শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৯ শাওয়াল ১৪৪৭

শিল্প-সংস্কৃতি

সূর্য, নক্ষত্র, নারী

অমৃতা ইশরাত ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ২০:১৮:৫৫

423
  • সূর্য, নক্ষত্র, নারী

‘মানুষের প্রতিশ্রুতির পথে যত

নিরুপম সূর্যালোক জ্ব’লে গেছে—তার

ঋণ শোধ ক’রে দিতে গিয়ে এই অনন্ত রৌদ্রের অন্ধকার।’

—জীবনানন্দ দাশ

মাইকেল মাল্মের 'Bringing Light into Darkness' চিত্রকর্মটি যেন জীবনানন্দের এই পঙক্তিগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। দূরের কমলা আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে, আর সেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী, হাতে একটি ছোট্ট প্রদীপ। দীপটি কেবল দৃশ্যমান আলো নয় বরং মানুষের অন্তর্লোকের প্রতীক—অন্ধকারের বিপ্রতীপে জিজ্ঞাসা ও জাগরণের কেন্দ্র।

মাল্ম উষ্ণ কমলার ওপরে গাঢ় বাদামি স্তর বসিয়ে যে আবহ রচনা করেছেন, তা রেনেসাঁ–পরবর্তী চিত্রকলার চিয়ারোস্কুরোর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এখানে নাটকীয় সংঘর্ষ নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে ধ্যানমগ্ন প্রশান্তি। নরম প্রান্তরেখা, তুলির দাগে কাপড়ের ভাঁজ ও আঙুল—সবই যেন ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে ভেসে উঠে, স্মৃতির মতো নিজেকে গড়ে তুলেছে। এই ধীর উদ্ভাসনের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের চিরন্তন টানাপোড়েন—অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথ।

নারীটির মুখ প্রায় পাশ ফেরানো তাই তিনি ব্যক্তি থেকে প্রতীকে সরে যান—যেনো মিথের আলোকবাহী চরিত্রগুলোর  আধুনিক অনুরণন। মাথার ফুলের মুকুট ও ভেসে থাকা পোশাক তাঁকে একই সঙ্গে বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতার মাঝামাঝি স্থির করে। তিনি যেন পৃথিবীরও অংশ, আবার আকাশেরও। এই দ্বৈত উপস্থিতিই প্রতীকে আশ্রয় নেয়। কম্পোজিশনে দিগন্তরেখা নীচু, এখানে আকাশের প্রবল উষ্ণতা ক্যানভাস জুড়ে কর্তৃত্ব করলেও দর্শকের চোখ শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে হাতের শিখায়। এই ‘রিটার্ন অব গেজ’ আমাদের বলে দেয়—বিস্তৃতি যত বড়ই হোক, অর্থবাচকতা মানুষের হাতেগড়া। সূর্য ও নক্ষত্রের অনন্ত আলো সত্ত্বেও মানব ইতিহাসে ক্ষুদ্র প্রদীপ মুখ্য হয়ে ওঠে—কারণ প্রদীপের আলো মানুষ নিজেই ধরে রাখে।

এই চিত্রকর্ম দর্শনকে দৃশ্যমান করে তোলে। আমরা বুঝতে পারি—জ্ঞান মানে সবকিছু দেখা নয় বরং দেখা জিনিসের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা। ছোট্ট প্রদীপ সংযম ও পরিমিতির প্রতীক। আর নারীটি আমাদের ঠেলে দেয় সেই প্রশ্নের দিকে—নিজের ভেতরের আলো আমরা কত দূর নিয়ে যেতে পারি?

জীবনানন্দ যেমন রৌদ্র ও অন্ধকারের সম্পর্ক খুঁজেছেন তাঁর কবিতায়, সুফি কবি রুমি মনে করিয়ে দিয়েছেন—“The wound is the place where the Light enters you.” মাল্মের 'Bringing Light into Darkness' সেই উৎস থেকেই উৎসারিত।

সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ আলো খুঁজে এসেছে—আগুনের শিখা থেকে নক্ষত্রের রহস্য, সূর্যের স্থিতি থেকে আধ্যাত্মিক আলোকপ্রাপ্তি। প্রদীপ হাতে দাঁড়ানো নারীটি সেই দীর্ঘ যাত্রারই প্রতীক। তাঁর ক্ষুদ্র শিখা অন্ধকার নিয়েই এগিয়ে যায়।

যিশুশিষ্য ম্যাথিউ বলেছিলেন—"But the wise took oil in their vessels with their lamps." প্রজ্ঞাবানরা তাঁদের প্রদীপে তেল ভরে রাখেন, যাতে আলো নিভে না যায়। মাল্মের নারী সেই প্রজ্ঞারই প্রতিরূপ—তিনি মনে করিয়ে দেন, আলো বহন করতে হলে ভেতর থেকে প্রস্তুত থাকতে হয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers