বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

শিল্প-সংস্কৃতি

সিনেমাকে হালকা কিছু ভাবার ব্যপারটাই অশিক্ষার প্রকাশ

আসিফ রহমান সৈকত ৩ জুলাই, ২০২৬, ১৬:০২:৫৪

223
  • সিনেমাকে হালকা কিছু ভাবার ব্যপারটাই অশিক্ষার প্রকাশ

অনেক অনেক ধন্যবাদ, আপনাকে, পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। আপনি (পরিচালক) একদম আসল কথাটা বলে দিয়েছন একটা সাক্ষাৎকারে। “সিনেমা দেখতে কেন লেখাপড়া করা লাগবে বা কিছু জানা লাগবে”- এইসব যখন কলেজ, বিশ্বিবদ্যালয় পাস করা ছেলেমেয়রা বলে, তখন মনে হয় তাদের জীবেন কলেজ বা বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়াটা ছিল আসলে একটা ছলচাতুরি , একটা দুই নাম্বারি, একটা লোকদেখানো ডিগ্রি পাওয়ার অভিনয় এবং সমাজের চাপ, বিয়ের জন্য, চাকিরর জন্য, ভিক্ষার জন্য তির হওয়ার প্রক্রিয়া মাত্র।

জীবনানন্দ দাশের কবিতার অনেক কিছু না বুঝেও তা কবিতার আনন্দ পাওয়া যায়। জানলে আরও ভালো আর না জানেলও জানার ইচ্ছা জাগে। এটাই তো শিল্পের শক্তি। সিনেমাও তো এইরকম আছে, শত শত এই দুনিয়ায়। বছরে হয়ত দুনিয়ায় অন্ততঃ  ১০০ এর উপর এইরকম সিনেমা হয় যেগুলোতে চিন্তার খোরাক আছে। সবগুলোর কথা আমরা জানেতও পারি না বা জানি না। ১০টা তা কমপেক্ষ অবশ্যই হয়। যারা জানেত চান, যাদের ক্ষুধা আছে, তারা ঠিকই জানেন সেটা।

বিঃদ্রঃ একটা সিনেমাতে বা অনেক সিনেমাতেই যেগুলো বিশ্বসেরা বা একটু অন্যরকম অনেক কিছু মানুষ বুঝতে পারে না, সবাই বুঝতে পারে না তাতে কি যায় আসে? আপনার অনুভূতি কী, সেটা আপনাকে ধাক্কা দিলো কি না, সেই সিনেমার কিছু আপনাকে অস্বস্তি দিচ্ছে কি, আপনাকে আপনার প্রিয় বা অপ্রিয়ের মুখোমুখি করাচ্ছে কি? আপনার বিশ্বাসের জায়গাতে ধাক্কা দিচ্ছে , যদি দেয়, তাহলে সেটা বিশ্বাস করতেই হবে কেন সেটা কি ঐ সিনেমা আপনাকে বলেছে? আপনি এত বিরক্ত হচ্ছেন কেন? আমাদের সবার মধ্যেই তা ভালো-খারাপ থাকে। এখন খারাপ কিছু যদি আমি আয়নায় নিজে দেখি নিজেরও তা খারাপই লাগে, ভালো তো লাগার কথা না। তারপরও তা সেই খারাপটাও আমারই, একান্ত আমার নিজের  এবং সেটা সত্য। এমন কেন মনে হয় না, “বাহ, দারুণ একটা কিছু দেখলাম, ভাবিয়েছে সিনেমাটা, কিছু জায়গা আমাকে শিহরিত কেরেছে যে অনুভূতি আমি আগে কোথাও পাইনি”। হতেই তো পারে। সব জানা ব্যপারই যদি আমি সিনেমাতে দেখি তাহলে সিনেমা আজকের এই জায়গাতে  আসতই না। নতুন কিছু দেখা বা বাংলা সিনমাতে নতুন কোনো সিনেমার দেখা পাওয়াটাই তা আনেন্দর। সেটা 'বনলতা সেন' হোক বা ‘রইদ’। আসল কথা আসলে বলা হেয় গেছে, এখন হয়েতা উদাহরণ দিয়ে  একটু দেখা যেতে পারে ব্যপারগলো। রাসূল(সাঃ) এর সময়ে কি নেয় একটা চলচিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন সেই চলচিত্রে অনেক কিছু আছে যেটা আপনি এমনিতেই বুঝে যাবেন। কিন্তু  যাদের রাসূল (সাঃ)-এর সীরাত বা জীবনী সম্পেক ধারণা আছে এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞ্যান আছে  তাদের জন্য এই সিনেমা একরকম আর যাদের কোনো রকম ধারণা নাই তাদের জন্য আরেক রকম। যাদের কোনো ধারণা নাই তাদের ক্ষেত্র অনেক কিছুই অবাধ্য  মনে হবে। যাদের যেথষ্ট পড়াশোনা আছে তাদের ক্ষেত্রে তারা অনেক কিছু বুঝতে পারবেন বা কোনো

কিছু  ঐতিহাসিকভাবে ঠিক না হলে বলতে পারবেন। তাহলে এখানে শুধু চলচ্চিত্র  নির্মাতার জানা-শোনাটাই যেথষ্ট নয়। দর্শকের জানা-শোনাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এখন কোনো দর্শক যদি বলেন যে বুঝতে পারেন নাই সিনেমাটা তাহলে নির্মাতাকে দাষ দেয়া যায় না। রামায়ণ বা মহাভারতকে কেন্দ্র করে যতগুলো সিনেমা আেছ সেই ক্ষেত্রেও যাদের এই বইগুলো পড়া নাই বা কোনো ধারণা নাই সনাতন ধর্ম সম্পর্কে তাদের ক্ষেত্রে এইসব সিনে মার কাহিনী বোঝার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু  কাটি কাটি মানুষ এই সিনেমাটা বুঝেত পারবেন আবার কোটি কোটি মানুষ হয়তো বুঝতেই পারেবন না । তাহলে পুরো ব্যাপারটা নির্মাতার উপর নির্ভর করে না। ক্রিশ্চান ধর্মের বাইেবল অবলম্বনে যে কাহিনী গুলোকে কেন্দ্র করে সিনেমা করা হয় সেই ক্ষেত্রেও বাইবেল সেটার ন্যারেটিভ কী দেয়া আছে সেই সম্পর্কে ধারণা থাকলে অনেকেই বলবেন ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। কারণ বাইেবেলে কী লেখা আছে সেইটার সাথে সম্পর্ক করে চলচিত্রনির্মাতা সিনেমাটা বানিয়েছন। তাহেল চলচিত্র নির্মাতা এবং দর্শক দুইজনেরই আলাদা একটা জার্নি আছে। এই দুই পক্ষেরই  একটা লেখাপড়া এবং  জানাশোনার সক্ষমতার উপর একটা চলচিত্রের বোঝা না বোঝার ব্যাপার আছে। আপনার নীৎশে সম্পর্কে যদি ধারণা থাকে তাহলে বেলা তারের সিনেমা ‘তুরিন হর্স’এর অনুধাবন একর কম হবে, নইলে অন্যরকম। আমরা যারা প্রেকৗশল বিশ্ববদ্যালয়ে পড়াশেনা করেছি তাদের কাছে ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার ব্যপারটা অন্য অনেকের থেকে অন্যরকম কারণ আমরা ছাত্রাবাস এ থেকেছি, একই ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের সাথেই আলাদা আলাদা এলাকাতে থেকেছি। আমরা যে ভাবে থ্রি ইিডয়টস সিনমাটা অনুধাবন করব সেটা অন্যেরা পারবে না সেটাই স্বাভাবিক। তার মানে একই সিনমা ভিন্ন  ভিন্ন জন ভিন্নভাবে গ্রহণ করবে। তেমন মাসুদ হাসান উজ্জ্বেলর ‘বনলতা সন’  বা মেজবাহুর রহমান সুমনের ‘রইদ’ বা ‘হাওয়া’ অথবা এন রাশেদ চৗধুরীর ‘চন্দ্রাবতী কথা’। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশের ইতিহাস  সিনেমায় সিনেমা যারা দখবেন তাদের যদি ইতিহাস জানা না থাকে তাহলে অনেক কিছুই নির্মাতা হয়তো দর্শারা বোঝাতে পারবেন না কিন্তু তার মানে এই না যে সে জন্য দর্শক সিনেমাটা দেখতে পারবেন না। অনেক সময় চলচিত্রের মাধ্যেমে দর্শকের মধ্যে  ইতিহাস,  ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মানুষকে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। পরিচালক যদি সেই আগ্রহটাও ঠিকঠাক তৈরি করতে পারেন সেটাও একটা দারুণ ব্যপার। সেটা তো হয়ই। যেমন আপনার যদি মানুষের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস জানা থাকে তাহলে রাহুল সংকৃত্যায়নের ‘ভালগা থেক গঙ্গা’ পড়তে একরকম লাগবে। আপনার যদি ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে একটা ধারণা থাকে তাহেল শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদােসর হাসি’ আরেক রকম লাগবে বা সাদাত হোসেন মান্টোর গল্পগুলো অন্যভাবে আপনার কাছে ধরা দিবে যদি আপনার দেশভাগের ইতিহাস জানা থাকে।  ভালো বই পড়েই আপনে যেমন সবকিছু একভাবে বুঝে ফেলেন না, তেমন ভালো সিনেমাও আপনাকে অনেক নতুন কিছুর সাথে নতুন আগ্রহে ধাবিত করতে পারে। এইখানেই একটা ভালো সিনমার শক্তি। বাংলা ভাষায় এখেনা প্রেকৗশল বিদ্যা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বা এই কাজে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অনেক ভালো এবং জরুরি কাজ করার সুযোগ আছে। অন্ততঃ ১০০টার উপর সিনেমা তা বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর বা এর সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান বা মানুষদের নিয়ে করারই সুযোগ আছে। আরো ভালো হয় যদি এমন কোনো ভালো পরিচালক আমরা সামনে পাই যাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা আছে প্রকৌশল নিয় পড়ার বা এই সম্পর্কিত জায়গাগুলোর সাথে কাজ করার তখন বাংলাদেশ নতুন নতুন ভালো কাজ দেখাতে পারে। চিকিৎসা ক্ষেত্রের গল্প নিয়ে অনেক অনেক ভালো চলচিত্র হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এবং সেইজন্য সব সেক্টরের মানুষকেই চলচিত্রের শক্তিটা অনুধাবন করতে হবে। আর সেজন্য দরকার ফিল্ম সোসাইটি এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের চলচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। সেই চলচিত্র নিয়ে আলাপ করা। ভালো চলচিত্র দেখানো হলো প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেমন ভালো বই পড়া হলো একজন ভালো লেখকের জন্য সব থেক গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ।

‘রইদ’ বা ‘বনলতা সেন’ বা ‘নকশীকাঁথার জিমন’ বা ‘চন্দ্রাবতীর কথা’ ইত্যাদি অনেক অনেক নতুন ভালো চলচিত্রের দ্বারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দর্শক এবং চলচিত্র  নির্মাতার মধ্য সি িলতভােব বাংলাদেশের চলচিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে ধারাটা অব্যহত আছে সেটা দিন দিন আরো বড় হবে এবং ফিল্ম  ইন্ডাস্ট্রিও আরো শিক্তশালী হবে।   চলচিত্র হলো এমন একটা জায়গা যেখানে টেকনিক্যাল জ্ঞ্যান এবং শৈল্পিক জ্ঞ্যানের একটা মিলনস্থল যা ব্যপকভােব লখাপড়া এবং চর্চার মাধ্যেমে অর্জন করতে হয়। সেজন্যই মাধ্যমটাও এতো শক্তিশালী। বাংলাদেশের চলচিত্র এগিয়ে যাক। চলচিত্র নিয়ে লেখাপড়াটা অব্যহত থাকুক। চলচিত্র চর্চার প্রসার ঘটুক। বিশ্বের মানচিত্রর বাংলাদেশের চলচিত্র আরো বড় জায়গা অর্জন করুক। 

লেখক: চলচিত্র সমােলাচক।

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers