বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২৪ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার

বড় বাজেট, বড় চ্যালেঞ্জ: আশা নিরাশার দোলাচল

ড: মিহির কুমার রায় মে ৯, ২০২৬, ১৯:১৫:১৩

118
  • সংগৃহীত

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার। মোট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৈশ্বিক অৰ্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে বাজেটটি কল্যাণমুখী ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গঠনের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে।

মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীলতা এবং ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে জ্বালানির সংকট হওয়ায় ফের মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মোট দেশজ উপাদনের আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর আগে সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন সে সময়ের অমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। সে সময় দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও ছিল সাড়ে ৫০০ ডলারের কাছাকাছি। এর প্রায় ২০ বছর পর জাতীয় সংসদে বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

বর্তমানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩.৩৯ লাখ টাকা। আগামী বাজেট হবে বিএনপি সরকারের জন্য ১৫তম বাজেট। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। এতে নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড-এর মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে কোনো পরিকল্পনায় স্থিরও থাকতে পারছে না সরকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি। রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক নেতিবাচকতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। এ জন্য বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বাজেটে এক ধরনের রক্ষণাত্মক ও সংকোচনমুখী নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।

২০ বছর পর বিএনপি সরকারের জন্য এটি প্রথম বাজেট হওয়ায় রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। এ ছাড়া জনপ্রত্যাশা রয়েছে আরো বেশি। অবশ্য সব প্রত্যাশা ও চাপকে ছাপিয়ে গেছে এবারের বৈশ্বিক সংকট। যার ফলে সংকোচন নাকি সম্প্রসারণমুখী বাজেট দেবেন অমন্ত্রী তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। এ জন্য ২০ এপ্রিল বাজেট পরিপত্র-২ জারি করা হয়েছে। সেখানে তিন বছর মেয়াদি বাজেট পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য দ্বার উন্মোচন করার মতো বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বাজেটকে জনমুখী ও জনকল্যাণকর করতে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংসস্থানে গতি ফেরাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বহিঃখাত থেকে অর্থায়ন এনে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রতি। মানুষকে কষ্ট না দিয়ে, হয়রানি না করে বেশিসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। যেসব খাত এখনো অপ্রস্ফুষ্টিত রয়েছে, সেগুলোকে রাজস্ব আয়ের নতুন নতুন খাত হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে রাজস্ব খাতের আওতা বাড়াতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে যে ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তা হলো-কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি উদ্যাক্তা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। দেশীয় ও প্রবাসী শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং তরুণদের উদ্‌দ্যাক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অৰ্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতি সহায়তা ও আবৃদ্ধিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নও এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য । বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ও সম্প্রসারিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রোডম্যাপও বাজেটে প্রতিফলিত হচ্ছে।

এ লক্ষে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প বিকাশ এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আৰ্থিক খাত পুনর্গঠন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে আগামী বাজেটে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রতিবছর বাজেট থেকে সুদ পরিশোধ বাবদ যে  ব্যয় হয়, তার বড় অংশই যায় স্থানীয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। আগামী বাজেটে জিডিপি'র ৩১.৪ শতাংশ (বেসরকারি ২৪.৯ শতাংশ ও সরকারি ৬.৫ শতাংশ) বিনিয়োগ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের আকার হওয়া উচিত জিডিপির অন্ততপক্ষে ২৫ শতাংশ। সেই বিবেচনায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বেশি নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে-এই টাকা আমাদের পক্ষে এই মুহর্তে রাজস্ব হিসাবে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এই টাকা ব্যয় করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ উস হতে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। ভ্যালু ফর মানি নিশ্চিত করে এই টাকা ব্যয় করার সরকারের নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভুর্তকি কমানোর শর্ত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এ খাতে বরাদ্দ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকি বরাদ্দ পুরোপুরি প্রাক্কলন করা হয়নি।

আগামী অর্থবছর বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, এলএনজিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা ও খাদ্য সহায়তায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দসহ মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এখাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে অৰ্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কাংখিত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। তবে যদি দেশের গ্রোথ চান, বিনিয়োগ চান, তাহলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে।

অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান 'আন্ডার পারফর্ম' করছে এবং কর্মসংস্থানও কমছে। ব্যবসাবাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যবসাবাণিজ্য সহায়ক নীতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। সার্বিক আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অৰ্থবছরের বাজেট পেশ করা হতে পারে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাজেট আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব আলোচনায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পকে পর্যালোচনাও করা হচ্ছে। আশা করা যায় নতুন সরকার সব সমস্যার সমাধান কল্পে তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছাবে।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers