শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৯ শাওয়াল ১৪৪৭

শিল্প-সংস্কৃতি

চলচ্চিত্রে কবি নজরুল

নিউজজি প্রতিবেদক  ২৭ আগস্ট, ২০২৫, ১৪:৫২:২১

232
  • চলচ্চিত্রে কবি নজরুল

স্বর্গের সংবাদবাহক এবং দেবর্ষি নারদের কথা ভাবলে চোখে ভেসে ওঠে জটাধারী, দীর্ঘ শ্মশ্রূমণ্ডিত বৃদ্ধ একজনের চেহারা। সেই ইমেজ সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে দেখা গেল এক সুদর্শন যুবককে। চুড়ো করে বাঁধা ঝাকড়া চুল, তাতে ফুলের মালা, ক্লিন শেভড, পরনে সিল্কের লম্বা কুর্তা, গলায় মালা, হাসি হাসি মুখ। চলচ্চিত্রের পর্দায় এভাবেই নারদরূপে আবির্ভূত হলেন নজরুল।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের গল্প ও উপন্যাস নিয়ে যেমন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তেমনি তিনি নিজেও সম্পৃক্ত ছিলেন অনেক চলচ্চিত্রের সঙ্গে। আর অসংখ্য চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে তার গান।

ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের শুরুতে নজরুল নিজের গাওয়া ও সুরারোপিত গানের জন্য বিপুল খ্যাতির অধিকারী ছিলেন। সে সময় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা, যে শিল্পীরা সিনেমায় গাইবেন তাদের গান শেখানো এবং যে অভিনেতা ও শিল্পী অভিনয় করবেন ও গাইবেন তাদের শুদ্ধ উচ্চারণ শেখানোর দায়িত্ব পালন করেছেন নজরুল।

শুধু তাই নয়, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের নাম ‘ধূপছায়া’। ‘ধূপছায়া’ তে দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি।

ত্রিশের দশকে নজরুল পার্শি মালিকানাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সের ‘সুর ভাণ্ডারী’ পদে নিযুক্ত হন। এই পদটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সিনেমায় যারা গাইবেন ও অভিনয় করবেন তাদের গান শেখানো ও উচ্চারণ শুদ্ধ করার দায়িত্ব ছিল তার। শুধু তাই নয়, গান লেখা ও সুর করারও দায়িত্ব পালন করতে হত। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’তে সুর ভান্ডারীর কাজ করেন নজরুল। ম্যাডান থিয়েটার্স কোম্পানির আরও যেসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুল সম্পৃক্ত ছিলেন সেগুলো হল, ‘জ্যোৎস্নার রাত’ (১৯৩১), ‘প্রহল্লাদ’ (১৯৩১), ‘ঋষির প্রেম’ (১৯৩১), ‘বিষ্ণুমায়া’ (১৯৩২), ‘চিরকুমারী’ (১৯৩২), ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৯৩২), ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’ (১৯৩২), ‘রাধাকৃষ্ণ’ (১৯৩৩) এবং ‘জয়দেব’ (১৯৩৩)।

১৯৩১ সালে বাংলা সবাক চিত্র ‘জলসা’য় নজরুল নিজের একটি গান গেয়েছিলেন এবং ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। ম্যাডান থিয়েটার্সের একজন অংশীদার ছিলেন মিসেস পিরোজ ম্যাডান। তিনি ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ধ্রুব’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। পুরাণের কাহিনি নিয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মিত হয়। নজরুল এ সিনেমার গান লেখেন এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তিনি দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং একটি গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ মুক্তি পায়।

নারদ চরিত্রে নজরুলের সাজসজ্জা নিয়ে পত্রিকায় সমালোচনা হলে নজরুল তার জবাব দেন। তিনি বলেন, আমি চিরতরুণ ও চির সুন্দর নারদের রূপই দেবার চেষ্টা করেছি।

ম্যাডান থিয়েটার্স বিভিন্নভাবে নজরুলের প্রাপ্য সম্মানী নিয়ে প্রতারণা করায় ১৯৩৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন তিনি। এরপর নজরুল বিভিন্ন সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা ও গান লেখার কাজে জড়িত হয়ে পড়েন।

১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা করেন নজরুল। তিনি এবং পরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এ সিনেমার গীতিকার। ‘পাতালপুরী’ সিনেমাটি কয়লাখনির শ্রমিক ও সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবন সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এ সিনেমার জন্য ‘ঝুমুর’ সুরে গান রচনা করেন নজরুল। তিনি কয়লাখনি অঞ্চল সম্পর্কে জানার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গৃহদাহ’ সিনেমার সুরকার ছিলেন নজরুল। এ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।

১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় রহস্য কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গ্রহের ফের’। এ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন নজরুল।

১৯৩৭ সালের সেরা সিনেমা ছিল ‘বিদ্যাপতি’। কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এ সিনেমার মূল গল্প ছিল নজরুলের। যদিও চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় ছিলেন দেবকী বসু। সিনেমাটির সুরকার ছিলেন নজরুল ও রাইচাঁদ বড়াল।

মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির বিভিন্ন  কবিতায় নজরুলের সুর দানের কাজ ছিল অসাধারণ। বাংলা ‘বিদ্যাপতি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতে নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। সে সিনেমাও ব্যবসাসফল হয়। এ সিনেমার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন নজরুল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘গোরা’। সিনেমাটির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। বিশ্বভারতী আপত্তি করে যে সিনেমাটিতে সঠিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে না। নজরুল তখন সোজা চলে যান কবিগুরুর কাছে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে সমর্থন করেন এবং বিশ্বভারতীর সমালোচনা করে বলেন, আমার গান কীভাবে গাইতে হবে সেটা কি তোমার চেয়ে ওরা ভালো বুঝবে?

তিনি নজরুলকে তার গান নিজের খুশি মতো গাইবার ও ব্যবহারের অনুমতিপত্র দিয়ে দেন। নজরুল সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি নিজের লেখা একটি গান এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ব্যবহার করেন। গোরাতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার হয়েছিল নজরুলের নিজস্ব শৈলীতে, যা প্রশংসিত হয়েছিল শ্রোতাদের মাঝে।

সে সময় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাল বাংলা’ নামে আরেকটি সিনেমার গানেও সুর করেছিরেন নজরুল। হালবাংলা সিনেমায় কৌতুকময় একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি।

১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। এর কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। পরিচালক দেবকী বসু। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক এ সিনেমাটি দারুণ ব্যবসাসফল হয়েছিল। বেদে জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরুল বেশ কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গে ছিলেন। ‘সাপেড়া’ নামে সিনেমাটির হিন্দি রিমেকও হয়েছিল। তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন নজরুল। ‘রজত জয়ন্তী’(১৯৩৯), ‘নন্দিনী’ (১৯৪১), ‘অভিনয়’ (১৯৪১), ‘দিকশূল’(১৯৪১) ইত্যাদি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গান লিখেছিলেন নজরুল। তার গানগুলো সে সময় লোকের মুখে মুখে ফিরত।

১৯৪১-৪২ সালে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। এ সিনেমার জন্য তিনি ১৫টি গান লেখেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনেমাটি আর মুক্তি পায়নি।

‘চৌরঙ্গী’ (১৯৪২) সিনেমার গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ সিনেমার গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলে সে সিনেমার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন নজরুল।

১৯৪১ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন, আজিজুল হক প্রমুখ।

১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর বাকরুদ্ধ ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তার মৃত্যু হয়। নজরুলের অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তার গান ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় তার ও উত্তরাধিকারীদের অনুমতির তোয়াক্কাও করা হয়নি। তবে অধিকাংশ সিনেমাতেই নজরুলসঙ্গীতের ব্যবহার দর্শকপ্রিয় হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ গানটির উল্লেখ করা যায়। নজরুলসঙ্গীত অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল সেখানে। একইভাবে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির ব্যবহার ছিল অসাধারণ। ‘লায়লা-মজনু’ সিনেমায় ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো’ গানটির সার্থক ব্যবহার দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এমন বহু উদাহরণ দেয়া যাবে।

পরবর্তীকালে নজরুলের গল্প ও উপন্যাস নিয়ে প্রচুর টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আশির দশকে ধারাবাহিক নাটক হয়েছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস অবলম্বনে। এতে মেজবউ চরিত্রে অভিনয় করেন রোকেয়া রফিক বেবী।

নজরুলের ‘মেহের নেগার’ গল্প অবলম্বনে ২০০৬ সালে একটি সিনেমা নির্মিত হয়। সিনেমাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান গুলজার ও মৌসুমী। চলচ্চিত্রে প্রধান দুই চরিত্র কাশ্মীরের তরুণী মেহের নেগারের চরিত্রে মৌসুমী এবং আফগান যুবক ইউসুফের ভূমিকায় ফেরদৌস অভিনয় করেন। সিনেমাটি প্রযোজনা করে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের আরেকটি সিনেমা নির্মিত হয় নজরুলের গল্প ‘রাক্ষুসী’ অবলম্বনে। ‘রাক্ষুসী’ সিনেমার পরিচালক মতিন রহমান। তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস।

এর আগে নজরুলের গল্প ‘জ্বিনের বাদশাহ’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন বাপ্পা রাজ। নজরুলের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ও ‘পদ্মগোখরা’অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

তার দুটি কবিতা ‘লিচুচোর’  এবং ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’অবলম্বনে শিশুদের জন্য দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে। কবি নজরুলের জীবনীভিত্তিক কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থায়নে ১৯৫৬-৫৭ সালে নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম’। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি’। ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮০-৮১ সালে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কবি নজরুল’। বিবিসি টিভি চ্যানেল ফোর থেকে নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। কানাডার চলচ্চিত্র পরিচালক ফিলিপ স্পারেল নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘নজরুল’।

অসাম্প্রদায়িক বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলামের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিয়ে নির্মিত হতে পারে শিল্পসার্থক চলচ্চিত্র। হয়ত আগামীতে কোনো প্রতিভাবান পরিচালক নজরুলের জীবনের ভিত্তিতে রূপালি পর্দায় সৃষ্টি করবেন অসাধারণ কোনো শিল্পকর্ম।

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers