সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

ফিচার

শুদ্ধ সঙ্গীতের নিবেদিত পথিকৃৎ ফিরোজা বেগম

নিউজজি প্রতিবেদক জুলাই ২৮, ২০২১, ০২:৫১:৩৫

  • শুদ্ধ সঙ্গীতের নিবেদিত পথিকৃৎ ফিরোজা বেগম

ঢাকা : উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে অনন্য এক নাম ফিরোজা বেগম। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি নজরুল সঙ্গীতের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তিনি বাংলা সঙ্গীতের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচ্য। সঙ্গীতের সকল ক্ষেত্রে তাঁর ছিল সমান পদচারণা। তবে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে। 

নিজে নজরুলের কাছে গান শিখেছেন, তাকে গান শুনিয়েছেন। নজরুল তার গানের মুগ্ধশ্রোতা ছিলেন, এমনকি যখন কবি ভীষণ অসুস্থ, বোধশক্তিহীন, তখনও ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে নিজের লেখা গান শুনলে কবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। এ এক অনবদ্য সৃষ্টি সুখের উল্লাস।

আজ ২৮ জুলাই বাঙালির কিংবদন্তিতুল্য সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের জন্মদিন। ১৯৩০ সালের এই দিনে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান জেলা) রাতইল ঘোনাপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে ফিরোজা বেগম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল এবং মায়ের নাম বেগম কওকাবুন্নেসা। মূল নাম ফিরোজা বেগম হলেও শ্রাবণে জন্ম বলে আদর করে কেউ কেউ তাঁকে শ্রাবণী বলে ডাকতেন। আবার ফর্সা টুকটুকে বলে কেউবা ডাকতেন আনার নামে। তিনি ছিলেন বরাবরই অন্তর্মুখী স্বভাবের কিন্তু প্রচণ্ড মেধাবী।

ছোটবেলাতেই গানে ফিরোজা বেগমের হাতেখড়ি হয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গানে কণ্ঠ দেন। কোন এক গ্রীষ্মের ছুটিতে ছোট মামা আর চাচাতো ভাইদের সঙ্গে কলকাতায় গেল সে। ওরা তখন কলকাতায় থাকে। বন্ধুমহলে ভাগ্নীকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত মামা। ভাগ্নীও গান শোনাচ্ছে বোদ্ধাদের। ছোট্ট মেয়ের গায়কীতে মুগ্ধ সবাই। একদিন গুণিজনদের মজলিসে গান শুনিয়ে দারুণ তারিফও পেল সে। বাসায় ফিরে মামা বললেন-

‘জানিস তুই কাকে গান শুনিয়েছিস আজ?

ফিরোজার উত্তর- আমি কী করে জানব? আমি কি ওদের চিনি, দেখেছি নাকি কখনো!

মামা বললেন- ঐ যে টুপি পরা, বড় চুল, আসরের মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন, তোকে আদর করে পাশে বসালেন, উনি বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’

সে সময় অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে অডিশন দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু কলকাতায় স্থায়ীভাবে না থাকার কারণে সেখানে তিনি নিয়মিত হতে পারেন নি। ১৯৪২ সালে ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে ৭৮ আরপিএম ডিস্কে ইসলামী গান নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয়। কিছুদিন পর কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে উর্দু গানের রেকর্ড হয়। এ রেকর্ডের গান ছিল- ‘ম্যায় প্রেম ভরে, প্রীত ভরে শুনাউ’ আর ‘প্রীত শিখানে আয়া’।

গ্রামোফোন কোম্পানিতে তার সমসাময়িক ছিলেন- আংগুরবালা, ইন্দুবালাদের মত বিখ্যাত সব শিল্পীরা। তাদের মাঝেও তিনি শক্তভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। সেখানে রেডিওতেও সমানভাবে তার গান গাওয়া চলছিল। তখন আব্বাস উদ্দীন, কবি জসীম উদ্‌দীনের কাছে লোকসঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন এমনকি, পঙ্কজ মল্লিকের মত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মহারথিরা বাসায় গিয়ে তাকে রবীন্দ্র সঙ্গীতের তালিম দিতেন। আধুনিক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, পল্লীগীতিসহ সঙ্গীতের সকল ক্ষেত্রে তাঁর ছিল সমান পদচারণা ও জনপ্রিয়তা ।

মাত্র দশ বছর বয়সে ফিরোজা বেগম কাজী নজরুলের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে তালিম গ্রহণ করেন। নজরুলের গান নিয়ে প্রকাশিত তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৪৯ সালে। কাজী নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগম নজরুল সঙ্গীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলে। 

ফিরোজা বেগম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৮০টিরও বেশি একক সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। নজরুল সঙ্গীত ছাড়াও তিনি আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাত-সহ বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতে কণ্ঠ দিয়েছেন। জীবদ্দশায় তাঁর ১২টি এলপি, ৪টি ইপি, ৬টি সিডি ও ২০টিরও বেশি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়।

কলকাতায় বসবাসকালীন ১৯৫৫ সালে সুরকার, গায়ক ও গীতিকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৬৭ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। বিখ্যাত গান-“ওরে শুভ্রবাসনা রজনীগন্ধা”।  কমল দাশগুপ্ত ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। এ দম্পতির তিন সন্তান রয়েছে– তাহসিন, হামীন ও শাফীন। হামিন ও শাফিন রকব্যান্ড দল মাইলসের সদস্য।

১৯৬৮ সালে তার গাওয়া “শাওন রাতে যদি”র রেকর্ড এক সপ্তাহের মধ্যে দু'লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়। এজন্য জাপানের সনি কর্পোরেশনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সিবিএস তাকে গোল্ড ডিক্স দিয়ে সম্মানিত করে। বলা হয়ে থাকে, ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে জনপ্রিয়তা থেকেই নজরুলের গান নজরুল সংগীত নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে ঢাকা রেডিও ও ইসলামাবাদ রেডিওর উদ্বোধন হয়, তার গাওয়া গানের মধ্য দিয়েই।

সঙ্গীত অঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফিরোজা বেগম নানা পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এরমধ্যে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী স্বর্ণপদক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, স্যার সলিমুল্লাহ স্বর্ণপদক, দীননাথ সেন স্বর্ণপদক, বাচসাস পুরস্কার, সিকোয়েন্স পুরস্কার, সেরা নজরুল সঙ্গীতশিল্পী পুরস্কার (একাধিকবার), শ্রেষ্ঠ টিভি শিল্পী পুরস্কার (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে), নজরুল আকাদেমি পদক, চুরুলিয়া স্বর্ণপদক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজা বেগম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ‘বঙ্গ সম্মান’য় ভূষিত হন।

নজরুল সঙ্গীতের অমর এ কিংবদন্তি কিডনী জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নিরন্তর সঙ্গীতসাধনা আমাদের সঙ্গীতকে আলোকিত করেছে। নজরুল সঙ্গীতের কিংবদন্তি হিসেবেই তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন অগণিত ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়গহীনে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers