শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিল্প-সংস্কৃতি

গানের পাখি উড়ে গেল দূরের কোন গাঁয়ে

মাঈনুদ্দীন দুলাল ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১৮:৫৮:৩১

398
  • গানের পাখি উড়ে গেল দূরের কোন গাঁয়ে

আমাদের এই পলল ভূমিতে কোকিল, দোয়েল, শ্যামা, বুলবুলি আরও কত কত গানের পাখি আছে। তেমনি আরও একটি পাখি ছিল। নাম তার ফরিদা পারভীন। ৫৫ বছর গান শুনিয়ে এই পাখি চলে গেল অচিন কোন গাঁয়ে। শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে তিনি বিদায় জানালেন। তাঁর সময় হয়েছিল প্রস্থানের।

স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে পাড়ায় মাইক লাগিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো বাজাতাম। বাজত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ফরিদা পারভীনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান “এই পদ্মা এই মেঘনা যমুনা সুরমা নদী তটে....”

বার বার বাজত। এই গানটি যতবারই বাজত ততবারই এক চিনচিনে অনুভূতি বুকের ভেতর কিলবিল করত। এখনও এই গান সেই অনুভূতি আনে। ফরিদা পারভীনকে দেশ-বিদেশে বেশি চেনে লালনের গানের জন্য। এটা সত্যি, এক সময় লালনের গান  আঁকড়া,সাধুসঙ্গে বা প্রাজ্ঞ প্রান্তিকজনের কণ্ঠেই ঘর বেঁধে ছিল। ফরিদা পারভীন সেই প্রান্তজনের সাধন সঙ্গীতকে নিয়ে এলেন শহুরে নাগরিকদের জলসায়। এমনকি লালন এলো শহরের অতিথি ঘর, শোবার ঘর, আড্ডায়।

অভিযোগ ছিল তিনি লালনের গানের সুরের আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা বিসর্জন দিয়েছেন। দ্রুত তাল ও লয় সংযুক্ত করেছেন। যেখানে বাণীপ্রধান গানগুলো স্বকীয়তা হারিয়েছে। তিনি বলতেন কিছু কিছু লালন সঙ্গীত তাল দাবি করে। বাউলের হাতে একতারা, খোল, খমক এসব ছিল প্রধান বাদ্যযন্ত্র। তিনি কিছুটা ভিন্ন  গায়কী এনেছেন বানীর মর্মার্থ যথাযথ রেখে। এতসব বিতর্কেরও পরও বলি লালনের গান এখন পহেলা বৈশাখের মঞ্চে, পাঁচ তারা হোটেলের লবিতেও শোনা  যায়। সাধারণ মানুষের দরবারে লালন বসেছে শ্বেতবসন গায়ে। 

যদি ফরিদা পারভীন লালনের গান নাও গাইতেন যদি তার গাওয়া, “এই পদ্মা এই মেঘনা, তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকাদির নাম, নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে... আরো কিছু আধুনিক গানের জন্য অনেক কাল তিনি সঙ্গীত প্রেমীদের প্রিয় থাকতেন।

১৯৫৪ সালে ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেন তিনি।  ফরিদা পারভীন গানে গানে কাটিয়েছেন ৫৫ বছর। ১৪ বছর বয়সেই তিনি ১৯৬৮ সাল থেকে  পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করেন। এরপর পার হতে হয় অনেক চড়াই-উতরাই। পারিবারিক সূত্রেই গানের ভুবনে আসা। গানের প্রতি বাবার টান ছিল বেশি। দাদিও গান করতেন। গান তার রক্তে ছিল। তিনি একটি কথোপকথনে বলেছেন, মায়ের স্তন পান করতে করতেই গান তার কান হয়ে প্রাণে ঢোকে। তিনি একটু বেশি বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ খেয়েছেন। সিনেমা প্রেমী মা তার গুনগুন করে ঐ সময় গান করতেন। মায়ের গানের গলাও ছিল ভালো। ঐ যে গান তার বুকে বাসা বাঁধল।

শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়েজিত ছিলেন। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও বহু দেশে লালনসংগীত পরিবেশন করেছেন। লালনসংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন।

আরো কিছু দিন তার গান শোনার আনন্দ পেতে পারতাম আমরা। ৭১ বছর খুব বেশি বয়স না। চলে গেল পাখি খাঁচা ভেঙ্গে।

“কিছু মৃত্যু পাখির পালকের মতো ভেসে বেড়ায়।”

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers