বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ১ আষাঢ় ১৪২৮ , ৫ জিলকদ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
সঙ্গীত

সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে প্রবাল চৌধুরী আজও সমুজ্জ্বল

ফারুক হোসেন শিহাব ১৬ অক্টোবর , ২০১৯, ১৭:৫৭:১৮

  • সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে প্রবাল চৌধুরী আজও সমুজ্জ্বল

এদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের এক অনন্য উজ্জ্বলতম তারকার নাম প্রবাল চৌধুরী। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন বিপ্লবী কণ্ঠযোদ্ধা। জাদুমাখা কণ্ঠে স্থান করে নিয়েছেন কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমীর অন্তরীক্ষ। সুর আর গায়কির স্বাতন্ত্রিক এক মায়ায় প্রবাল চৌধুরী শ্রোতাদের আবদ্ধ করে রেখেছেন মুগ্ধতার জালে। 

‘আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য/ তোমারি প্রেমেরই জন্য’, ‘আমার সাজানো বাসর গেছে ভেঙে/ কুসুম খুঁজি না’, ‘কারো কাছে, সুরের সভায় আমি যেন/ অনাহত এক শিল্পী’, ‌‘এই জীবনতো একদিন চলতে চলতে থেমে যাবে’, ‘আমি মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছি/ এই কি আমার অপরাধ’- এমনি শ্রোতা-নন্দিত বহুগান গেয়ে তিনি এপার বাংলার ‘হেমন্ত’-খ্যাতি পেয়েছিলেন। 

তার মানে, অসাধারণ কণ্ঠের জন্য তাকে কলকাতার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করা হতো। অডিও বা বেতারে তার কণ্ঠের গান শুনে প্রায়শই শ্রোতারা হেমন্তের কণ্ঠ বলেই বিভ্রান্ত হতো। আর যখন তিনি তার প্রিয়তম শিল্পী হেমন্তের কোন গান গাইতেন তখনতো তাকে প্রবাল বলার কোন অবকাশই পাওয়া যেত না। 

আজ ১৬ অক্টোবর বরেণ্য এই কণ্ঠশিল্পীর দশম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে থেমে গিয়েছিল কীর্তিমান এই সঙ্গীতজনের জীবন গাড়ি। ১৯৪৭ সালের ২৫ আগস্ট (৮ ভাদ্র ১৩৫৪) চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিনাজুরি গ্রামে প্রবাল চৌধুরীর জন্ম। তবে শৈশব থেকেই তিনি বেড়ে ওঠেন এবং জীবন কাটান চট্টগ্রাম শহরের সাংস্কৃতিক এলাকা রহমতগঞ্জের ১৬ নং দেওয়ানজী পুকুর পাড়স্থ নিজ বাস ভবনে।

চট্টগ্রামের মাটির প্রতি ছিল তার প্রাণের টান। এ মাটি ছেড়ে নাম যশের জন্যে তিনি রাজধানীর ডাকেও সাড়া দেননি। চট্টগ্রামে অবস্থান করেও তিনি তার স্বকীয় মেধা, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীল সুর মাধুর্যে ঢাকাকেও জয় করতে পেরেছিলেন। অনেক সৃজনশীল শিল্পী-সাহিত্যিকের জন্যে বিষয়টি ছিল সত্যিই ঈর্ষনীয়। 

প্রবাল চৌধুরী বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। মা লীলাবতী চৌধুরীর কাছ থেকে প্রবাল চৌধুরীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি। বিশ শতকের ষাটের দশক থেকে তিনি বাংলা সিনেমায় প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তারা সবাই সঙ্গীতশিল্পী। 

তার অন্যান্য ভাই বোন কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, স্বপন চৌধুরী, দেবী চৌধুরী ও পূর্ণিমা দাশ। এদের মধ্যে অবশ্য কল্যাণী ঘোষ এবং উমা খান শিল্পাঙ্গনের বেশ পরিচিত মুখ। ১৯৬৬ সালে কদুক্ষী গার্লস স্কুলে প্রথম গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেন সেই সুদর্শন যুবক প্রবাল। 

বাংলা ছায়াছবিতে প্লেব্যাক করে প্রবাল পরিগণিত হয়েছেন সুপারহিট প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে। বাংলা আধুনিক গানেও তার কণ্ঠ ছিল অপ্রতিরুদ্ধ। সঙ্গীতের প্রতি অমোঘ প্রেম, নিষ্ঠা, অন্তরঙ্গতা আর নিবেদিত মনোভাব তাকে নিয়ে গেছে এদেশের পথিকৃৎ সঙ্গীতজনদের কাতারে। 

ইতিহাসের উত্তাল দিনগুলোতে ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামে গণআন্দোলনে যোগ দেন এই সাহসী এই মানুষটি। ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতার ডাকে যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। যুদ্ধচলাকালীন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে মুক্তির গান গেয়ে মানুষকে সাহস জুগিয়েছে আর নয় মাস সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছেন লাল-সবুজের পতাকা। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীনবাংলা বেতারে তার অসাধারণ কণ্ঠে গাওয়া মোস্তাফিজুর রহমান গামার লেখা ‘ভেবো না-গো তোমার ছেলেরা/ হারিয়ে গিয়েছে পর্বে’ গানটি আমাদের মুক্তি সেনাদের যারপরনাই প্রেরণা যুগিয়েছে, অধিকতর সাহসী করে তুলেছে। ‘লোকে যদি মন্দ কয়/ সেতো নহে পরাজয়’, ‘ফুলের বাসর ভাঙলো যখন/ স্মৃতি কেন বেদনার বাসর সাজায়’-গানগুলো প্রবাল চৌধুরীকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালি শ্রোতাদের স্মৃতির গহীনে। প্রবাল চৌধুরী স্বাধীন বাংলা বেতারে নজরুল, রবীন্দ্র, গণসঙ্গীতে কণ্ঠ দিয়েছেন। কিন্তু দরাজ কণ্ঠের কারণে অনেক কণ্ঠের ভিড়েও তার উপস্থিতিটা আলাদাভাবে টের পাওয়া যেত। 

যতদিন বাংলা গান থাকবে ততদিন শিল্পী প্রবাল চৌধুরীর নামটিও শ্রদ্ধা ভরে উচ্চারিত হবে। ৬০ দশকের শুরু থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন থেকে দেশের সঙ্গীত ভাণ্ডারকে করে গেছেন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। প্রবাল চৌধুরীর সাংগঠনিক দক্ষতাও ছিল বিস্ময়কর। 

আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে ভালোবেসে দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন শিল্পী স্বার্থ সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সর্বস্তরের শিল্পীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট।

তিনি বলতেন, সঠিক প্রতিভা এবং সাধনা থাকলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করেও জাতীয় মান পাওয়া যায়। তিনি পেয়েছিলেন লক্ষ-কোটি শ্রোতার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ঠিকই, কিন্তু পাননি জাতীয় স্বীকৃতি। এটি সত্যিই বেদনার। তবে মৃত্যুর পর তার স্মৃতিধন্য দেওয়ানজী পুকুর এলাকার রাস্তাটি শিল্পী প্রবাল চৌধুরী সড়ক হিসেবে নামকরণ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

 স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম শব্দসৈনিক প্রবাল চৌধুরী স্টুডিওতে গান গাইতে গাইতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ‘এই জীবন তো একদিন চলতে চলতে থেমে যাবে’ -তার নিজের কণ্ঠে গাওয়া এই গানটির মতোই ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেমে গিয়েছিল তার জীবন। 

প্রয়াত হলেও প্রবাল চৌধুরী ক্ষণজন্মা কীর্তিমানদের সারিতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। জীবিত অবস্থাতেও দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তার স্থানটি ছিল কৃতজ্ঞতায় সুদৃঢ়। আজকের এইদিনে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers