বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

শিল্প-সংস্কৃতি

রামকিঙ্কর: পথের মানুষ, না মানুষের পথচলা?

অমৃতা ইশরাত ২৬ জুন, ২০২৬, ১৩:১১:৫৪

355
  • রামকিঙ্কর: পথের মানুষ, না মানুষের পথচলা?

ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাস অনেকটা ক্ষমতার ইতিহাস। মন্দিরের গায়ে দেবদেবী, প্রাসাদের প্রাঙ্গণে রাজপুরুষ, নগরের চত্বরে বীরযোদ্ধা—যারাই ভাস্কর্যের বিষয় হয়েছেন, কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার প্রতিনিধি। সাধারণ মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকলেও প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠেনি। শিল্প তাকে দেখেছে, কিন্তু তার দিকে তাকায়নি। রামকিঙ্করের (১৯০৬-১৯৮০) সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই। তিনি ভাস্কর্যের ভাষা বদলানোর আগে নায়ক বদলেছিলেন।

এই পরিবর্তনের শক্তিশালী দলিল হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি ‘সাঁওতাল পরিবার’। ভাষ্কর্যটির দিকে তাকালে প্রথমে যা চোখে পড়ে, সেটা শুধু পরিবারটির প্রতিকৃতি নয়, এক দীর্ঘ যাত্রা। তারা কোথায় যাচ্ছে, আমরা জানি না। কিন্তু তাদের এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, ইতিহাস যেন কাঁধে বোঝা তুলে পথ চলছে। ভারতীয় ভাস্কর্যে এর আগে মানুষকে এভাবে গতিশীল সত্তা হিসেবে খুব কমই দেখা গেছে। মূর্তি সাধারণত স্থির থাকে, রামকিঙ্কর সেই স্থিরতার নিয়ে এসেছেন মানুষের পথ চলা। ভাস্কর্যটি এখানে সময়ের প্রবাহ থেকে ছিনিয়ে আনা একটি মুহূর্ত।

এই হাঁটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভাস্কর্যটির গভীরতা। রামকিঙ্কর জানতেন, মানুষের ইতিহাস মূলত যাত্রার ইতিহাস। স্থানান্তর, উদ্বাস্তু শ্রমিক, শ্রমের সন্ধান, জীবিকার তাগিদে মানুষ বারবার পথ বদলেছে। সাঁওতাল পরিবারের মানুষগুলো সেই বৃহত্তর ইতিহাসের প্রতিনিধি। তাদের গন্তব্য অজানা, কিন্তু গতি স্পষ্ট। ভাস্কর্যটি একটি পরিবারের প্রতিকৃতি ছাড়িয়ে মানবজীবনের অনবরত অগ্রযাত্রার রূপক হয়ে উঠেছে।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। সাঁওতালরা উনিশ ও কুড়ি শতকের শিল্পে প্রায়শই : লোকজ’ বা ‘বিশেষ জাতিসত্তার’ মানুষ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। রামকিঙ্কর তাদের সেই দূরত্বে রাখেননি। তাঁর ‘সাঁওতাল পরিবার’ নৃতাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়, ইতিহাস নির্মাণকারী মানুষ।

‘মিল কল’ ভাষ্কর্যে এই রাজনৈতিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারখানার সাইরেন শুনে শ্রমিকদের ছুটে চলার দৃশ্যকে শিল্পের বিষয় হিসেবে নির্বাচন করাই ছিল এক ধরনের অবস্থান। তবে রামকিঙ্করের আগ্রহ কেবল শ্রমিককে চিত্রিত করা নয়, তিনি ধরতে চেয়েছেন আধুনিক সময়ের গতি। এই ভাস্কর্যের দিকে তাকালে মনে হয়, শরীরগুলো যেন বাতাস ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থির মাধ্যমে এমন গতিশীলতা সৃষ্টি করা সহজ নয়। এখানে গতি শুধু দেহের নয়, যুগেরও। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী পৃথিবীতে সময় আর সূর্যের আলোয় মাপা হয় না; মাপা হয় বাঁশির শব্দে, সাইরেনের ডাকে, কারখানার শিফটে। ‘মিল কল’ সেই নূতন সময়বোধের ভাস্কর্য।

তবে রামকিঙ্করের গুরুত্ব কেবল এই কারণে নয় যে তিনি সাধারণ মানুষকে শিল্পের নায়ক করেছিলেন। শান্তিনিকেতন-পর্বের শিল্পচর্চার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। নন্দলাল বসু ভারতীয় ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারে আগ্রহী, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ইতিহাস ও মানবসভ্যতার দীর্ঘ প্রবাহকে চিত্রভাষায় ধারণ করতে আগ্রহী, আর রবীন্দ্রনাথের শিল্পজগৎ ক্রমশ ব্যক্তিমানসের গূঢ় ও স্বপ্নময় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। রামকিঙ্কর এই তিনটি প্রবণতার ভেতর থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শরীর—কিন্তু সেই শরীর কোনো আদর্শ সৌন্দর্যের বাহক নয়; শ্রমে ক্লান্ত, রোদে পোড়া, চলমান, কখনও ভারবাহী, কখনও ছুটে চলা এক বাস্তব শরীর।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মিত তাঁর ভাস্কর্যগুলো এজন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কবির মুখের সাদৃশ্য সংরক্ষণে আগ্রহী ছিলেন না, তাঁর আগ্রহ ছিল কবির সৃষ্টিশীল মনের অন্তর্গত অস্থিরতা ও শক্তি দিকে। তাই রবীন্দ্র-ভাষ্কর্যের মুখাবয়ব কখনও ভাঙা, কখনও খসখসে, কখনও প্রায় অসমাপ্ত বলে মনে হয়।

রামকিঙ্করের শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা দেখি ‘সুজাতা’ ভাস্কর্যে। বৌদ্ধ আখ্যান অনুযায়ী, সুজাতার দেয়া পায়েস খেয়ে সিদ্ধার্থ গৌতম মধ্যমার্গের উপলব্ধিতে পৌঁছান। তবে রামকিঙ্কর গল্পটি বলেন না। কোনো অলৌকিক মুহূর্তও নির্মাণ করেন না। তিনি সুজাতাকে একজন চলমান নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। এখানেই তাঁর শিল্পের মৌলিকতা।

তিনি চরিত্রের ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে মানবিক উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সুজাতা এখানে দেবী নন, প্রতীকও নন। সুজাতা একজন মানুষ। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, শরীরের ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ স্থিরতা—এসবের মধ্যেই শিল্পী সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন। তাই ভাস্কর্যটি ধর্মীয় কাহিনির পুনর্নির্মাণ না হয়ে মানবিক মর্যাদার নিঃশব্দ উদযাপনে পরিণত হয়েছে।

শেষ পর্বের ‘যক্ষ’ ও ‘যক্ষী’ ভাস্কর্যদ্বয়কে অনেকেই রামকিঙ্করের পরিণত শিল্পচিন্তার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। এ পর্যায়ে তিনি পুরাণে ফিরে গেছেন তবে পুনরাবৃত্তি করেননি। পুরাণকে আধুনিকতার আদলে পুনর্নির্মাণ করেছেন। বিশাল মূর্তি দুটির শরীরে যেমন প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যের স্মৃতি আছে, তেমনি আছে কুড়ি শতকের ভাস্কর্যভাষার শক্তি। 'যক্ষ' ও 'যক্ষী' কোনো পৌরাণিক অলংকার নয়—মাটি, শ্রম আর সমৃদ্ধির সম্মিলন।

রামকিঙ্করের শিল্প নিয়ে বলতে গেলে উপকরণের প্রসঙ্গও অনিবার্য হয়ে পড়ে। মার্বেল বা ব্রোঞ্জের পরিবর্তে সিমেন্ট, কংক্রিট, ল্যাটেরাইট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিছক অর্থনৈতিক ছিল না। এর মধ্যে ছিল নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিবাদ। তিনি শিল্পকে অভিজাত উপকরণের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে শিল্পের সত্য উপাদানের আভিজাত্যে নয়, প্রকাশের শক্তিতে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers