বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

শিল্প-সংস্কৃতি

এলাইস ওয়েলকাম (২০২২) একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র

আসিফ রহমান সৈকত ১৯ জুন, ২০২৬, ১৫:০৩:৪২

272
  • এলাইস ওয়েলকাম (২০২২) একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র

১৭তম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবেসেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছেএই চলচ্চিত্রটি। তিনজন আফগান নাগরিকের বয়ান উপস্থাপন করা হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে, যেখানেউনারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকাতে এসেছেন। আর পরিস্থিতিটা ছিলো এমন এক সময়ের, যখন তালেবানরা আবার নতুন করে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে ফেলছে। 

শরণার্থী হিসাবে আমেরিকাতে কোনো রকমে প্রবেশ করতেপারলেও, এই আফগানরা নিজেদের অবস্থা এবং আমেরিকাতে ইমিগ্রেশন স্ট্যটাস নিয়ে শংকিত। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে মাথায় নিয়ে তারা দিন যাপন করছেন। তারা প্রতিদিন একটু একটু করে মানসিক অসুস্থতায় নিমজ্জিত হচ্ছে্ন। ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। দুঃস্বপ্ন তাদের ঘুমে হানা দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় একই সময়ে ঘটলো আরো একটি বড়ো ঘটনা যা পুরো পৃথিবীকেই আরো সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়ে ছিল। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলেই উক্রেনের শত শত শরণার্থী আমেরিকাতে প্রবেশ করলো। এটা আফগান শরণার্থীদের অবস্থাকে আরেক নতুন চ্যলেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়। আশ্রয়দাতা দেশ(?!) আমেরিকার কাছে এখন দুই দেশের শরণার্থী: আফগানিস্তান এবং ইউক্রেন । এবার শুরু হয়ে যায় তাদের মধ্যে তুলনা। কে বেশি সাহায্য পাওয়ার দাবিদার; কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শরণার্থী; কে বেশি সাদা, কে কী ধর্মের, আমেরিকা কাকে প্রাধান্য দিবে, ইউরোপকে নাকি এশিয়ানদেরকে; খৃস্টান-ইহুদীদের নাকি মুসলমানদের যারা আবার শিয়া সুন্নীসহ অনেক ভাগে বিভক্ত। সংসদে, পত্রিকায়, আলাপে শুরু হয় নতুন আরেক আলোচনা, রাজনৈতিক ধরনের তুলনা আর হিসাব-নিকাশ। শরণার্থীদের মধ্যে বৈষম্য! আফগানরা শরণার্থী হিসাবেই ব্যপক বৈষম্যের শিকার হয়। আফগান শরণার্থীদের স্বার্থে যে বিল আমেরিকান কংগ্রেসে পাশ হবার কথা ছিলো সেটা এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ-ই ঝুলে যায় এবং ঝুলেই থাকে। শিক্ষিত, সচেতন এই আফগান যুবক-যুবতীদের প্রতিনিধি হিসাবেই এই সিনেমার প্রোটাগনিস্টরা কথাগুলো বলেন। প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির পরিচালক সাকিব আসরার এবং তাভলীন তাররান্ত। 

# ‘এলাইস ওয়েলকাম’ বলতে তারা বোঝাতে চায় সেই আমেরিকাকে যারা নিজেদেরকে আফগানদের বন্ধু হিসাবে পরিচয় দিয়ে তাদের পাশে এসেছিল। আফগানিস্তানকে গণতন্ত্র শিখাতে এসেছিলো তারা। আমেরিকাকে আফগান শরণার্থীরা মনে করিয়ে দিতে চায় যে তারাই তাদেরকে ২০ বছর ধরে, আমেরিকার গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নকে নিজেদের(আফগানদের) স্বপ্ন মনে করে তাদের পাশে ছিল। আজকে যখন তালেবানশাসিত সরকার দেশের শাসনে আসে তখন আমেরিকানরা তো ফিরে গেলো নিজের দেশে কিন্তু যে আফগানরা আমেরিকানদের পাশে ছিল তাদের ভবিষ্যত যে ঝুঁকির মুখে পড়ে গেল সেটা কি আমেরিকানরা ভেবেছে? আফগান শরণার্থীরা সেই কথাটাই আমেরিকানদেরকে মনে করিয়ে দিতে চায়।প্রামাণ্যচিত্রটিতে যে তিনজন কথা বলেছে তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত, অগ্রসরমান মানুষ এবং আফগান। তাদের মাতৃভাষা দারি (অনেকটা ফার্সির মতোই, অনেকে বলেন, প্রাচীন ফার্সি) এবং তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের আফগানিস্তানে রেখে এসেছে। তারা তাদের পরিবারের ভরন পোষণ করেন, তাদের আয়ে তাদের পরিবারে খাবার আসে। শরণার্থীদের ব্যপারে বিভিন্ন সিদ্ধান্তহীনতায় তারা এখন এক কঠিন পরিস্থিতির শিকার। 

#এশিয়ান আর ইউরোপের বৈষম্য: 

আমেরিকানরা ইউক্রেনের শরণার্থীদেরকে বলছনে, ভদ্র, সভ্য শরণার্থী ( সিভিলাইজড রিফিউজি)! কিন্তু আফগানদের বলছেন, অশিক্ষিত, বর্বর! আসলে কি তাই? সব আফগানরা কি তাই? বা যেআফগানরা আসলে শরণার্থী হিসাবে আমেরিকাতে এসেছে বা আসতে পেরেছে বা আসতে চায় বা আসার সক্ষমতা-যোগ্যতা রাখে তারা কেন বর্বর, অশিক্ষিত হিসাবে চিহ্নিত হবে? এটা তো এক ধরনের রেসিজম।যে প্রোটাগনিস্টরা কথা বলছেন তারা নিজেরাই সেই বৈষম্যের শিকার । কিন্তু আমরা দেখি যে, তারা উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ। 

প্রামাণ্যচিত্রটি একটা সত্যি এবং ঐতিহাসিক ঘটনানির্ভর। তালেবান আসার পর সাধারণ মানুষের গল্প। সেই সময় কাবুল থেকেপালানোর জন্য অনেকেই দৌড়াচ্ছে। যারা আমেরিকাতে এসেছে এই রকম কয়েকজনের গল্প। একেবারে মানবিক গল্প অনেক দেশেই এটা হতেপারে। তাই আফগান এবং আমারিকার গল্প হলেও এটা আসলে সারা বিশ্বেরই গল্প। ইউক্রেনেও তো একই ব্যপারই ঘটছে। তাদের সাধারণ মানুষ জন তো আশপাশের দেশেই চলে গেছে। তাদের জীবনে কি হচ্ছে? কি ঘটছে? এইভাবে জীবন কে কাটাতে চায়? কিন্তু যখন কাটাতে হয় তখন তো কিছু করার নেই , বেঁচে থাকার লড়াইটা তো চালাতেই হয়। এক্সপোসিটোরি টাইপ ডকুমেন্টারি, যেখানে সত্যকে প্রকাশ করার ইচ্ছায় দর্শককে জানানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকেএবং বর্ণনাকারীরা তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে দর্শককে তাদের মতের দিক টেনে আনতে চান বা নিজেদের অবস্থানকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। অনেকটা খবরের ক্ষেত্রেআমরা দেখি। প্রামাণ্যচিত্রটা সেইভাবেই বানানোএবং কনটেন্টও এই ২০২৩-২০২৪ সালের নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রামাণ্যচিত্রটির বড়োঅংশ জুড়ে রয়েছে তাদের সাক্ষাৎকার। এটা এক ধরনের জরুরি ডকুমেন্টেশনও। আফগান-আমেরিকানদের জন্যও। সাথে তাদের বয়ানের সাথে সম্পর্ক করে টেলিভিশন এবং রিয়েল ফুটেজ দেখানো হয়েছে। কিছু জায়গায় তাদের কথার সাথে সম্পর্কিত ভিজ্যুয়ালকে শক্তিশালী করার জন্য এনিমেশন যোগ করা হয়েছে যা তেদর্শক সহজে কথার সাথে নিজের সংযোগ ঘটাতে পারে। তাই তিনটি জরুরি উপাদানঃ জরুরি চরিত্র নির্বাচন এবং তাদের সাক্ষাৎকার, যারা সুন্দর করে তাদের ভাবটাকে প্রকাশ করতে পারে, সাথে রিয়েল ফুটেজ এবং এনিমেশন। যাদের কথা কোথাও সহজে শোনা যায় না , এমন মানুষের কথাই উঠে আসে এই প্রামাণ্যচিত্রে। আমরা শুধু শুনি আফগানরা চলে গেছে কিন্তু কেনো গেছে, গিয়ে কি অবস্থায় আছে সেটা নিয়ে আলাপটা হয়তো সবাই জানি না। যারা এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে তাদের কথা শেনা দরকার। কে জানে, কালকে হয়তো আমার আপনার এই একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদের হামলা , চেষ্টা , সেটা তোএই উপমহাদেশে বার বারই হচ্ছে। সফল হয়নি বলে যে কখনো হবেনা কখনো কে জানে, তখন কি হবে? তখন এই এলাকার তালেবানদের আচরণ কী হবে, আমরা তো জানি না। 

ফাতিমা নিউইয়র্কে এসেছে, আসলে আসতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে কাবুলে। এখানকার লোকজন যা নিয়ে কথা বলে সে তার সাথে নিজেকে রিলেট করতেপারে না। নিউইয়র্কের মানুষ আফগানদের হাসিঠাট্টা (জোকস) বুঝে না। কালচারাল শকের মধ্যে প্রতিটা দিন সেপার করতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে শুরু হলো ইউক্রেনের যুদ্ধ। টিভিতে এক লোক বলতে সে অবস্থা আসলে ইরাক, আফগানিস্তানের মতোই কিন্তু ইউক্রেনের লোকের তুলনামূলকভাবে সভ্য, ভদ্র, সিভিলাইজড। ইউরোপের মুখোশ আসলে পুরা দুনিয়ার কাছে এভাবে উন্মোচন হতো না যদি না, একই সময়ে এশিয়া আর ইউরোপে দুইটা দেশে এইরকম ঘটনা না ঘটতো। আফগানিস্তান আর ইউক্রেন , দুই দেশের নাগরিকই রিফিউজি। কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে ইউরোপের যে সহানুভূতিতার ১০ গুণ বেশি সহানূভূতি ইউক্রেনের লোকজনের প্রতি, যেন আফগানরা মানুষ হিসাবে একটু নিচু স্তরের , তার আশি না তারা ঊন-আশি, তারা মানুষ না তারা ঊন-মানুষ। আফগানরা মুসলিম, ইউক্রেনের লোক খৃস্টান আর ইহুদি। অনেক অনেক বিশাল পার্থক্য। ইউক্রেনের প্রায়োরিটি বেশি। তাদেরকে বাচানোর ইচ্ছা , চেষ্টা বেশি। ইউরোপ তো এশিয়া থেকে সভ্য দেশ। ইউরোপকেই  জায়গা দিতে হবে বেশি। দুনিয়ার লোক কিন্তু দেখছে এটা কিন্তু তাতে কারো কিছু যায় আসে না। ভাগ্য ভালোসেই নব্বই দশকের মতো, শুধু ইউরোপই একাই মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না; অন্যরাও এখন আছে। মানুষ বুঝে গেছে যে মিডিয়ার সব কিছু বিশ্বাস করা যায় না। তারাও আসলে এই ষড়যন্ত্রে একটা অংশ। তারা সেইটাই করে যেটা তাদের প্রভু তাদের করতে বলেঅথবা তারা নিজেরাও সেই রকমই। 

ডক্কুমেন্টারিতে সাবজেক্ট , ঘটনা, যে কথা বলছে সেই মানুষটার কথা বলার গভীরতা অনেক জোরালো করে কাজটাকে। সাথে সেই ঘটনা যদিঐতিহাসিক একটা ঘটনার সাথে সংযুক্ত হয়ে যা সাধারণ মানুষের বয়ানে আসে সামনে তাহলে আরো গুরুত্বপূর্ণ এবং দর্শকের সাথে সংযোগ স্থাপনে সহায়ক হয়। 

আফগানরা ‘সিভিলাইজড রিফিউজি’ না। ইউক্রেনের লোকরা সিভিলাইজড। তাদের জন্য কংগ্রেসে দ্রুত বিল পাশ হয়। তার আগে থেকে আফগানরা এতো দিন ধরে তাদের অবস্থা তুলে ধরেও কংগ্রেসের থেকে তাদের পক্ষে বিল পাশ হয় না। সেগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়। 

আফগান যারা কথা বলছেন এখানে তাদের মাতৃভাষা দারি। পশতু না। পশতু হলো তালেবানদের মাতৃভাষা। জাতিগত একটা পার্থক্য এদের মধ্যে আছেই। 

আফগান রিফিউজি বলে যে, আমি একই সাথে এটাকে চাই আবার একই সাথে এটাকে ঘৃণা করি। উদবিগ্নতা, ডিপ্রেশন, স্ট্রেস থেকে তারা বের হতেপারে না। ফাতিমা নিজেই পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডারে ভুগছে( PTSD) .এটা কিন্তু উচ্চশিক্ষিত , সমাজের সুবিধাভোগী আফগান। তাদেরই এই অবস্থা। এইরকম বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের একটা বড়ো অংশ নিয়মিত আমেরিকায় যাচ্ছে। তাদের সবার গল্প কি আমরা পাই কোথাও সহজে, সেটা কি বলে কেউ, সেই গল্পের ডকুমেন্টেশন জরুরি। সেই ডকুমেন্টারি কিন্তু আমরা দেখতে চাই। কিন্তু ঐ যে, যতক্ষণ ঝামেলা নিজের উপর এসে না পড়ে ততক্ষণ কেউই কথা বলে না, ততোক্ষণ সেটা যেন শুধুই আরেক জনের সমস্যা! তাই আমরা জানিও না, সচেতন হবারও সুযোগ নাই। 

শরণার্থীর মধ্যেও উচু-নিচু জাতের খেলার গল্প 

এশিয়ার রিফিউজি আর ইউরোপের রিভিউজির মধ্যে পার্থক্য দেখে সবাই। ইউরোপিয়ান রিফিউজিদের প্রাধান্য আগে, তাদের বাচার অধিকার এশিয়ানদের থেকে বেশি। আমেরিকার সংসদ , মিডিয়া ঘুরে ফিরে সেইটাই বলার চেষ্টা করেছে। 

আফগান শরনার্থীদের এই ডকুমেন্টারি আমাদেরকে বাংলাদেশের শরণার্থী যারা তাদের গল্প শোনানোর ব্যপারে আগ্রহী করে তুলেছে যারা নিয়মিত দেশের অবস্থা খারাপ, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা খারাপ এই সব অভিযোগে আমেরিকাতে পড়তে যায় ( সেটার পূর্ণ অধিকার উনাদের আছে) । কিন্তু সেটা করতে গিয়ে কি কি সমস্যা বা সুবিধা তারা আসলে বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে পেয়েছেন সেটাও শোনার অধিকার আমাদের আছে।

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers