বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ , ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ফিচার

সিকান্দার আবু জাফর: দ্রোহ ও নান্দনিকতার মেলবন্ধন

বাহাউদ্দিন গোলাপ আগস্ট ৫, ২০২৬, ১৭:৩৫:৪৯

228
  • সিকান্দার আবু জাফর: দ্রোহ ও নান্দনিকতার মেলবন্ধন

বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পরিচালনা ও প্রাক-স্বাধীনতা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে সিকান্দার আবু জাফর এক সুনির্দিষ্ট ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ নদ সংলগ্ন তেঁতুলিয়া গ্রামের এক পীর পরিবারে তাঁর জন্ম। পুরো নাম সৈয়দ আল হাশেমী আবু জাফর মোহাম্মদ বখ্ত সিকান্দার এবং পিতা সৈয়দ ফজলুল আকবর। ১৯৩৬ সালে তালা বি ডি ইনস্টিটিউট থেকে প্রবেশিকা এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করলেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে তিরিশ ও চল্লিশের দশকের প্রক্ষুব্ধ কলকাতার রাজনৈতিক পরিবেশই তাঁর ভাবজগৎ নির্মাণ করেছিল। ১৯৩৯ সালে কলকাতার মিলিটারি অ্যাকাউন্টেস বিভাগে চাকরির পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ডক শ্রমিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে। পরবর্তীতে সত্যানন্দ মজুমদারের 'গ্লোব নিউজ এজেন্সি' এবং ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠে তাঁর শ্রমজীবী মানুষের অধিকারমুখী সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে স্থায়ীভাবে ঢাকায় এসে রেডিও পাকিস্তানের কাজ এবং পরবর্তীতে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘মিল্লাত’ ও ‘সংবাদ’ পত্রিকার সাংবাদিকতার পথ পেরিয়ে ১৯৫৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা করেন সাহিত্য সাময়িকী ‘সমকাল’। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপের কঠিন সময়ে ‘সমকাল’ কেবল একটি সাময়িকী ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান প্রগতিশীল মাধ্যম। ১৯৪০-এর দশকের স্থূল প্রচারণামূলক রাজনৈতিক কবিতা এবং ১৯৫০-এর দশকের অতি-আমদানিকৃত অবাস্তব আধুনিকতাবাদের বিপরীতে ‘সমকাল’ প্রতিষ্ঠা করেছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উচ্চাঙ্গ শিল্পের এক সুদৃঢ় সংযোগ। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে ‘সমকাল’-এর সাহসী পদক্ষেপ এবং শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো লেখকদের বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে এটি আধুনিক বাংলা কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক অভিমুখ বদলে দিয়েছিল। শুধু সাহিত্য নয়, হাসান হাফিজুর রহমানের ইতিহাস সৃষ্টি করা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন প্রকাশ এবং জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের আঁকা প্রচ্ছদে ‘সমকাল’ সাহিত্য ও আধুনিক চিত্রশিল্পের এক সংযোগস্থল হয়ে ওঠে। নিজস্ব প্রেস ‘সমকাল মুদ্রায়ণ’ ও প্রকাশনা সংস্থাকে বাজি রেখে চরম আর্থিক অনটন ও ক্যানসারের যন্ত্রণার সাথে লড়াই করেও তিনি সম্পাদনার নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মান রক্ষা করেছিলেন।

কবি, নাট্যকার, অনুবাদক ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফরের প্রতিভার বিস্তার ছিল বহুমুখী। ‘প্রসন্ন প্রহর’ (১৯৬৫), ‘তিমিরান্তিক’ (১৯৬৫), ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ (১৯৬৫), ‘বৃশ্চিক লগ্ন’ (১৯৭১) ও ‘বাংলা ছাড়ো’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তিনি শোষিত মানুষের অধিকার ও নাগরিক মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক সংকট তুলে ধরেছেন। প্রথাগত আবেগের বদলে ক্লাসিক্যাল মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শৃঙ্খলে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। যখন তিনি লেখেন—“বাংলা ছাড়ো/ নয়তো তোমাকেই ছেড়ে যেতে হবে” কিংবা “তুমি আমার সোনার বাংলা কাড়তে পারো/ কিন্তু তোমার শাসন দিয়ে/ আমাদের এই জীবনটাকে বাঁধতে পারো?”—তখন পংক্তিগুলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি শাণিত বক্তব্য হয়ে ওঠে। তাঁর ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’ (১৯৬৫) ও ‘মহাকবি আলাওল’ (১৯৬৬) পাকিস্তানি আমলে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও রাজনৈতিক রূপক হিসেবে অনন্য নিদর্শন। নাটকে ও কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিশুসাহিত্য ‘রুমাল’, এলিনর ফারজনের ছড়ার অনুবাদ 'মালব কৌশিক' এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-র অনুবাদ ‘নৌকা ও সমুদ্র’ তাঁর সৃষ্টিশীল মেধার ব্যাপ্তিকে প্রমাণ করে।

সিকান্দার আবু জাফরের সৃষ্টির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক অবদান দেখা যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১-এর উত্তাল মার্চে তিনি ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী-লেখক সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে রাজপথে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এবং সুরকার শেখ লুৎফর রহমানের সুরারোপিত তাঁর গান—“জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই”—কেবল একটি সুর ছিল না; তা ছিল যুদ্ধরত জাতির একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ইশতেহার। গানটির ছান্দসিক গতি ও শাণিত উচ্চারণ অবরুদ্ধ দেশের ভেতর ও রণাঙ্গনে লড়াইরত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মপ্রত্যয় জোগাতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল।

জাফরের চিন্তাকাঠামো ছিল আন্তর্জাতিকতাবাদী সাম্যবাদে রোপিত। লাতিন আমেরিকার পাবলো নেরুদা যেমন ‘ক্যান্টো জেনারেলে’ স্বদেশের মাটি ও শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতিকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, কিংবা তুরস্কের নাজিম হিকমত যেভাবে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে কাব্যে স্থান দিয়েছিলেন—সিকান্দার আবু জাফর বাংলা কবিতায় ঠিক সেই একই প্রগতিশীল দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। ফরাসি প্রতিরোধ সংগ্রামের লুই আরাগোঁ কিংবা রুশ কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মতো তাঁর লেখনীও ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সাহিত্য ও জাতীয় অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৯৯ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় প্রয়াত হন এই সম্পাদক ও কবি।

সিকান্দার আবু জাফর কেবল অতীতের এক সম্পাদক বা কবি নন; তিনি প্রগতিশীল চেতনা ও অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক প্রতীক। সাহিত্যকে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং উচ্চাঙ্গ শিল্পমানের মেলবন্ধনে রূপ দেয়ার যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা আধুনিক বাংলা সংস্কৃতির অনন্য সম্পদ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বাকস্বাধীনতার সংকটের দিনে তাঁর সেই কাব্যভাষ্য—“আমাদের নদী তুমি বিষ দাও, জল দাও/ আমরা পান করব”—আজও আমাদিগকে আত্মমর্যাদা ও অধিকার সচেতন হতে শেখায়।

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী।  সভাপতি, ৭১’র চেতনা)

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers