সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
আলোকচিত্র

ভিনদেশীদের ক্যামেরায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম

নিউজজি ডেস্ক ২৭ মার্চ , ২০১৭, ১৬:২৭:৪৯

  • ভিনদেশীদের ক্যামেরায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম

‘বাংলাদেশের পুরো গল্প কখনই বলা সম্ভব হবে না। বাঙালি ভাইদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা প্রকাশের উপযুক্ত কোনো শব্দ মানুষের শব্দভাণ্ডারে নেই।’ ভারতীয় আলোকচিত্রী কিশোর পারেখের বই ‘বাংলাদেশ আ ব্রুটাল বার্থ’-এর ভূমিকার শুরুতেই কথাগুলো লিখেছেন এস মুলগাওকার। প্রচলিত আছে অনেক সময় একটি ছবি নাকি হাজার শব্দের চেয়ে সহজে কোনো বিষয়কে প্রকাশ করে। এ কথার সত্যতা পাওয়া যাবে কিশোর পারেখের গ্রন্থে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একপলকে বুঝতে চাইলে এ বইয়ের পাতাগুলো উল্টে দেখলেই চলে। বাংলাদেশের বিজয়ের সেই অমোঘ মুহূর্তটিও আমাদের জন্য ধরে রেখেছেন কিশোর। রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কমান্ডার আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আর তাঁর দু’পাশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জগজিত্ সিং অরোরা এবং বাংলাদেশের মেজর হায়দার।

সশস্ত্র সংঘাত, যুদ্ধ এবং স্থান ও মানুষের ওপর তার প্রভাবকে ক্যামেরার লেন্সে আবদ্ধ করাই ওয়ার ফটোগ্রাফি। বলা হয় ওয়ার ফটোগ্রাফির সূচনা হয়েছিল ১৮৫০-এর দশকে সংঘটিত ক্রাইমিয়ার (১৮৫৩-১৮৫৬) যুদ্ধে। ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার রজার ফেনটন (১৮১৯-১৮৬৯), জেমস রবার্টসন (১৮১৩-১৮৮৮), ইতালীয়-ব্রিটিশ ফেলিস বিটো (১৮৩২-১৯০৯) ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান ক্যারল জাথমারি (১৮১২-১৮৮৭) প্রথমবারের মতো দুনিয়ার বড় কোনো সশস্ত্র সংঘাতকে ক্যামেরাবন্দি করেন বলে ইতিহাসবিদদের মত।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের অভিযান (ছবি: ডেভিড বার্নেট)

চারজনের ছবিতে হয়তো আধুনিক যুদ্ধ ও তার ফটোগ্রাফির নাটকীয়তা পাওয়া যায় না কিন্তু ইতিহাসে সেই আমলে দুর্বল প্রযুক্তি দিয়ে তারাই প্রথম যুদ্ধকে ফ্রেমে আবদ্ধ করেছিলেন। রজার ফেনটনই ছিলেন দুনিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার ফটোগ্রাফার। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে তার তোলা ছবি দি ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজে প্রকাশিত হয়েছিল।

এর কয়েক বছর পরেই ম্যাথিউ ব্রাডি, আলেক্সান্ডার গার্ডনার এবং অন্যরা ফেনটন, রাবর্টসন কিংবা বিটোর চেয়ে আরো স্পষ্ট ও বিশদভাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্রের খাবরাখবর প্রচারে আলোকচিত্র কত দ্রুত একটি জরুরি মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল।

ব্রিটিশদের বেঙ্গল আর্মির শল্যচিকিত্সক জন ম্যাককশকে অনেক ইতিহাসবিদ প্রথম ওয়ার ফটোগ্রাফার হিসেবে বিবেচনা করেন। তিনি ১৮৪৮-৪৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধের সময় যুদ্ধরত অনেক কর্মকর্তা, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের ছবি তুলেছিলেন। তিনি যুদ্ধে ব্যবহূত বিভিন্ন অস্ত্র এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞেরও ছবি তুলেছিলেন। তবে ম্যাককশের ছবি হয়তো সেভাবে যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধারণ করতে পারেনি। তাই প্রথম ওয়ার ফটোগ্রাফারের খেতাবটা রজার ফেনটনই পান।

১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেনটন, রবার্টসন ও বিটো কলকাতায় পা রাখেন, উদ্দেশ্য, সিপাহি বিদ্রোহকে ক্যামেরাবন্দি করা। তারা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের ছবি তুললেন। লক্ষৌয়ের সিকান্দার বাগের প্রাসাদের সামনে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহিদের মরদেহের ছবি তুললেন বিটো। এ ছবিই যুদ্ধের ভয়ানক চেহারাকে প্রথমবারের মতো আলোকচিত্রে তুলে ধরল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির (ছবি: ব্রুনো বার্বি)

এরপর ১৮৬১-৬৫ সময়কালে অনুষ্ঠিত আমেরিকার গৃহযুদ্ধে হ্যালি সিমস ও আলেক্সান্ডার গার্ডনার ওয়ার ফটোগ্রাফির প্রাথমিক কালের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হন। তারা যুদ্ধের আবেগ, উত্তেজনাকে ছবিতে তুলে আনতে চেষ্টা করলেন। যুদ্ধের বর্বরতাকে স্পষ্ট করতে তারা অনেক ক্ষেত্রে সেনাদের মরদেহগুলো সাজিয়ে ছবি তুলেছিলেন। তাদের ছবি প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয়েছিল, যা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে উন্মোচন করে।

বিশ শতকে ছোট-বড় সব সশস্ত্র সংঘাত ও যুদ্ধকে পেশাদার ফটোগ্রাফাররা ক্যামেরাবন্দি করেছেন। অনেক ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ দিয়েছেন। রবার্ট কাপাকে হয়তো কেউই ভুলতে পারবেন না। স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে ডি-ডে’র সেনা অবতরণ কিংবা প্যারিসের পতন— সবই তিনি তার ক্যামেরায় বন্দি করেছেন। ১৯৫৪ সালে ইন্দোচীনে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া থেকে বিরাম নেননি।

যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করে দুনিয়ার অনেক আলোকচিত্রীই বিখ্যাত হয়েছেন। তাঁদের সাহস, ত্যাগকে দুনিয়া শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক আলোকচিত্রীর কাজ স্মরণীয় হয়ে আছে। এক কথায় তাঁদের ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিল। দেশের আলোকচিত্রীরা ছাড়াও অনেক বিদেশী ওয়ার ফটোগ্রাফার, ফটোসাংবাদিক, আলোকচিত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তাদের ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রেখেছেন। বিদেশী ফটোগ্রাফারদের মধ্যে আছেন- ইরানের আব্বাস আত্তার, ব্রিটিশ ডোনাল্ড ম্যাককলিন, উইলিয়াম লাভলেস, মেরিলিন সিলভারস্টোন, ক্রিস স্টিল-পার্কিন্স, মার্ক এডওয়ার্ডস; মার্কিন ফটোসাংবাদিক ডেভিড বার্নেট, মেরি এলেন মার্ক, ডেভিড হিউম কেনেরলি; ফরাসি ব্রুনো বার্বি, রেমন্ড দেপার্দো, মার্ক র্যাবো, মিশেল লরেন্ট; ভারতের কিশোর পারেখ, রঘু রাই, রবিন সেনগুপ্ত, বাল কৃষ্ণান, অমিয় তরফদার; জার্মান হুর্স্ট ফাজ, টোমাস বিলহার্ডট প্রমুখ।

আব্বাস আত্তার

ইরানি আব্বাস আত্তার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পে বন্দি ভারতীয় মেজর ফুল সিংয়ের বিখ্যাত ছবিটি আব্বাসেরই তোলা। ঢাকায় বাংলাদেশের নতুন পতাকা সেলাইয়ের ছবিটিও তাঁর তোলা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিয়াজির বেশকিছু ছবি তুলেছেন আব্বাস; যুদ্ধেক্ষেত্র থেকে আত্মসমর্পণের টেবিল পর্যন্ত। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় বাঙালির বিজয় উল্লাস কিংবা পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা সবই আব্বাস তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও আব্বাস ভিয়েতনামের রণাঙ্গনে কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবও তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এই বিপ্লবের পর তিনি দেশ ছাড়েন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সালে তিনি মেক্সিকোর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান। তিনি এমনভাবে মেক্সিকোর ছবি তুলেছিলেন, মনে হয়েছিল যেন কোনো উপন্যাস লিখছেন। তাঁর এ ছবি ও ভ্রমণবৃত্তান্ত নিয়ে রিটার্ন টু মেক্সিকো, জার্নি বিয়ন্ড দ্য মাস্ক নামে একটি বইও প্রকাশ হয়েছিল। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত চীন থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র ইসলামী তত্পরতার ছবি তুলেছেন এবং এসব নিয়ে আল্লাহু আকবর নামে একটি প্রদর্শনী হয়েছে। শেষ জীবনে ইসলাম ও রাজনীতি নিয়ে বেশকিছু বই লিখেছেন। আব্বাসের জন্ম ১৯৪০ সালে ইরানে।

বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পে বন্দি ভারতীয় মেজর ফুল সিং

ডন ম্যাককলিন

ব্রিটিশ ফটোসাংবাদিক স্যার ডন ম্যাককলিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ৯ অক্টোবর। যুদ্ধকালীন ছবি তোলার জন্য তিনি বিখ্যাত। ১৯৫৯ সালে লন্ডনের একটি আন্ডারওয়ার্ল্ড দলের ছবি তোলেন, যা ছাপা হয় দ্য অবজারভারে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত সানডে টাইমস ম্যাগাজিনের বিদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে নাইজেরিয়ার সংঘাতময় অঞ্চল বিয়াফরায় কাজ করেন। একই সময় আফ্রিকার এইডস মহামারীতে আক্রান্তদের নিয়েও কাজ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।

ডন ম্যাককলিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও ছবি তুলেছেন। তাঁর ছবিতে মূলত উঠে এসেছে ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া বাঙালিদের দুর্দশা। কলেরায় মৃত স্বজনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণ, ছিন্নবস্ত্রের মানুষের ছবি সহসাই মনে করিয়ে দেবে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের ত্যাগকে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করতে এ দেশে এসেছিলেন মাদার তেরেসা। তাঁর একটি ছবিও তুলেছিলেন ডন ম্যাককলিন।

কলেরায় মৃত মরদেহের পাশে স্বজনেরা (ছবি- জন ডাউনিং)

জন ডাউনিং

ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার জন ডাউনিংয়ের জন্ম সাউথ ওয়েলসে। ১৯৫৬ সালে ডেইলি মেইলে কাজ করার মাধ্যমে তাঁর পেশাদার ফটোগ্রাফি ক্যারিয়ার শুরু। ১৯৬৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত কাজ করেছেন দি এক্সপ্রেসে। তারপর থেকে ফ্রিল্যান্স কাজ করছেন। ফটোগ্রাফার হিসেবে কাভার করেছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বৈরুত, ইরাক, সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র। বসনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন বহুবার। বহু সপ্তাহ কাটিয়েছেন সুদানের গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কলকাতার কাছে এক শরণার্থী শিবিরে জন ডাউনিংয়ের একটি ছবি তুলতে বেশ কয়েক ঘণ্টা কাদায় ডুবে অপেক্ষা করেছেন। তাঁর তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, একজন বিদেশিনী নার্স একটি শিশুকে ভ্যাকসিন দেয়ার চেষ্টা করছেন। শরণার্থী শিবিরগুলো তখন কলেরার আক্রমণে মৃত্যুপুরী। নার্সের হাতে থাকা ভ্যাকসিনেশনের যন্ত্রটি দেখে শিশুটি ভয়ে পালাতে চাচ্ছিল। আর নার্সও আন্তরিক ভঙ্গিতে শিশুটিকে অভয় দিচ্ছিলেন।  ফটোগ্রাফির জন্য জন ডাউনিং জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে তিনি রয়্যাল ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানিত ফেলো নির্বাচিত হন।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers