বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৬ সফর ১৪৪৮

ফিচার

প্রকৃতির গোপন ভাষা: বিজ্ঞানী জগদীশ বসুর কাব্যময় অন্বেষণ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ডিসেম্বর ২, ২০২৫, ২০:৪৫:২২

634
  • প্রকৃতির গোপন ভাষা: বিজ্ঞানী জগদীশ বসুর কাব্যময় অন্বেষণ

মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা—একই সুতোয় গাঁথা। এই চিরন্তন সত্যের অন্বেষণই মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম যাত্রা। প্রকৃতির নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই একাত্মতার সুর, সেই অখণ্ড প্রাণশক্তির রহস্য, যুগে যুগে ঋষিরা উপলব্ধি করেছেন ধ্যানে, আর আধুনিক কালের এক বাঙালি বিজ্ঞানী তাকেই প্রমাণ করলেন পরীক্ষাগারের কঠোরতম আলোয়। তিনি আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু- এক জীবন্ত জীবনদর্শন, যিনি প্রমাণ করেছিলেন, জড় বা জীব বলে কোনো বিভেদ নেই, বরং সবাই এক প্রাণশক্তির সূত্রে বাঁধা। এই মহামানব কেবল একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের জাতির প্রজ্ঞার আলোকমশাল এবং জ্ঞানের স্বাধীনতার প্রতীক। ১৮৫৮ সালে আজকের বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই মহাপুরুষের জীবন প্রমাণ করে, যখন স্বদেশ শৃঙ্খলিত থাকে, তখন একজন বিজ্ঞানীর কাজ শুধু পরীক্ষাগারের টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে দেশের আত্মমর্যাদা রক্ষার এক পবিত্র ব্রত।

উপনিবেশিকতার ঘোর অন্ধকারে যখন ব্রিটিশরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেদের একচ্ছত্র মালিক মনে করত, সেই কঠিন সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হয়েই জগদীশ চন্দ্র বসু এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন: তাঁর মতো দেশি অধ্যাপকের বেতন বিদেশিদের তুলনায় কম! তিনি এই অসম্মান নীরবে প্রত্যাখ্যান করলেন। টানা তিন বছর তিনি বেতন গ্রহণ করেননি, যা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির দম্ভের বিরুদ্ধে তাঁর অদম্য নৈতিক শক্তির নীরব কিন্তু বজ্রকঠিন প্রকাশ। তিনি প্রমাণ করলেন, মেধা বা জ্ঞান কোনো সাদা চামড়ার করুণার দান নয়। তাঁর এই সংগ্রাম ছিল ইউরোপীয় জ্ঞান-প্রভুত্বের বিরুদ্ধে এক মৌলিক দার্শনিক বিদ্রোহ। এই কঠিন পথে তাঁকে ছায়া দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসু, যাঁর নীরব সমর্থন ছাড়া এই সংগ্রাম হয়তো মাঝপথেই থেমে যেত।

জগদীশ বসুর লক্ষ্য কেবল বৈষম্যের অবসান ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যেন বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ে না পড়ে, হাতে-কলমে তার রহস্য উন্মোচন করতে পারে। তাই তিনি গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি বদলে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান চর্চার উপর জোর দিলেন। সত্যেন বোস-এর মতো প্রতিভাবান ছাত্রদের তিনি নতুন কিছু ভাবার সাহস জুগিয়েছেন। আর তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম স্বপ্ন ছিল বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করা। ১৯১৭ সালে দেশীয় অর্থায়নে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাঙালির স্বাবলম্বী হওয়ার এবং নিজের শক্তিতে বিশ্ব জয়ের এক প্রতীকী মডেল। এটি ছিল ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক মুক্ত গবেষণা ক্ষেত্রের শৈল্পিক প্রতিষ্ঠা।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে যখন তাঁর এই সংগ্রাম চলছে, ঠিক তখনই তাঁর আবিষ্কারের দীপ্তি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে তিনি মনোযোগ দিলেন বেতার তরঙ্গ গবেষণায়। ১৮৯৫ সালে তিনি এমন ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ তৈরি ও গ্রহণ করেন যে, তা আজকের মোবাইল যোগাযোগের মূল ভিত্তি স্থাপন করে। অবাক করার বিষয় হলো, তিনি এই আবিষ্কারকে বাণিজ্যিকভাবে পেটেন্ট দিতে চাননি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ছিল প্রাচ্য দর্শনের প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্যের প্রমাণ—জ্ঞান কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক ঐশ্বরিক উপহার। এই ত্যাগ তাঁকে ইতিহাসের পাতায় কেবল বিজ্ঞানী নয়, মহাকালের এক দার্শনিক ঋষি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এরপর তিনি পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন পথ ছেড়ে নিজেকে সমর্পণ করলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের এক নতুন অন্বেষণে। এই পরিবর্তন ছিল কেবল কাজের ক্ষেত্র বদল নয়, এটি ছিল জীব ও জড়ের ঐক্যের বৃহত্তর দার্শনিক সত্য প্রমাণের দিকে তাঁর নিঃসঙ্গ যাত্রা। এই সত্য প্রমাণের জন্য তিনি তৈরি করলেন ক্রেসকোগ্রাফ (Crescograph)-এর মতো অসাধারণ সংবেদনশীল যন্ত্র। এই যন্ত্রের সূক্ষ্ম কাঁটা দিয়ে তিনি বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন, উদ্ভিদও আঘাত বা উদ্দীপনায় আমাদের মতোই সাড়া দেয়, তাদেরও রয়েছে এক লুকানো চেতনা। ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী শুরুতে তাঁর এই কথা মানতে দ্বিধা করেছিলেন, কারণ তাঁরা এই ভাবনাকে কেবল আধ্যাত্মিকতা মনে করেছিলেন। কিন্তু জগদীশ বসু তাঁর যন্ত্রের কঠোর গাণিতিক প্রমাণ দিয়ে সেই সংশয় দূর করেন। ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসোঁর জীবনীশক্তির ধারণা যখন পশ্চিমে আলোচিত হচ্ছিল, তখন বসু যন্ত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন, ভারতীয় অদ্বৈতবাদের সত্যই বৈজ্ঞানিক সত্যের কেন্দ্রবিন্দু। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে এই জ্ঞান-সেতুর নির্মাতা হিসেবে দেখে 'বাংলার মুখোজ্জ্বলকারী' বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

১৯২০ সালে তিনি যখন রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ পেলেন, তখন এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিলো না, এটি ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে ভারতীয় মৌলিক গবেষণার চূড়ান্ত বিজয় বার্তা। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, একজন বিজ্ঞানী তার জাতির জন্য কতটা করতে পারে।

জগদীশ চন্দ্র বসুর জীবনে জ্ঞানকে মুক্ত করে দেয়ার যে দিব্য অঙ্গীকার ছিল, তা আজ এক করুণ প্রশ্ন হয়ে আমাদের সময়ে ফিরে আসে—যেখানে কেবল তাড়াতাড়ি ফল ভোগের লোভে আমরা জ্ঞানের মূল সুর ভুলে গিয়েছি। জগদীশ বসুর জন্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও কেন আমাদের গবেষণার আঙিনা আজও নিষ্প্রভ? এই ব্যর্থতা যেন এক বিষাদময় দীর্ঘশ্বাস, যা আমাদের প্রগতির দাবিকে বারবার মিথ্যা প্রমাণ করে। ​ঐতিহ্যের নীরবতাকে ভেঙে আজও যেন তাঁর গবেষণাগারের ক্রেসকোগ্রাফের সেই সূক্ষ্ম কাঁটাটি কেঁপে ওঠে। সেই কম্পন যেন আমাদের জাতীয় উদাসীনতার প্রতি এক ম্লান অঙ্গুলি নির্দেশ। আমরা জ্ঞানের চিরন্তন আলোকপথ ত্যাগ করে ব্যবসার ক্ষণিকের মরীচিকা ধরে ছুটছি। প্রকৃতির অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা পরম সত্যের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাঁর যে কঠোর সাধনা ছিল, আমরা কি সেই ব্রতকে চরম অবহেলায় বিসর্জন দিচ্ছি না? যদি আজও তাঁকে স্মরণে রাখি, তবে কেন তাঁর মহান আদর্শের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা এত দীন, এত পরাজিত?

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers