রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৩ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

‘দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি’

শ্যামা সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি , ২০২৪, ০০:৪১:০০

6K
  • ‘দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি’

নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে-এ নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভারত ভাগের আগেই। মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিতে প্রথম শুরু হয় এ আন্দোলন। এছাড়া, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে মৌলিক পার্থক্য ছিল। এসব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে ব্যবধান ছিল পাহাড়সম।                                                                                                                                                                                                                                                                        ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে আরবি হরফে বাংলা লিখন অথবা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আরবি করারও প্রস্তাব দেয়া হয়। এ ঘোষণায় পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয়। ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সে সঙ্গে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে ‘বাংলা ভাষা’ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তিত হয়। সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করে।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। জাতিসংঘের     ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এ দিবস ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের মানুষের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের স্বীকৃতি’। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। 

মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগÑ এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মর্যাদার আসনে আসীন হলেও এর রয়েছে ভিন্ন চিত্র। যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভাষার প্রতি নেই কোন অনুরাগ। ভাষারীতি, বানান রীতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে পরিবর্তন করার মাধ্যমে মাতৃভাষার অবমাননা চলছে প্রতিনিয়ত।

১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশ সরকার একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভবনের শুভ উদ্বোধন করেন। এর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই ছিল দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচিতি পত্রটি লেখা ছিল ইংরেজিতে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ‘ইনস্টিটিউট’ ও ‘বাংলা একাডেমি’র ‘একাডেমিতে’ও ব্যবহার করা হয়েছে ইংরেজি শব্দ।

অনাদরে-অবহেলায় আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান নিয়ে। স্কুল-কলেজে গুরুত্বসহকারে পড়ানো হচ্ছে না বাংলা পাঠ্যবই। এ বইয়ের গল্প ও কবিতা পড়ার আগ্রহ/প্রবণতা শিক্ষকদের মধ্যে নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই সে প্রবণতা আরও প্রকটভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা যায়। কারণ সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য মুখস্থ করতে হয় কবি পরিচিতি এবং গল্পের সারমর্ম।

বাংলা ভাষার প্রতি এ কী ধরনের আচরণ? এই মেরুদণ্ডহীন জাতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবস পালন করে একদিন। ২৬ মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর পালন করে একদিন। সারা বছরে কোন খবর থাকে না। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই শহীদ মিনারে চলে ধোয়া-মোছার কাজ। ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে চলবে আবার আগের মতোই।

সরকারি, বেসরকারি সকল ক্ষেত্রেই চলছে বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা। ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ, বাক্য গঠন ও বানান- কোনটির ক্ষেত্রেই শ্রদ্ধাশীল ও যত্নশীল নয়। এছাড়া, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ারও একই হাল। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ইংরেজি ভাষায় বাংলাকে উপস্থাপন করা। হায়! বাঙালি জাতি। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা ইংরেজি মাস ও সন ব্যবহারে অভ্যস্ত। সর্বজন স্বীকৃত। ভাষার জন্য এতো আন্দোলন, বুকের তাজা রক্তÑ কেবলই বৃথা! নিজের ভাষাকে ভালোভাবে জানা ও রপ্ত করার মধ্যে অহঙ্কারবোধ আছে। এছাড়া, অন্য কোন ভাষা জানা ও রপ্ত করা হলোÑ যোগ্যতা। কিন্তু তাতে অহংবোধের কিছু নেই। নিজেদের প্রতি যত্নশীল না হয়ে পশ্চিমা ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি অধিক দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। যা বিশ^ মানচিত্রে অন্য কোথাও নেই। অনুভব ও অনুরাগের ছোঁয়া দিয়ে অন্যদের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাই কি-না!   

ভাষা একটি জাতির গর্বের ও অহঙ্কারের। আর সে ভাষা যদি লড়াই করে ও বুকের তাজা রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়, তার প্রতি থাকবে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগ। বাংলা মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা। অথচ ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এখনো চলছে সংগ্রাম। সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর বিষয়টি কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে? নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কোন্ দিকে?

লেখক

অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ও প্রধান

কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ

উদ্দীপন।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers