সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১ , ৬ শাওয়াল ১৪৪৫

অর্থ ও বাণিজ্য
  >
অর্থনীতি

ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতিতে

নিউজজি ডেস্ক ২ জানুয়ারি , ২০২৩, ১৫:৪৯:৪১

168
  • ছবি: ফাইল

ঢাকা: বিশ্বের সেরা সম্পদ ব্যবস্থাপক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ২০২২ সালের নানামুখী সংকট নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। যদিও করোনার প্রভাব কাটিয়ে বিশ্বের দেশগুলো সবেমাত্র অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ফিরে আসতে শুরু করছিল এবং সে সময় থেকেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, জাহাজ ভাড়া ও কাঁচামালের মূল্যসূচক চড়তে শুরু করে। আর ফেব্রুয়ারির রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূল্যবৃদ্ধির এ সূচকের পালে হাওয়া জুগিয়েছে। এতে যেটা হয়েছে, পুরো বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে, জ্বালানির রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে এবং এর কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার বৃদ্ধি পুরো বিশ্বকে আরেক বিপদে ফেলে দিয়েছে। সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে দেশে দেশে স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, কাঁচামাল ও খাদ্যের উচ্চ মূল্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলারের বর্ধিত দাম। অন্য অনেক দেশের মতো আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্যও এটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক পণ্যসহ সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই দেখা দিয়েছে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি। তবে এই মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর ক্ষমতা নেই সাধারণ মানুষের।

এমন পরিস্থিতিতে ২০২২ সাল কীভাবে সামাল দিয়েছেন সাধারণ মানুষ- এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। সিপিডি, সানেমসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে, অনিশ্চয়তা ঘেরা ২০২২ সালে সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় সর্বপ্রথম কোপ পড়েছে তাদের অন্ন সংস্থানে। টিকে থাকার লড়াইয়ের এই সময়টাতে অনেকে খাদ্যতালিকা থেকে আমিষ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু তাই নয়, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া যাতায়াত ভাড়া এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির মতো বিভিন্ন সেবা মূল্যের বাড়তি ব্যয় জীবন-যাপন আরও কঠিন করে তুলেছে।

দেশের মানুষের প্রধান খাবার চাল আমদানিনির্ভর না হলেও গত এক বছরে দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। আর আমদানি করা আটার দাম বেড়েছে ১৪০ শতাংশ। বিভিন্ন ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের পরও সয়াবিনের দাম শতভাগ বেড়েছে। গ্যাস সংকটের দোহাই দিয়ে মাত্র কয়েক মাসেই চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে অন্তত ১৬০ শতাংশ। এ সময়ে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে শিক্ষার উপকরণ, খেলনাসহ এমন কিছু নেই যার দাম বাড়েনি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা বেড়েছে, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লোভের কারণে পণ্যমূল্য আরও বেশি বেড়েছে। পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার পরও নির্ধারিত দরে বিক্রি নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও সরকার এসব ব্যবসায়ীদের সুদ ভর্তুকিসহ সস্তা ঋণের জোগান দিচ্ছে। আবার এই ব্যবসায়ীরা ঋণ ফেরত না দিলেও তাদের খেলাপি না করার নানান সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২ সালে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের দরবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, খাদ্য নিরাপত্তা, বৈশ্বিক উঞ্চতাসহ নানাবিধ যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাতে গত ৫০ বছরে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে বিশ্ব। বাংলাদেশের জন্য এ সংকট আরও বেশি। উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে ২০২২ সাল জুড়ে ডলার সংকট প্রধান আলোচনার বিষয়। আমদানি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পরও চলতি হিসাবের ঘাটতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাণিজ্য ঘাটতি সামাল দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার প্রবাসী আয়েও তেমন প্রবৃদ্ধি নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বিদেশি মুদ্রার সংকট সামাল দিতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কঠিন শর্তও মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তার পরও ঋণের জোগান নিয়ে চিন্তিত সরকার।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য ছাড়াও শুধুমাত্র টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সব আমদানি পণ্যের দাম অতিরিক্ত ২৪ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির কারণে গত আগস্টে দেশেও রেকর্ড দাম বাড়ানো হয়। সে সময় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে পণ্য পরিবহন, বাস ভাড়া থেকে শুরু করে কারখানার উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। এরসঙ্গে যোগ হয় গ্যাস সংকট। চার গুণেরও বেশি দরে এলএনজি আমদানি করে কিছুদিন গ্যাসের জোগান দেওয়া হলেও এক পর্যায়ে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। গ্যাসের অভাবে দেশের প্রায় সব শিল্প-কারখানা উৎপাদন টিকিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অধিকাংশ কোম্পানির উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। লোকসানে পড়েছে অনেক কারখানা।

এদিকে সবকিছুর দাম বাড়ায় দেশের মূল্যস্ফীতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগস্টেই মূল্যস্ফীতি এক যুগের রেকর্ড ভেঙে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে। যদিও আগের মাস জুলাইয়ে তা ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এমনকি খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। অবশ্য পরের মাস সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১০ শতাংশে। একইভাবে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশে। সর্বশেষ নভেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশে। যদিও বিবিএসের এই মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়েই বিতর্ক রয়েছে।

সার, খাদ্য, জ্বালানির উচ্চমূল্য ছাড়াও ২০২২ সাল ছিল দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জের বছর। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে একের পর এক সংকট দেশের অর্থনীতিকে বেশ ভুগিয়েছে। আইএমএফের চাপ, ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক থেকে আমানত তোলার হিড়িকসহ পুরো বছরই আলোচনায় ছিল এই খাত।

নিউজজি/ এএন

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন