাপত্তা।

এই জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাপদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির ২০১৪ সালের মূল্যায়নে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশে দাবদাহ ক্রমাগত বাড়ছে। একইভাবে, উত্তর অ্যামেরিকা ও ইউরোপে ভারি বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়েছে এবং কিছু দিন পরপরই বিশ্বের নানা জায়গায় একই উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদী বিধৌত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ আরও প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাণঘাতী দুর্যোগ ঝুঁকি আরও বাড়ার শঙ্কা আছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততাকে প্রধান প্রাকৃতিক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের সমর্থনে করা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থসহায়তা দেওয়া। ঐতিহাসিক এই চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বা সম্ভব হলে দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখতে বিশ্বের দেশগুলো একমত হয় এবং সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) ওয়ার্কিং গ্রুপ ২ এআর ৬ এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, যে সব প্রকল্পে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি হুমকি সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক অভিঘাতের সম্মুখীন হতে পারে যা প্রবৃদ্ধিকে থমকে দিবে।

প্রতিবেদনটির প্রধান লেখকদের অন্যতম সমন্বয়কারী ড. রওশন আর বেগম বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে আভাস দেয়া হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র পানির স্তর বৃদ্ধির কারণে শতাব্দীর মাঝামাঝি বা শেষের দিকে বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ হ্রাস পাবে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১ থেকে ২ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যূত হতে পারে।’ অতি-দারিদ্র্য, আয় বৈষম্য, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষতি এবং নিম্ন অভিযোজন সক্ষমতাসহ দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো আরো কঠিন হয়ে পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধান উৎপাদন ১২ থেকে ১৭ শতাংশ ও গম উৎপাদন ১২ থেকে ৬১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান নিঃসরণ পরিকল্পনার কারণে এই শতাব্দীতে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধি পাবে। আর এর ফলে দেশের কিছু অংশের কৃষি জমির ৩১-৪০ শতাংশ তলিয়ে যাবে। সমুদ্র পানির স্তর বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বন্যা এড়াতে আগামী দশকে দেশের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ পরিকল্পনার পুনঃবিন্যাস করতে হতে পারে। অধিকন্তু, প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে অবস্থিত, যেখানে দ্রুত কার্বণ নিঃসরণ বন্ধ করা না হলে অসহিষ্ণু উষ্ণতা ও আদ্রতা দেখা দিবে। যদি নিঃসরণ বৃদ্ধি পেতেই থাকে, তবে চলতি বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশের কিছু অংশের উষ্ণতা ও আর্দ্রতা মানুষের সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ পানি সংকটে পড়বে। বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ পানি সংকটে রয়েছে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকায় ক্রমবর্ধমান বন্যার সৃষ্টি হবে।

এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন, বাজার, অর্থনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, বাংলাদেশে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেবে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি রপ্তানিও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের  ফলে  কৃষি উৎপাদন হ্রাস, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হ্রাস পেতে পারে। এই প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি হ্রাস ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধির জন্য অভিযোজনের পন্থাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

ঘুর্ণিঝড় রেমাল

ঘুর্ণিঝড় রেমাল সম্প্রতি আঘাত হেনেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও আমাদের বাংলাদেশে। এই ঝড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কোথাও ১৫ থেকে ২০ ফুটেরে মতো পানি বৃদ্ধি পায়। সরকারি হিসেব মতে ২০টি জেলার খসড়া হিসাবে ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গেল দুই দশকে উপকূলের মানুষ সিডর ও আইলা মতো দুটো বড় ঝড়ের তাণ্ডব দেখেছে। শক্তিতে বড় হলেও অল্পসময় তাণ্ডব চালিয়েছিল এই দুই সুপার সাইক্লোন। কিন্তু শক্তিতে মাঝারি মানের হলেও ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূল জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। আঘাত হানার সময় দুবার সাগরের জোয়ার শক্তি জুগিয়েছে ঘূর্ণিঝড়টিকে। দীর্ঘ সময় জুড়ে বৃষ্টি, প্রবল বাতাস আর জোয়ারের পানি তছনছ করে দিয়েছে উপকূলীয় এলাকা।

দীর্ঘ সময় ভারী বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়েছে, সাথে ছিলো প্রবল বাতাস। এই কারণে বেশিরভাগ গাছ উপড়ে পড়েছে এবং গাছচাপা পরে মারা গেছে মানুষ। ভেঙেছে বসতবাড়ি। মাটি নরম হওয়ায় পানির তোড়ে ভেঙেছে বেড়িবাঁধ। লবণপানি প্রবেশ করায় উপকূলে এখন খাবার পানির তীব্র সংকট। সেইসাথে ক্ষতিতে পড়েছে ফসলি জমি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতের। উপকূলের পানির তোড়ে ভেসে গেছে হাজার হাজার পুকুর আর ঘেরের মাছ। উপকূলবাসী বলছেন, প্রাণহানি কম হলেও আর্থিক ও প্রাকৃতিকভাবে বড় ক্ষতি করে গেছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল।

সিডর: বাংলাদেশে সিডরের আগে যে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত করেছিল, সেগুলোর কোনো নাম ছিল না। এর আগের বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হতো। এ অঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে, তার নাম দেয়া হয় ২০০৪ সালে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা শ্রীলঙ্কার দেয়া নাম অনুসারে সিডরের নামটি ঠিক করে, যার অর্থ চোখ।

২০০৭ সালে ১৪ নভেম্বর প্রতিবেশী দেশের রাজ্য ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের বিপদসংকেত জারি করে। একই দিন রাত আটটার পর বাংলাদেশের মোংলা বন্দরের সব কার্যক্রম ও রাত ১০টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়া হয়। ঝড়ের আশঙ্কায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (তখনকার নাম জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) বিশেষ সতর্ক ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে। পরদিন ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে নৌ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এর পরের দিন ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় সিডর। আঘাতের সময় সিডরের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার। তবে এ সময় দমকা হাওয়ার বেগ উঠছিল ঘণ্টায় ৩০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। সিডরের প্রভাবে উপকূলে ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। সিডর এতটা ভয়াবহ ছিল, তা বোঝাতে পশ্চিমা গণমাধ্যম ঘূর্ণিঝড়টিকে সে সে সময় ব্যাখ্যা করেছিল ‘এ সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম উইথ কোর অব হারিকেন উইন্ডস’ হিসেবে। আমাদের বরাত ভালো এ কারণে যে সিডর ভরা জোয়ারের সময় উপকূলে আছড়ে পড়েনি। এতে প্লাবণ কম হয়েছে। নাহলে মানুষের মৃত্যু আরও অনেক বেশি হতে পারত। সে সময় মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থা রেড ক্রিসেন্ট বাংলাদেশের প্রধান ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানির কথা বলেছিলেন। তবে সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, প্রাণহানি হয়েছে ছয় হাজারের মতো। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বাহাস ও মতান্তর নতুন কিছু নয়। নানা কারণ আর চাপে সব সময় সবার আঁচ অনুমান এক হয় না। সিডরে অবকাঠামোগত অনেক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে মানুষের বাড়িঘর ভেসে যায়। গবাদিপশুর মৃত্যু হয়। ফসলের ক্ষতি হয়। নেমে আসে বিপর্যয়।

১৫ নভেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের গতি বাড়তে থাকে। রাত ৯টার দিকে সিডর প্রথম আঘাত হানে সুন্দরবনের কাছে দুবলারচরে। এরপর বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের কাছে উপকূল অতিক্রম করে। সিডরের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চল। ধ্বংসযজ্ঞ চলে বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, ঝালকাঠিসহ দেশের প্রায় ৩১টি জেলায়।

সিডরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয় বাগেরহাট আর বরগুনা। সরকারি হিসাবে বাগেরহাট জেলায় নিহত হন ৯০৮ জন ও আহত হন ১১ হাজার ৪২৮ জন। বরগুনা জেলায় মারা যান ১ হাজার ৩৪৫ জন। নিখোঁজ ছিলেন ১৫৬ জন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা ছিল বাগেরহাটের শরণখোলা। আর শরণখোলার মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাউথখালী ইউনিয়ন। শরণখোলা ছাড়াও বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

সিডর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জায়গার অভাবে গণকবর দিতে হয়। অনেক লাশের কোনো পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। কাপড়ের অভাবে অনেক মরদেহ পলিথিনে মুড়িয়ে দাফন করা হয়। ঘটনার এক মাস পরেও ধানখেত, নদীর চর, বেড়িবাঁধ, গাছের গোড়া আর জঙ্গলের নানা আনাচকানাচ থেকে লাশ, লাশের অংশবিশেষ অথবা কঙ্কাল উদ্ধার হয়। কেউ কেউ সিডর আঘাত হানার অনেক দিন পর স্বজনদের কাছে ফিরেও আসেন। স্মৃতি হারিয়ে অনেকেই আর গ্রামের বাড়ি খুঁজে পাননি। ফিরতে পারেননি।

আইলা: ২০০৯ সালে উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেয়া একটি ঘূর্ণিঝড়। ২১ মে ভারতের কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে এর উৎপত্তি। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আইলা আঘাত হানে ২৫ মে। মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা এর নাম আইলা দেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার ব্যাস ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডর থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। এটি ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে। পরে বাতাসের বেগ কমে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি সিডরের তুলনায় কম হয়েছে। পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আইলার প্রভাবে খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে। এই দুই অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছে মোট ১৯৩ জন।

আম্ফান: সারা পৃথিবি যখন করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত তখনই সুপার সাইক্লোন ‘আম্ফান’র আঘাতে লন্ডভন্ড হয় দেশের উপকূলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও গাছপালা। অনেকেই ঘরহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাপন করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীর নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বের দেশে দেশে পরিবেশদূষণ, বন্যা, দাবদাহ, নতুন নতুন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার আগমন, সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য, উদ্ভিদের ক্ষতি সবকিছুই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার ফল।পরিবেশদূষণের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জনজীবনের ওপর। পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনের লক্ষ্যে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। সভা সমিতি নয় বরং প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। গাছ কাটার পরিবর্তে করতে হবে বৃক্ষরোপণ। পোড়া ইট তৈরি, স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর ধোঁয়া বা ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণকারী যানবাহন বাতিল করতে হবে। এখন প্রয়োজন নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, দিঘি, পুকুর, ঝরনা বা জলাশয় সংরক্ষণ করা। ভারসাম্যহীনতা বিশ্বজগতের জন্য একটি বিরাট হুমকি, সে কারণে মানব ও প্রাণী জগতের অস্তিত্ব চরম সংকটে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি হোক। মানুষের সচেতনতাই পারে বিশ্বকে রক্ষা করতে।

লেখক : সংবাদিক

নিউজজি/নাসি/এস দত্ত

 

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন