সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮ , ১০ জিলকদ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
সঙ্গীত

সুফি ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের বরপুত্র ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি

ফারুক হোসেন শিহাব ১৩ অক্টোবর , ২০১৯, ১৮:৫৩:৫৭

  • সুফি ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের বরপুত্র ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি

বিশ্ব দরবারে তিনিই প্রথম কাওয়ালির অনিন্দ্য শ্রুতিসৌন্দর্য-সৌকর্যের সুফি-মিস্টিক-স্পিরিচ্যুয়ালিস্ট আবহটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। পাকিস্তানের কিংবদন্তিতুল্য সঙ্গীতশিল্পী, বিশেষ করে ইসলামের সুফিবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ আধ্যাত্মিক সঙ্গীত কাওয়ালির জন্য তিনি বিশ্বনন্দিত। তার অসাধারণ কণ্ঠের ক্ষমতার জন্য তাকে রেকর্ডকৃত কণ্ঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১০ সালে সিএনএন জরিপে (দুনিয়াজোড়া সঙ্গীতানুরাগীদের ভোটে নির্বাচিত) পঞ্চাশ বছরে বিশ্বের সেরা বিশজন মিউজিক আইকনের একজন তিনি। পশ্চিমা সঙ্গীত বিশ্বে তার একটিই পরিচয় ‘অ্যা ভয়েস ফ্রম দ্য হ্যাভেন’। তিনি একটানা কয়েক ঘণ্টাযাবত একই তালে কাওয়ালি পরিবেশন করতে পারেন।

প্রায় ৬০০ বছরের পারিবারিক কাওয়ালি ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে, তিনি কাওয়ালি সঙ্গীতকে বিশ্বসঙ্গীতে পরিণত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। সুফি-মরমি বিশ্ব-দর্শনের বেহাগ নির্মাণে তাবরিজি, রুমি, হাফিজ, খৈয়াম তো বটেই, কবির এবং নানক-এর কথায়ও সাজিয়েছেন তার কাওয়ালির আলাপ-সঞ্চারি।

গ্যাব্রিয়েল তো বটেই, মাইকেল ব্রুক (কানাডা) ও গ্র্যায়েম রেভ্যেল (অস্ট্রেলিয়া) বা ড্যানিয়েল গ্যদি (ইতালি) অন্যরা যাঁরাই ওস্তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন বা তার সঙ্গীতের ফিউশন করেছেন সকলেই জানিয়েছেন ওস্তাদের সংস্পর্শে তাদের সঙ্গীত জীবন ধন্য হয়েছে।

আজ ১৩ অক্টোবর ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলির জন্মদিন। বেঁচে থাকলে ঊনসত্তরে পড়তেন। কিন্তু মাত্র ৪৮ বছর বাঁচলেন। মনে হয় এই সেদিন মৃত্যুবরণ করলেন। অথচ কতগুলে বছর পেরিয়ে গেছে। ১৬ই আগস্ট ছিল তার ২২তম প্রয়াণদিবস।

এইদিন পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭টি এথনোমিউজিকোলজি বিভাগ তাকে শ্রদ্ধাবনত স্মরণ করে। নুসরাত ১৯৪৮ সাল ফয়সালাবাদের এক পাঞ্জাবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফতেহ আলী খান, একজন সঙ্গীততত্ত্বিক, গায়ক, বাদক, এবং কাউয়াল, এর পঞ্চম সন্তান এবং ছেলে সন্তানদের মধ্যে প্রথম পুত্র সন্তান। খান পরিবার, যেখানে চার বড় বোনসহ এক ছোট ভাই ফররুখ ফতেহ আলী, কেন্দ্রীয় ফয়সালাবাদে বেড়ে উঠে। 

প্রথমদিকে, তার পিতা চাননি যে নুসরাত পারিবারিক পেশায় আসুক। তিনি চেয়েছিলেন নুসরাত অনেক সম্মানিত একটি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করুক এবং একজন ডাক্তার হন, কারণ তিনি মনে করতেন, কাওয়ালি শিল্পীরা নিম্ন সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। যাইহোক, নুসরাত কাওয়ালির প্রতি এমন এক প্রবণতা, এবং আগ্রহ দেখালেন যে তার পিতা অবশেষে নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করেন।

বিশ্বসেরা সঙ্গীতবোদ্ধাদের বহু আগেই তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালের কথা। লন্ডনে শুরু হওয়া World of Music, Arts and Dance (WOMAD) ফেস্টিভ্যাল। সে তাক লাগানোর ঘোরে আয়োজকরা পরের বছরগুলোতে আরো তিনটি WOMAD ফেস্টিভ্যালে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করে। দক্ষিণ এশিয় সঙ্গীতকারদের মধ্যে এই বিরল সম্মান প্রাপ্তিতে তিনিই প্রথম।

পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে ‘দ্যা লাস্ট টেম্পটেশ্যন অব ক্রাইস্ট’ (প্যাশন) আর এডি ভেড্ডারের সঙ্গে ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’ সিনেমা দু’টির সাউন্ডট্র্যাক; এবং কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘ন্যাচারাল বর্ন কিলার্স’ এর ‘ট্যাবু’ ট্র্যাকে স্বর্গীয় কণ্ঠস্বর’টি ঢেলে তিনি পশ্চিমা সঙ্গীতপিপাসুদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন।

১৯৮৩ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম চিট্টিক এর বিখ্যাত The Sufi Path of Love - The Spiritual Teachings of Rumi বইটি। অবর্ণনীয় কষ্টকর ও ক্লান্তিকর সময়কে অনির্বচনীয় প্রশান্তিময় করে তুলতে এ বইটির পাশাপাশি নুসরাত ফতেহ আলির রুমীর কবিতাগুলোর মিউজিক্যালস এবং মুভি সাউন্ড ট্র্যাকগুলোর মত বড় দাওয়াই আর কিছু হয় না বলে মেনেছেন। 

তার কৃতির স্বীকৃতি সরূপ তিনি ইউনেস্কো মিউজিক পুরস্কারসহ আরো ডজন দু’য়েক আন্তর্জাতিক পুরস্কার, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে এথনোমিউজিকোলজি বিভাগের ভিজিটিং আর্টিস্ট সম্মাননা- এ’সবই আসলে খুব সামান্যই তাঁর সুফি সংগীত বিশ্বায়নের আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃতির কাছে।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers