মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৭ আষাঢ় ১৪২৮ , ১১ জিলকদ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি
  >
গ্যালারি

ছবির জাদুকর পাবলো পিকাসোর জন্মদিন আজ

নিউজজি প্রতিবেদক ২৫ অক্টোবর , ২০১৭, ১২:৪৭:২৭

  • সংগৃহীত

বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পীদের মধ্যে এক অনন্য নাম পাবলো পিকাসো। যিনি তার চিন্তায় নতুনত্ব ও ব্যতিক্রমী উপস্থাপনের জন্যে জীবদ্দশায়ই সারাবিশ্বে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সেরা চিত্রকরদের মধ্যে তিনি অন্যতম। জন্মসূত্রে স্প্যানিশ হলেও জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন ফ্রান্সে। চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে উত্তর আধুনিকতার জনক বলা যায় তাকে। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে বিশ্বের চারুকলাকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি।

পিকাসোর হাতে বাস্তববাদী অঙ্কনরীতি যেমন নতুন মাত্রা পেয়েছে, তেমনি পরাবাস্তববাদী শিল্পরীতিও সমৃদ্ধ হয়েছে তার প্রতিভার স্পর্শে। স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে তার বিশ্বখ্যাত শিল্পকর্ম ‘দেমোইসেল্লেস দ্য অ্যাভিগনন’ ও ‘গুয়ের্নিকা’।

আজ ২৫ অক্টোবর এই গুণী চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর জন্মদিন। ১৮৮১ সালের এই দিনে তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। পিকাসোর মুখের উচ্চারিত প্রথম শব্দ ছিল ‘পিজ’। স্পেনের ভাষায় যার অর্থ ‘পেন্সিল’। মাত্র নয় বছর বয়সেই পিকাসো তার প্রথম ছবি ‘এল পিকাদোর’ আঁকেন। প্রথমদিকে তিনি বাস্তবধর্মী ছবি আঁকতেন। কিন্তু তাঁর সেই ছবিগুলো ছিল বয়স্ক আঁকিয়েদের মতো। পিকাসো নিজেই বলতেন, শৈশবে আমি কখনো কোনো শিশুসুলভ ছবি আঁকিনি। বুড়ো হয়ে আমি শিশুদের মতো আঁকতে চেষ্টা করেছি।’

পিকাসো সারাজীবনে বিশ হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছেন। ‘ল্য মুঁল্যা দ্য লা গালেৎ’, ‘দ্য ব্লু রুম’, ‘ওল্ড গিটারিস্ট’, ‘সেলফ-পোট্রেট’, ‘টু নুডস’, ‘থ্রি মিউজিশিয়ানস্?’, ‘মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল’, ‘গুয়ের্নিকা’, ‘উইমেন অব আলজিয়ার্স’ তাঁর আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম।

তার চিত্রকর্ম ‘গুয়ের্নিকা’ সম্পর্কে বলা হয়- যতদিন মানুষ, স্বাধীনতার স্পৃহা, অগ্রগামী চিন্তা-চেতনা বেঁচে থাকবে, ততদিন গুয়ের্নিকা বেঁচে থাকবে। চিত্রটির পটভূমি হচ্ছে স্পেনের ব্যস্ক কান্ট্রির গুয়ের্নিকা নামক শহরটিতে স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের সময় জার্মান ও ইতালিয়ান যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণ। স্প্যানিশ ন্যাশনালিস্টদের কমান্ডেই তারা এই বোম্বিংটা করে। গুয়ের্নিকা ছিল রিপাবলিকান চেতনা ও ব্যঙ্গ সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। তাই ন্যাশনালিস্টরা এই শহর ধ্বংসের জন্য উন্মত্ত ছিল।

চিত্রটিতে রং আছে তিনটি। সাদা, কালো ও ধূসর। এই তিনটি রং ব্যবহার করার কারণ মূলত একধরনের বিবর্ণতা, বিষাদ ফুটিয়ে তোলা। ম্যুরালাকৃতির এই পেইন্টিংটি তেলরঙে করা। দৈর্ঘ্য ১১ ফুট আর প্রস্থ ২৫.৬ ফুট। এই চিত্রের মাধ্যমেই পিকাসো অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেন। এইখানে শুধু স্পেন নয়, পৃথিবীর সমগ্র স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিরোধী সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে আর মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির নিন্দা করা হয়েছে। পেন্সিল আর রঙ-তুলির জাদুতে তিনি এঁকেছেন সময় ও জীবনের বহুমাত্রিকতা।

তার সমসাময়িক আরেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ল্যুভর দেখতে না গিয়ে প্রথমে আপনাকে দেখতে এসেছি।’ অথচ এই পিকাসোকেই শিল্পী জীবনের মধ্যাহ্নে পৌঁছতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর দারিদ্র্যতামুখর পথ হাঁটতে গিয়ে ক্লান্তি ও শ্রান্তি তাকে জেঁকে ধরলেও ছবি আঁকা তিনি ছাড়েননি। বরং দারিদ্র্যতাকেই করেছেন ছবি আঁকার বিষয়।

তিনি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন যে, একটা সময়  ছবি আঁকার জন্যে রং কেনার পয়সা  ছিল না তার। পিকাসো তখন শুধু নীল রং দিয়েই ছবি আঁকতেন। তার এ সময়কে বলা হয় ‘ব্লু প্রিয়ড’। পিকাসো বলতেন, ‘আমার আবেগ কোনো রঙের অপেক্ষায় থাকে না। আমার যখন হলুদ রঙ থাকে না, তখন শুধু নীলেই আঁকতে পারি।’ মূলত নীল রঙে আঁকা পিকাসোর ছবিগুলো ধারণ করেছিল অন্য এক প্যারিসকে। 

তিনি মনে করতেন, চিত্রশিল্প হলো এমন এক মিথ্যা, যা আমাদের সত্যিকে উপলব্ধি করতে শেখায়। এমন চিন্তার কারণে সত্যের প্রতি পিকাসোর অবস্থান সবসময়ই ছিল অবিচল। শিল্পকে তিনি প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছেন বহুবার। পিকাসো নিজেই বলেছেন, ‘আমি সবসময়ই শিল্পকে মারণাস্ত্র ভেবে সময়ের সঙ্গে লড়াই করেছি। বিবেক, বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে আমি এক এক করে শিল্প রচনা করি।’ এ ব্যাপারটি তার প্রেমিকারাও স্বীকার করেছেন।

পিকাসো স্পেনের দুঃশাসক ফ্রাঙ্কোর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সবসময়ই সরব ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাবার জন্যে ফ্রাঙ্কো-সরকারের ছাড়পত্র নিতে হবে বলে পিকাসো আর সেখানে যাননি। উল্টো তিনি ফ্রাঙ্কোর শাসনকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ফ্রাঙ্কোর কাছ থেকে কাগজ নেবার মতো ঘৃণ্য কাজ আমি করতে পারি না। আর আপনাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে, পিকাসো নির্বাসনে আছে মানে স্পেন দেশটাই নির্বাসনে আছে।’ এমনই প্রতিবাদী ও নির্ভীক ছিলেন পিকাসো। চিত্রকর্মের পাশাপাশি তাঁর সাহসের প্রশংসাও করেন শিল্পবোদ্ধারা।

পিকাসো একদিকে ছিলেন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, প্রিন্টমেকার, মৃৎশিল্পী, মঞ্চ নকশাকারী, কবি, নাট্যকার; আবার অন্যদিকে তিনি ছিলেন কিউবিস্ট আন্দোলনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, গঠনকৃত ভাস্কর্যের উদ্ভাবক ও কোলাজের সহ-উদ্ভাবক। ১৯৭৩ সালের ৮ এপ্রিল ৯১ বছর বয়সে ফ্রান্সের মুগী শহরে এই ছবির জাদুকর মৃত্যুবরণ করেন। 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers