রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ , ১৯ রমজান ১৪৪৭

শিক্ষা

প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, চাপের মুখে জবি উপাচার্য

জবি প্রতিনিধি ১৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬, ১৬:৩৬:১২

376
  • প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, চাপের মুখে জবি উপাচার্য

জবি: দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর পার হলেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বর্তমান প্রশাসনে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম দায়িত্ব নেয়ার সময় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আশাবাদী ছিল দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশেষ করে “জবি থেকে ভিসি চাই” আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁর নিয়োগ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দৃশ্যমান না হয়ে বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে উপাচার্যকে দৃঢ় অবস্থানে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, জুলাই সংশ্লিষ্টদের বিচার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জুলাই আন্দোলনে ক্যাম্পাসে সংঘটিত সহিংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী দলপন্থি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও জোরদার হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াও উপাচার্যের প্রশাসনের অন্যতম বিতর্কিত দিক হিসেবে উঠে এসেছে। নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় এনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জামাত–শিবিরপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন শিক্ষকের নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়, যা প্রশাসনের অবস্থানকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে। শিক্ষক সমাজের একটি অংশ মনে করে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এসব বিতর্ক তৈরি হতো না।

অবকাঠামোগত উন্নয়নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ছে। নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন হলেও তা বাস্তবায়নে প্রশাসনের দৃঢ় তৎপরতা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বহুল আলোচিত নতুন ক্যাম্পাসের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও দেড় বছরে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে, যা প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্প নিয়েও হতাশা বাড়ছে।

প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। সেনাবাহিনী এখনও প্রথম ধাপের কাজ শুরু করতে পারেনি বলে জানা গেছে। ফলে বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল তদারকির কারণেই প্রকল্পটি বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের কল্যাণসংক্রান্ত ইস্যুতেও প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। সম্পূরক বৃত্তি চালু ও অর্থ ছাড়ের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা ছিল। আন্দোলনের মুখে প্রশাসন আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অর্থ ছাড় করাতে ব্যর্থ হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়ে। অনেকেই মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রশ্নে প্রশাসন আন্তরিক হলে এ সংকট এত দীর্ঘ হতো না।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে ক্ষোভের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুনতাহা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম একজন শিক্ষার্থীবান্ধব ভিসি পাবো। কিন্তু বাস্তবে দেখছি আন্দোলন না করলে কোনো দাবিই আদায় হয় না। সম্পূরক বৃত্তির মতো মৌলিক বিষয়েও প্রশাসন আন্তরিকতা দেখাতে পারেনি।”

লোকপ্রশাসন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান বলেন, “দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নিয়ে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনেছি। দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে। দেড় বছরে অন্তত কাজ শুরু হবে এই প্রত্যাশা ছিল।”

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “জুলাইয়ে সহিংসতার ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে সুস্থ পরিবেশ ফিরবে না।”

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্থবিরতা নিয়েও কথা বলেন এক শিক্ষার্থী। তাঁর ভাষায়, “আগে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এখন বরাদ্দ কমে যাওয়ায় সংগঠনগুলো টিকে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে।”

শিক্ষক সমাজের মধ্যেও রয়েছে অসন্তোষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দৃঢ় নেতৃত্ব জরুরি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তে উপাচার্যকে দুর্বল অবস্থানে দেখা গেছে।”

আরেক শিক্ষক বলেন, “শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি মেধাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন ছিল।”

তবে দেড় বছরের প্রশাসনিক সময়ে উপাচার্যের একটি উদ্যোগ।কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন আয়োজন ইতিবাচক হিসেবে দেখেন কয়েকজন শিক্ষক। দীর্ঘদিন পর জবি কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জকসু) নির্বাচন আয়োজনকে তাঁরা ইতিবাচক পদক্ষেপ বললেও সামগ্রিক উন্নয়নে আরও বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দেন।

সামগ্রিকভাবে দেড় বছরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিমের প্রশাসন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ এমন ধারণাই শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রবল। প্রশাসনিক দৃঢ়তার অভাব, বিতর্কিত নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা, শিক্ষার্থী আন্দোলন মোকাবিলায় অদক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশের অবনতি সব মিলিয়ে অসন্তোষের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে প্রত্যাশার পাহাড় তৈরি হয়েছিল, দেড় বছরে তার বড় অংশই ভেঙে পড়েছে বাস্তবতার চাপে।

এবিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, সবকিছু তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বৃত্তির বিষয়ে আমরা যেভাবে সম্ভব চেষ্টা করেছি। এখন বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আশা করছি দ্রুতই সমাধান আসবে।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে নির্মাণকাজ কীভাবে এগোয় তা সবারই জানা। প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, কিন্তু পরে আর তেমন অগ্রগতি হয়নি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের মে মাসে আবার প্রক্রিয়া শুরু করি। এখনও কিছুটা সময় আছে। ঘাট ও বালির কাজ প্রায় শেষ। ছয় বছরে যতটা অগ্রগতি হয়েছিল, গত ছয় মাসে তার চেয়ে বেশি হয়েছে। এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই।

অভিযুক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের আইন-কানুন মেনে চলতে হয়। দুজনের বিষয়ে ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও কয়েকটি বিষয় প্রক্রিয়াধীন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। আমাদের সব প্রক্রিয়া মেনে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন