সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
আলোকচিত্র

আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্র শিল্পের দিকপাল

ফারুক হোসেন শিহাব ২৬ জুলাই , ২০১৮, ১২:৪৭:১৫

  • আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্র শিল্পের দিকপাল

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পত্রপত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে। এ সময়ে আলোকচিত্র তোলা শুরু হয় সরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম সর্বস্তরের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য। সে সময়ে আলোকচিত্র-চর্চা শুরু করেন আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ। ১০ বছরের মাথায় তিনি বাঙালিকে আলোকচিত্র সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনায় ব্রত হন। আমৃত্যু তিনি সুদৃঢ়ভাবে শৈল্পিক এই কর্মযজ্ঞে নিবিষ্ট ছিলেন।তিনি এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক আলোকচিত্রের শিক্ষাগুরু।

আজ ২৬ জুলাই বাঙালির আলোকচিত্র শিল্পের কীর্তিমান এই পথিকৃৎ-এর ২০তম প্রয়াণদিবস। ১৯৯৮ সালে জাতী হারিয়েছে গুণী এই শিল্পীকে। এমএ বেগ-এর পৈতৃক নিবাস নদীবিধৌত বরিশাল জেলায়। ১৯৩১ সালে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে রাজশাহীতে। চাকরিসূত্রে বাবা বরিশাল বিএমকলেজে অধ্যাপনা করায় সেখানেও কেটেছে বেশকিছু সময়।

১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তার এক বছর পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। বিমান বাহিনীর সাধারণ কাজ তাকে একটুও টানেনি। তিনি কায়দা-কানুন করে করাচি বিমান বাহিনীর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ছয় বছর বিমান বাহিনীতে ফটোগ্রাফার হিসেবে চাকরিও করেছেন তিনি।

১৯৫৭ সালে করাচিতে ইউনেস্কোর অধীনে মাইক্রোফিল্ম বিষয়ে, ১৯৬৮ সালে বৃটিশ সরকার প্রদত্ত বৃত্তি লাভ করে তিনি রিপোগ্রাফি বিষয়ে ইংল্যান্ডে হ্যাটফিল্ড কলেজ অব টেকনোললির ন্যাশনাল রিপোগ্রাফিক সেন্টার ফর ডকুমেন্টেশন-এ প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ওই সালেই তিনি লন্ডনের কোডাক ফটোগ্রাফিক স্কুলে রঙিন ফটোগ্রাফি বিষয়ক ট্রেনিং লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ইংল্যান্ডে ‘বৃটিশ ইনস্টিটিউট অব ইনকরপোরেটেড ফটোগ্রাফারস’ (IIP) থেকে ফটোগ্রাফি ডিপ্লোমা করেন। ১৯৮২ সালে ভারতের ‘ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অব দমদম’ তাকে সে বছরের পৃথিবীসেরা ১১ জন আলোকচিত্রীর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ আলোকচিত্রের সাথে বসবাস করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার লেখা আলোকচিত্রের ওপর বই ‘আধুনিক ফটোগ্রাফি’ দুই বাংলার ফটোগ্রাফারদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। আলোকচিত্রে অবদানের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।

 
 
দেশে ফিরে এসে চাকরি নেন ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের মোশান পিকচার্স সেকশনে। সে কাজ করতে হয়েছিল তাকে ময়মনসিংহ গিয়ে। সেখানে তিনি শিক্ষিত যুবকদের ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ দেন। তিনি জীবনের বড় একটা সময় ফটোগ্রাফার হিসেবে চাকরি করেছেন সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে।

এ দেশে আলোকচিত্র শিক্ষাদানে তার অবদান স্মরণীয়। তিনি ছিলেন এদেশের আলোকচিত্র শিল্পের দিকপাল। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই বাংলাদেশে আলোকচিত্রের এ মহীরুহ এই শিল্পমাধ্যমে অসামান্য অবদান রেখেছেন।  তখন আলোকচিত্র ছিল ধনিক শ্রেণির বিষয়। সেসময় নওয়াব-জমিদার আর ব্রিটিশ সরকারে নথির জন্য ছবি তোলা হতো। ফলে এ দেশে শুরুর দিকের যেসব আলোকচিত্র পাওয়া যায়, তা বেশির ভাগই ভিনদেশী আলোকচিত্রীর তোলা।

বর্তমান আলোকচিত্র সাংবাদিকদের বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে মনজুর আলম বেগের সংস্পর্শে আলোকিত হয়েছিলেন। আবার কেউ কাজ শুরু করছেন তাঁর ছাত্রের কাছে শিক্ষা নিয়ে। তিনি ছাত্রদেরকে ছবি তোলা, ফিল্ম ডেভেলপ, ছবি প্রিন্ট শেখাতেন ধাপে ধাপে। কখনো ভালোবেসে কখনোবা ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোকচিত্রের বিস্তার ঘটিয়েছেন। গড়েছেন প্রচুর দক্ষ আলোকচিত্রী। আজকের ক্যামেরায় যে উন্নয়ন, তা এক দশক আগেও ছিল স্বপ্নের মতো বিষয়। আলোকচিত্র ছিল তখন কঠিন এক প্রক্রিয়ার বিষয়। কঠিন এ বিষয়টি হাতে-কলমে শিক্ষার্থী আলোকচিত্রীদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন মনজুর আলম বেগ।

 
এ দেশে ফটোগ্রাফি উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন নানা মাধ্যম নিয়ে। শুধু তাই নয়, তিনি নিয়মিত লিখেছেন ফটোগ্রাফি সম্পর্কে। ১৯৬০ সালে তোপখানা রোডে ‘রকসি ফটো সার্ভিস’ নামে একটি স্টুডিও চালু করেন। সে বছরের ডিসেম্বরে ‘বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন বয়সের শিক্ষিতজনদের ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তখন তিনিই ছিলেন আলোকচিত্রের একমাত্র শিক্ষক ও দিকনির্দেশক। প্রথম ব্যাচে ছাত্র ভর্তি হয়েছিলেন ২০ জন। তা থেকে কোর্স সমাপন করেছিলেন ১০-১২ জন। এ প্রতিষ্ঠান থেকেই এ দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ফটোগ্রাফি শিক্ষার বিস্তার ঘটে।

পরবর্তী সময়ে বেগার্টের ছাত্ররা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ফটোগ্রাফিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে দক্ষ আলোকচিত্রী গড়নের প্রয়াসে  ‘বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি’ প্রতিষ্ঠা করলেও দেশের প্রথম এই ইনস্টিটিউটটি পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি কিংবা সহায়তা। নেই, মহান এই শিল্পীকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সরকারি বেসরকারি কোনো উদ্যোগ। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতিরক্ষা এবং আলোকচিত্র শিল্পের উন্নয়নে আলোকচিত্রাচার্যের সুযোগ্যপুত্র বরেণ্য আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ-এর পরিচালনায় চলছে ‘বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি’ আলোকচিত্রাচার্য এম এ বেগ আজন্ম আলোকচিত্রের বিকাশে নিবিষ্ট ছিলেন। স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পটি বিশ্ব মানে এগিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে সিময়ের শক্তিশালী এই শিল্পমাধ্যমটি এগিয়ে যাচ্ছে তার স্বপ্নের পথে। যদিও সময়ের বাঁকে এসে অনেকেই ভুলতে বসেছেন আলোকচিত্র শিল্পের এই পথ প্রদর্শককে। আবার অনুসারীদের অনেকেই তার স্বপ্নকে বহন করে চলছেন আগামীর পথে। আলোকচিত্রচার্যের কর্মমুখর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 
 
নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers