শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ , ১৪ জুমাদাউস সানি ১৪৪৭

ফিচার

জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঃ চলচ্চিত্রের কবি ঋত্বিক

মাঈনুদ্দীন দুলাল নভেম্বর ৮, ২০২৫, ১৮:৪৫:০২

292
  • ছবি : সংগৃহীত

জ্ঞান অন্বেষণ, আত্ম জিজ্ঞাসা ও সৃজনকাজে তৈরী হওয়ার জন্য একজন মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে খুব সক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উক্তি এমন - সক্রেটিস বলেছিলেন, ' নিজেকে জান' । বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেন, 'প্রশ্ন কর, প্রশ্ন কর এবং প্রশ্ন কর'। বাংলার কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক বলেন, ' ভাব,ভাব এবং ভাবতে থাকা চর্চা কর'। তিন মনীষার এই উক্তিগুলো খুব মিলে যায়। ঋত্বিক ঘটক ভাবনাকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন কারণ যে কাজ ভাবায় না,জিজ্ঞাসা তৈরি করেনা তা খসড়া খাতার সাদা পাতার মত। ঋত্বিকের সিনেমাগুলো বিনোদন নয়,ভাবনা এবং উপলব্ধি তৈরি করে। ভাবনা এবং উপলব্ধিতো বিনোদন। তবে তা সস্তা নয়। সবার জন্যে নয়।

কবি জীবনানন্দের বহুল পঠিত এবং বাঙালি পাঠকের প্রিয় কবিতা 'রূপসী বাংলা'র কথা যদি বলি। এখানে আবহমান বাংলার রূপ চিত্রকল্প, উপমা,বাস্তব - পরাবাস্তবের দোলাচল,আর আকুন্ঠ বাংলা প্রেম। বাংলার প্রতি এত গভীর মমত্ব আর প্রেম কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে? 

বাংলার প্রতি অসীম ভালোবাসা, আকুতি, রক্তক্ষরণ নিয়ে লিখেছেন আরও এক কবি আছেন। তবে তিনি চলচ্চিত্রের কবি ঋত্বিক ঘটক। তার উল্লেখযোগ্য ছবি যেমন সূবর্ণ রেখায় বাংলা ভাগের বেদনা,শেকড় হারা মানুষের আর্তি, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আমাদের এক কবিতার ভাষায় কথা বলে। অদ্বৈত মল্লে'র উপন্যাস ' তিতাস একটি নদীর নাম'। এটি নিয়ে চলচ্চিত্র করেছেন ঋত্বিক। তিতাস পাড়ের জেলে সম্প্রদায়ের জীবন উপাখ্যান নিয়ে সিনেমা। আমরা দেখি নদীর আবহমা রূপ, নদী পাড়ের প্রকৃতি, মানুষগুলোর জীবন সংগ্রাম, নানান টানাপোড়েনের ভাষা। যা কবিতার মত পড়া যায়, উপলব্ধি করা যায়। বাংলার একখন্ড ভূমিতে পুরো বাংলাদেশ শুয়ে থাকে আঁচল বিছিয়ে।

সত্যজিত রায় তাই ঋত্বিকের বাংলা প্রীতি নিয়ে বলেছেন,  'ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল। আমার থেকেও অনেক বেশী বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার বড় পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষনীয় বৈশিষ্ট্য।'

ঋত্বিক জন্ম শতবর্ষের এক আলোচনায় তিতাস একটি নদীর নামের অন্যতম অভিনেতা আবুল হায়াত বলেন, ' ঋত্বিক ছিলেন এক অসাধারণ মেধাবী মানুষ। এক দেখাতেই তিনি আমাকে নির্বাচন করেন। তার সাথে কাজ করতে পারা সৌভাগ্য। আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রে 'তিতাস একটি নদীর নাম' বিশ্ব সিনেমার টেক্সট বুক। আর আমি সেই মূল্যবান কাজের একটি ছোট অংশ'।

ঋত্বিকের  'কোমল গান্ধার', সূবর্ণ রেখা,মেঘে ঢাকা তারা,তিতাস একটি নদীর নাম সিনেমাগুলো এক-একটি ভালো কবিতার সব অনুষঙ্গ নিয়েই যেন তৈরি। কবিতার বোধ এবং ভাবনার ছন্দ ঢেউ খেলে হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে।

বাংলাদেশের ঢাকার জিন্দাবাজারে জন্ম ঋত্বিকের। তার শেকড় ছিল এখানে। ওপার বাংলায় দেশান্তরী হওয়ার পর শেকড় ছেঁড়ার বেদনা তাকে আজীব তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ছিলেন যেন ঝড়ো বোহেমিয়ান। অতি প্রতিভাবানের অনেকেরই স্বভাব এমন হয়।

এক নজরে ঋত্বিকঃ

ঋত্বিক কুমার ঘটক। ঋত্বিক ঘটক হিসেবেই  পরিচিত।  জন্ম ৪ নভেম্বর ১৯২৫।  মৃত্যু  ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬।  ছেলেবেলায় কিছুদিন দাদা মণীশ ঘটকের সঙ্গে কলকাতায় ছিলেন তিনি। তখন পড়াশোনা করতেন দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজশাহী শহরে ফিরে যান তিনি। রাজশাহী শহরের পৈতৃক বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কাটিয়েছেন। এই বাড়িতে কিছু সময় বসবাস করেছেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও। ঋত্বিক ঘটক রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন।১৯৪৭-এর ভারত বিভাগের পরে তার পরিবার কলকাতায় চলে যায়।

ঋত্বিকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রঃ

"অযান্ত্রিক। কোমল গান্ধার।

তিতাস একটি নদীর নাম।

নাগরিক। বাড়ী থেকে পালিয়ে।

মেঘে ঢাকা তারা।যুক্তি তক্কো আর গপ্পো।সুবর্ণরেখা।"

লেখক: সাংবাদিক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন