মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৬ জিলহজ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
সঙ্গীত

গণমানুষের বিপ্লবী চেতনার গায়েন হেমাঙ্গ বিশ্বাস

ফারুক হোসেন শিহাব ১৪ ডিসেম্বর , ২০২০, ১১:৫৭:৩৯

  • গণমানুষের বিপ্লবী চেতনার গায়েন হেমাঙ্গ বিশ্বাস

চল্লিশের দশক থেকে অসাধারণ গান রচনা করে সমগ্র ভারতজুড়ে বিপ্লবী চেতনার হাওয়া বইয়ে দিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি সংগ্রামী মননে জাগ্রত করেছেন স্বদেশের স্বাধীনতা ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। শোষিত, নির্যাতিত, খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষের প্রতি তাঁর পক্ষপাত অটুট থেকেছে আমৃত্যু। বিদেশি শাসন এবং শোষণ থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁর ভেতর জন্ম দিয়েছে জাতীয়তাবাদের। 

আজ ১৪ ডিসেম্বর গণসঙ্গীতের প্রাণ পুরুষ ও গণনাট্যে নতুনপ্রবাহ সৃষ্টিকারী শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। কীর্তিমান এই স্বাধীনতা সংগ্রামী, সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার ১৯১২ সালের এইদিনে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরকুমার বিশ্বাস এবং মাতা সরোজনি বিশ্বাস। 

হেমাঙ্গ বিশ্বাস হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও সিলেট এমসি কলেজে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। হবিগঞ্জ, কলকাতা এবং আসামে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। ১৯৪৩ সালে আই,পি,টি, এ প্রতিষ্ঠা ও কালচারাল স্কোয়াড গঠন ছাড়াও ১৯৭১ সালে গণ সঙ্গীতের সংগঠন মাস সিংগার্স সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। অসাধারণ গান রচনা করে অগণিত মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছেন।

সামন্তীয় জমিদার বংশে জন্ম নিলেও তিনি ছিলেন শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। ১৯৩২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন হেমাঙ্গ। ১৯৩৫ সালে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই কারণে তিনি মুক্তি পান। ১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী থাকেন।

বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রণে ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। ১৯৪৩ সালে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। সেই সময়ে তাঁর গান তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান, কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে প্রভৃতি আসাম ও বাংলায় সাড়া ফেলেছিল।

আসামে তাঁর সহযোগী ছিলেন বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, সাহিত্যিক অশোকবিজয় রাহা, সেতারবাদক কুমুদ গোস্বামীসহ অনেকে। ষাটের দশকে সোভিয়েত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে তিনি কাজ ত্যাগ করেন। চীন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। দুবার তিনি চীনে গিয়েছিলেন। চীনা ভাষায় তিনি অনেক গান রচনা করেছেন।

গণসঙ্গীতের রসদ সংগ্রহ করেছিলেন নিজের দেশের মাটি থেকে। শুধু সঙ্গীতের ক্ষেত্রেই নয়, আসলে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। গান-কবিতা লেখার পাশাপাশি দারুণ আবৃত্তি করতেন। ছবি আঁকার হাত যেমন ভাল, তেমনই ঘর সাজানোর জিনিস তৈরিতেও ছিলেন এক ওস্তাদ কারিগর।

এক কথায় লোকজীবনের সঙ্গে যা কিছু জড়িত তার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। মাঠে-প্রান্তরের শ্রমজীবী মানুষের মাঝেই বড় হয়ে উঠেছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা হেমাঙ্গ। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, মিরাশি গ্রামে ছিল শালি ধানের মাঠ। আশ্বিন-কার্তিক মাসে সড়কের মাথায়, আলের ধারায় ঢেউ খেলত ময়নাশাইল, কার্তিকশাইল, কালিজিয়া, কৃষ্ণচূড়া, ধান। তাদের বিভিন্ন রং, হরেক রকম গন্ধ। ধানের শীষ টেনে কচি ধানের দুধ খেতেন ছোট্ট লালুবাবু ওরফে হেমাঙ্গ। তাকে দেখতে পেলে কোনও স্নেহশীল চাষি বলতেন, ‘ধানের বুকে অখন ক্ষীর, ছিড় না, পাপ হয়।’ বহু বছর পার হয়ে যায়। ‘ছিন্নমূল’ কবি হেমাঙ্গ লিখলেন-

‘কার্তিক মাসে বুকে ক্ষীর ক্ষেতের ধানে ধানে

অঘ্রাণে রান্ধুনি পাগল নয়া ভাতের আঘ্রাণে।’

তার কলম হয়ে ওঠে ক্ষুরধার বিপ্লবের হুঙ্কার। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অন্তর্গত বিপ্লবের শক্তি এতই দৃঢ় ছিল যে, তার সারা জীবনের চলার পথে কখনোই ভোগের পাথরের সাথে হোঁচট খেয়ে বিলাসিতার মখমলের বিছানাতে মুখ থুবড়ে পড়েননি। জীবনের শেষবেলায় তাঁর যৌবনের সহযোদ্ধারা যখন বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও রাজনীতির লেজ ধরে খ্যাতির আকাশে উড়ার স্বপ্নে বিভোর তখনও তিনি ছিলেন ন্যায় ও সাম্যের জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী।

সে সময় “মাস সিঙ্গারস” নামে গণসঙ্গীতের ছোট একটি গানের দল গঠন করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে-বেড়িয়ে মেহনতী মানুষকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতেন। সেখান থেকে যে আয় হত তা দিয়েই তিনি সাদামাটা জীবন ধারণ করতেন। বিপ্লবের বর্ণময়তায় যার অন্তর্গত জীবন ভরপুর তাঁর দরকার পড়ে না বাহিরের চাকচিক্যের। ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর সঙ্গীতের এই মহান পুরুষ কলকাতায় দেহত্যাগ করেন। বিপ্লবী চেতনা-প্রবাহের এই কীর্তিমানের জন্মদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers