বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮ , ১৪ জুমাদাউস সানি ১৪৪৩

ফিচার

কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা : বর্ণবাদের বিরুদ্ধে শান্তির অগ্রদূত

নিউজজি ডেস্ক ডিসেম্বর ৫, ২০২১, ১২:১৪:৫২

123
  • কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা : বর্ণবাদের বিরুদ্ধে শান্তির অগ্রদূত

ঢাকা: দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সরকারের বর্ণবাদী নীতির বিপক্ষে সংগ্রাম এবং ত্যাগের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কিংবদন্তি নায়ক তিনি। যে কজন বিশ্বনেতা গণমানুষের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার অনন্য পথিকৃৎ হয়ে আছেন, তাদেরই একজন নেলসন ম্যান্ডেলা।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার বিরল ত্যাগ, মূল্যবোধ, দর্শন ও দৃষ্টান্তমূলক সংগ্রামী জীবনের প্রতি শ্রদ্ধায় নতজানু হয়। তার পথের অনুসারী হয়ে পথ চলতে চায়, তিনি তেমনি একজন  আদর্শিক বিশ্বনেতা। তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতিও বলা হয়।

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই কালো কালো মানুষের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকেইতে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় টেমবু উপজাতির নেতা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় প্রবল আগ্রহী ম্যান্ডেলা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ফোর্ট হারারে বিশ্ববিদ্যালয় আর উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীনই তখনকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদী আচরণ প্রত্যক্ষ করেন নেলসন ম্যান্ডেলা। বর্ণবাদবিরোধী কর্মসূচীগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন তিনি। তার যুক্তিপূর্ণ চমৎকার সব বক্তৃতা অচিরেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 

১৯৪২ সালে তিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন এবং জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শাসকদের আনুকূল্য পাওয়া অভিজাত শ্রেণির অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩-এ আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগদানের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রবেশ করেন জাতীয় রাজনীতিতে।

এএনসির শীর্ষ বলয়ে ম্যান্ডেলার মত উচ্চশিক্ষিত নেতা খুব একটা ছিল না। ফলে খুব দ্রুতই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন তিনি। একই সাথে আইনজীবি হিসেবে সরকারের হাতে নির্যাতিত দলীয় কর্মীদের আইনি সহায়তা দেয়ায় দলে তার প্রভাব আরো বাড়তে থাকে। সেটিই বলি হয়ে দাঁড়ায় তার নৈতিক ও প্রতিবাদী পথচলায়। ১৯৫৬ সালে ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগে কয়েকজন সহকর্মীসহ গ্রেপ্তার হন ম্যান্ডেলা। যদিও ৫ বছর ধরে শতচেষ্টা করেও রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এতে করে ১৯৬১ সালে মুক্তি পান ম্যান্ডেলা। ততদিনে এএনসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার। তেমনি পরিস্থিতিতে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য দলের অভ্যন্তরে প্রস্তাব দেন ম্যান্ডেলা। ফলে গঠন করা হয় এএনসির সামরিক শাখা ‘উমখোনতে উই সিজয়ে’। এটির কর্মপন্থা ছিল, গেরিলা কায়দায় সরকারি বাহিনীর সাথে লড়াই করা। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে এসে একের পর এক সরকারি স্থাপনায় সফল হামলা চালিয়ে প্রশাসনের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে ওঠে এএনসি আর তার সামরিক শাখা।

১৯৬৩-তে আবারও গ্রেপ্তার হন ম্যান্ডেলা। রাষ্ট্রপক্ষ তখন অতীত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে সরকার উৎখাত প্রচেষ্টার জোরালো অভিযোগ তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বর্ণবাদী আচরণ সব আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিষয়টি সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং এই মামলাটির মাধ্যমেই নেলসন ম্যান্ডেলা বহির্বিশ্বে পরিচিতি পেতে শুরু করেন। কিন্তু সমর্থকদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে, আদালত ম্যান্ডেলাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। পরে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে কমিয়ে আনা হয়।

রায়ের পর আদালতে দাঁড়িয়ে দেয়া এক ভাষণে ম্যান্ডেলা শ্বেতাঙ্গদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা বসবাস করেন, দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সবার, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নয়।’ এসময় গণতন্ত্রের প্রতিও ম্যান্ডেলা তার পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেন। এরপর নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে যাওয়া হয় কেপ টাউনের রোবেন দ্বীপের কারাগারে। সেখানকার ভয়াবহ ও শোচনীয় পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেন ম্যান্ডেলা। সেখানে বই পড়ে, শরীরচর্চা করে সুশৃঙ্খল বন্দীজীবন কাটতে থাকে তার। বিষয়টি অন্যান্য বন্দীদেরও দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। কারাগারে ম্যান্ডেলার প্রভাব এতটাই ছিল যে, বেশ কজন শ্বেতাঙ্গ কারারক্ষীর সাথেও বন্ধুত্ব হয়ে যায় তার।

শুধু তাই নয়, ততদিনে কারাগারের বাইরেও ম্যান্ডেলা পরিণত হন দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা হিসেবে। তাকে কেন্দ্র করেই আরো জোরালো হতে থাকে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। দ্রুতই তার মুক্তির দাবি উঠতে থাকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয় দেশটির ওপর। প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এএনসি আর কারান্তরীণ ম্যান্ডেলার সাথে সমঝোতা আলোচনা শুরু করে সরকার। নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে সরকারের দেওয়া ‘শর্তাধীন’ মুক্তির একাধিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন ম্যান্ডেলা। অবশেষে মাথা নত করতে বাধ্য হয় বর্ণবাদী সরকার।

১৯৯০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ শেষে ‘নিঃশর্ত’ মুক্তি পান নেলসন ম্যান্ডেলা। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় মানুষের মধ্যে যেন নেমে আসে আকাশের ধ্রুবতারা। অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিসরে পরিবর্তন হতে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো ‘গণতান্ত্রিক’ করে নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গদের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে, দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’ নির্বাচন। কৃষ্ণাঙ্গদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে ৬৫% ভোট পেয়ে ক্ষমতাসীন হয় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)। নেলসন ম্যান্ডেলা নির্বাচিত হন দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। কদিন আগেও যে  কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল শ্বেতাঙ্গ শাসিত অধিকার বঞ্চিত, তাদের মুখে ফোটে অবারিত হাসির রোল, তারা যেন খুঁজে পায় জীবনবোধের যথার্থ সার্থকতা।

দায়িত্ব গ্রহণের পর দৃঢ়তার সাথে দেশ পরিচালনায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ম্যান্ডেলা। যাদের শোষণ ও মিথ্যাচারে ম্যান্ডেলাকে দীর্ঘ সময় কারাবাসে কাটাতে হয়েছে, তাদের সবাইকেই ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সফল এই রাষ্ট্রনেতা। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে বর্ণবাদী সরকারের নিপীড়নের চিত্রগুলো খুঁজে বের করতে আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিটি’ গঠন করা হয়। আর নেলসন ম্যান্ডেলা মনোনিবেশ করেন সাদা-কালো সবাইকে নিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার অবিরাম পথচলায়। যদিও তা বেশীদিন করার সুযোগ পাননি তিনি। ১৯৯৯ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে  উত্তরসুরী থাবো এমবেকির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করেন ম্যান্ডেলা। বিদায় জানান রাজনীতিকেও।

অবসরে যাওয়ার পরও নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যস্ততা থামেনি, স্বাধীনতা এবং বিশ্ব শান্তির এক পথিকৃৎ-এ পরিণত হয়ে ওঠেন তিনি। বর্ণময় জীবনের শেষ দিনগুলো নেলসন ম্যান্ডেলা কাটিয়েছেন পরিবারের একান্ত সান্নিধ্যে। ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক জীবনের মতো, নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা।

১৯৯৪ সালে তিনি ইভলিন মেসকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা উইনি ম্যান্ডেলাকে। কিন্তু এ যাত্রায়ও বিচ্ছেদ ঘটে ম্যান্ডেলা-উইনির। জীবনের পরিণত সময়ে এসে ৮০তম জন্মদিবসে তিনি তৃতীয়বার বিয়ে করেন মোজাম্বিকের সাবেক ফার্স্ট লেডি গ্রাসা মার্শেলকে।

নেলসন ম্যান্ডেলার এক ছেলে মারা গিয়েছিলেন এইডসে আক্রান্ত হয়ে। এ ঘটনার পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডস প্রতিরোধ এবং এর চিকিৎসা নিয়ে সোচ্চার হন। বাকী জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি দারিদ্র দূরীকরণ এবং এইডস নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ৬ সন্তান আর ১৭ নাতি-নাতনির সফল অভিভাবক নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০১৩ সালে ৫ ডিসেম্বর পৃথিবীর অন্যতম এই শ্রেষ্ঠসন্তান মৃত্যুবরণ করেন।

বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবনে বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। আলোচনার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চরমতম সমস্যা থেকে শান্তির পথে প্রবাহিত করার কৃতিত্বের জন্য ১৯৯৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় সাম্যের এই কীর্তিমান নেতাকে। অগণিতকাল ধরে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ুক নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম আর শান্তির বার্তা। পৃথিবী হয়ে উঠুক আরো মানবিক।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন