মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৫ সফর ১৪৪৮

ফিচার

ইরান-আমেরিকা শান্তি চুক্তি যে লাউ সেই কদুই?

মাঈনুদ্দীন দুলাল জুন ১৭, ২০২৬, ২০:৩৩:৪৫

254
  • ছবি: রয়টার্স

ঢাকা: ইরান ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর ৪৭ বছরে দেশটি কয়েকটি যুদ্ধে জড়িয়ে ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধে পড়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিশাল জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক মন্দায় ধুঁকছে। জীবন যাত্রার মান নিম্নগামী ক্রমশ। সম্প্রতি আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দায় পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক অব ইরানের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ৬৫ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া গত আট বছরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী অনেকের জন্যে হাতের নাগালে বাইরে চলে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য-সংকটে পড়েছে।

ইরানের অর্থনীতির বর্তমান দূর্দশার তুলনামুলক চিত্র এভাবে পাওয়া যায়— ১৯৭৯ সালের গণ-আন্দোলনের আগে ইরানের মুদ্রা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল। তখন ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৭০ থেকে ৭১ ইরানি রিয়াল পাওয়া যেত। ওই সময় জ্বালানি তেলের শক্তিশালী রফতানি আয় এবং ব্যাপক পুঁজি প্রবাহের কারণে সরকার এই বিনিময় হারটি ধরে রাখতে পেরেছিল। তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পর থেকে দীর্ঘ চার দশকে আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে ইরানি মুদ্রার মান প্রায় ২০ হাজার গুণ কমে গেছে । বর্তমানে খোলা বাজারে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১৫ লক্ষ রিয়ালেরও বেশি।

১৯৭৯ সালের অভ্যুত্থানের আগে ইরানের অর্থনীতি ছিল দ্রুত সম্প্রসারণশীল, আধুনিক। তৎকালীন জাতীয়তাবাদী সরকার শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলের প্রায় ৪০ বছরে পশ্চিমাদের সহায়তায় দেশটিতে ব্যাপক শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ন ঘটেছিল।

ষাট ও সত্তরের দশকে তেল বিক্রির বিপুল অর্থ কাজে লাগিয়ে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল।

এই সময়ে তেলভিত্তিক আয়ের কারণে সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় এবং  মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যাপক বিস্তারও ঘটে। পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিকীকরণ ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার অধীনে শিল্প ও শিক্ষার প্রসার হয়। শহরাঞ্চলে জীবনযাত্রার মান, নারী অধিকার এবং শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

তবে উন্নয়নের পাশাপাশি ঐ সময়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত গণআন্দোলন ও বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাধারণ মানুষের এক বিশাল স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭৯ সালের আন্দোলন। বিভিন্ন স্তরের মানুষ, বিশেষ করে বামপন্থীদের অংশ গ্রহণ ছিল ব্যাপক। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তীতে ভিন্ন মতের মানুষের ওপর নেমে আসে নিপীড়ন। কয়েক লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ইসলামী সরকার রাষ্ট্রে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মুক্ত আবহ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে বাইরের দুনিয়ার সাথে তৈরি হয় দূরত্ব। তাকে কুটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে হয়।

১৯৭৯ সালের পর থেকে ইরানের অর্থনীতিতে মিশ্র পরিবর্তন দেখা গেছে। একদিকে দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু সাফল্য এলেও, ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মারাত্মক সংকটও তৈরি হয়েছে।

আমেরিকার সাথে দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ফাঁদে আটকে পড়ে দেশটি।

অর্থনৈতিক সংকটের একটি বড় কারণ তার সামরিক উচ্চাকাংখা। বিশাল সামরিক বহিনী ও অস্ত্র তৈরির খরচ তার দূর্বল অর্থনীতিকে আরও পঙ্গু করেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইরানকে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্ব বানিজ্য থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যার খেসারত এখনো তাকে দিতে হচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার মনে করেছে সামরিক সক্ষমতা তাদের প্রয়োজন। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার  কারণে।

ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ আজকের দিন পর্যন্ত ১১০ দিনে গড়াল। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ শান্তির দোড়গোড়ায় বলে মনে হচ্ছে।অনেক মূল্য দিয়েছে ইরানের জনগন। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি পড়েছে মন্দার কবলে। বড় ক্ষতি হয়েছে আমেরিকারও। তার একচেটিয়া আধিপত্য ও বিশ্ব মোড়লের দম্ভে ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে আরব বিশ্বে আধিপত্য প্রশ্নের মুখে।

ইরান যে পারমাণবিক শক্তির স্বপ্ন দেখেছিল তা বিসর্জন দিয়েই তাকে চুক্তিতে আসতে হচ্ছে। তবে ইরান অবরোধ মুক্ত হবে। চাইলে সে তার অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে পারবে। ইরানের জন্যে বড় সুযোগ মুক্ত আবহে দেশ গঠন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণ। ইরান কি সে পথে হাঁটবে?

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers