মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ , ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩

Untitled Document
ফিচার

যুক্তরাষ্ট্রকে বদলে দিয়েছিলেন যে মানুষটি

নিউজজি ডেস্ক জানুয়ারী ১৭, ২০২২, ১৪:৪৮:১৫

176
  • ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা: নিগ্রো অধিকার আন্দোলনের অহিংসবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিং। পঞ্চাশ বছর আগে মার্টিন লুথার কিং তার শেষ ভাষণ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং অসামান্য এ ভাষণ দিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে আড়াই লক্ষ আমেরিকানের এক সমাবেশে।

‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ নামে লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দেয়া সেই বিখ্যাত ভাষণ বিশ্বের সর্বকালের সেরা বাগ্মিতার দৃষ্টান্তগুলোর অন্যতম হয়ে আছে।

সেদিন সাদা-কালো সকল ধর্ম-বর্ণের আমেরিকানই দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে এসে ওয়াশিংটনে সমবেত হয়েছিল, তাদের দাবি ছিল বর্ণবৈষম্যের অবসান। যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য অহিংস আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সোমবার মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস পালন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় এ বছর (১৭ জানুয়ারি) সোমবার পালিত হচ্ছে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস।

বিখ্যাত মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং সারা জীবন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ও কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকার আদায়ে লড়াই করে গেছেন। তার নেতৃত্বে আমেরিকায় কালো মানুষ পেয়েছে সাদা মানুষের সমান অধিকার। কিংবদন্তি নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি আমেরিকার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে এক কৃষ্ণাঙ্গ যাজক পরিবারে জন্ম নেন।

মাইকেল কিং সিনিয়র ও আলবার্টা উইলিয়ামস কিংয়ের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। প্রথমে তার নাম রাখা হয় মাইকেল কিং জুনিয়র। ১৯৩৪ সালে ছেলের ছয় বছর বয়সে বাবা মাইকেল বিখ্যাত জার্মান সংস্কারক মার্টিন লুথারের নামানুসারে ছেলের নাম রাখেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ১৯৫৫ সালে কিং ডেক্সর্টা অ্যাভিনিউয়ের ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি সরাসরি কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে মন্টগোমারিতে শুরু হয় ঐতিহাসিক বাস ধর্মঘট। ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর, বাসের আসনকে কেন্দ্র করে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্যেই বাসের সামনের দিকে বসার অধিকার ছিল না কালোদের।

শ্বেতাঙ্গ উঠলে সংরক্ষিত আসন ছেড়ে দিতে হবে এই নিয়ম মানলেন না কৃষ্ণাঙ্গ নারী রোজা পার্কস। তিনি প্রতিবাদ করলেন। এটা ছিল সরকারি আইনের লঙ্ঘন। রোজাকে থানায় নিয়ে ১০ ডলার জরিমানা করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে লুথার কিং ও অন্য কৃষ্ণাঙ্গ খ্রিস্টান ধর্মযাজকেরা বাস সার্ভিস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। টানা ৩৮১ দিন নানা প্রতিকূলতার পরেও কৃষ্ণাঙ্গদের সরকারি বাস বয়কট চলতে থাকলে সুপ্রিম কোর্ট বাসের এই বর্ণবিদ্বেষী ব্যবস্থাকে সংবিধান বিরোধী বলে ঘোষণা করেন। অবশেষে বাসে তাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ আন্দোলনে জয়ের পর কিংয়ের নাম ছড়িয়ে পরে গোটা আমেরিকায়। তার এই অহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেন বহু কৃষ্ণাঙ্গ নেতা। গোটা আমেরিকা জুড়েই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জেগে উঠতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় কিং ১৯৬৩ সালে সরকারের নেয়া বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষণা করেন। কিং তার অনুসারীদের নিয়ে দুই মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে যান। এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের শ্বেতাঙ্গদের সমান অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে হবে, কালোদের সর্বত্র প্রবেশাধিকার থাকতে হবে এবং শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে।

এমনি এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে অ্যালাবামার পুলিশ সমবেত জনতার ওপর দমনমূলক নিপীড়ন চালায়। মার্টিন লুথার কিংসহ আরও অনেকেই সে সময় গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনা ব্যাপক সাড়া জাগায় বিশ্বব্যাপী। এরপর তিনি স্থির করেন দেশ জুড়ে শুরু করবেন ফ্রিডম মার্চ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু হয় ওয়াশিংটন অভিমুখে পদযাত্রা। ১৯৬৩ সালে ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালে সমাবেত হয় প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ।

তাদের সামনে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন কিং, ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে’ (আই হ্যাভ আ ড্রিম)। ভাষণে তিনি বলেন, কীভাবে বর্ণবৈষম্য গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি তুলে ধরেন ভবিষ্যতের আমেরিকা নিয়ে তার আশাবাদ। যেখানে সব আমেরিকান হবে সমান। এটাই হবে সত্যিকারের স্বপ্নের আমেরিকা। তার এই বিখ্যাত ভাষণের প্রভাবেই ১৯৬৪ সালে আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আইন ও ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন প্রণয়ন করা হয়।

সেই বছর টাইমস পত্রিকা কিংকে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার দেয়। ১৯৬৪ সালে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল টেনেসির মেমফিস শহরে তার হোটেল কক্ষের ব্যালকনিতে দাঁড়ানো অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে নিহত হন।

মার্টিন লুথার কিং ও মহাত্মা গান্ধী

লুথার কিং ছাত্রবস্থায় ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারিতে পড়ার সময় ভারতের অন্যতম রাজনীতিবিদ এবং অহিংস মতবাদের জনক মহাত্মা গান্ধীর (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী) সম্পর্কে জানতে পারেন। মহাত্মা গান্ধীর লেখা পড়ে গান্ধীবাদী অহিংসা নীতিতে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন। গান্ধী সম্পর্কে তিনি আরও জানতে পারেন ১৯৫৯ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জহরলালের আমন্ত্রণে ভারত সফরকালে। তিনি গান্ধীর জন্মস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। কিং পরে লেখেন, যখন মন্টগোমারি বয়কট চলছিল, ভারতের গান্ধী আমাদের অহিংস সামাজিক সংস্কারের পথপ্রদর্শক ছিলেন।

মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলা

১৯৬৮ সালে যখন আততায়ীর গুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্টিন লুথার কিং নিহত হন, তখন আরেক প্রান্তে দক্ষিণ আফ্রিকার রুবেন দ্বীপে কারাগারের বন্দী ছিলেন একই আন্দোলনের আরেক কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা। দুজনেরই স্বপ্ন ছিল এক, কালো আর সাদা মানুষের বৈষম্য দূর করা। ম্যান্ডেলা আর কিংয়েরও কখনো দেখা হয়নি। অথচ কিং ও ম্যান্ডেলা দুজনেই মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিকে সমর্থন করতেন । ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ম্যান্ডেলার অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন কিংয়ের স্ত্রী কোরেটা স্কট কিং। অনুষ্ঠানে ভাষণ দানকালে নেলসন ম্যান্ডেলা আমেরিকার মানবাধিকার নেতা লুথার কিংয়ের বিখ্যাত ভাষণ ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে’ থেকে উদ্ধৃত করেন,

`Free at last, Free at last, Thank God almighty we are free at last.'

‘অবশেষে মুক্তি পেলাম, অবশেষে মুক্তি পেলাম,

সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা অবশেষে মুক্তি পেলাম।’

যুক্তরাষ্ট্রে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস পালন করার অনুমোদন পেতেও লেগেছে ১৫ বছর। আমেরিকার রক্ষণশীল ও বর্ণবাদ মনোভাবের শাসকগোষ্ঠী তাকে উগ্রবাদী, কমিউনিস্ট হিসেবেই অভিহিত করে গেছে বহুকাল। তাই কিংয়ের জন্মদিনকে সরকারি ‍ছুটি হিসেবে পালনের প্রস্তাব নাকচ হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে লাখ লাখ নাগরিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে দিনটি পালনের আইন পাস করা হয়।

নিউজজি/এস দত্ত/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন