বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ , ৮ শাওয়াল ১৪৪৫

শিল্প-সংস্কৃতি

মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা

নিউজজি ডেস্ক ২৬ মার্চ, ২০২৪, ০১:৫৩:৩৫

95
  • মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা

মহান মুক্তিযুদ্ধের দ্বাদশ সেক্টর বলে পরিচিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। কলকাতার বালিগঞ্জ স্ট্রিটের ৫৮ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত বেতার কেন্দ্রটি মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে প্রতিরোধ আর প্রতিশোধের স্পৃহা যুগিয়েছে রণাঙ্গনের মুক্তিসেনাদের। বলা চলে, মহান মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেশি বেগবান করতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অপরিসীম।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সক্রিয় হয়েছিল বিপ্লবী স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্র থেকে শুধু পাকিস্তানী স্বৈর শাসকের চ্যলেঞ্জই গ্রহণ করেনি, সাড়ে ৭ কোটি বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের সমর্থন এবং সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক নাম ঘোষণা এক মুহূর্তে ধসিয়ে দিয়েছিল দাম্ভিক ইয়াহিয়ার প্রতিরোধহীন বিজয় দর্পকে। এই বেতার কেন্দ্র, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং শোকাভিভূত লাখো বাঙ্গালীর মনে সঞ্চার করেছিল আশার আলো। এই বেতার কেন্দ্রের প্রথম অনুষ্ঠান শুনা মাত্র বহু বাঙালি অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। সে অশ্রু ছিল আনন্দের, স্বস্তির, গৌরবের। বাঙ্গালী আবার উঠে দাঁড়ালো গভীর আত্মবিশ্বাসে। বীর বঙ্গশার্দুলগণ পেলেন শত্রুর ওপর আঘাত হানার নতুন প্রেরণা। 

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মতো আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি বাহিনীকে পরাজিত করার পেছনে গেরিলা পদ্ধতির পাশাপাশি বড় সহায়ক শক্তি ছিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। অব্যাহত গণহত্যার মুখে জনমানুষকে প্রতিরোধের মন্ত্রে একতাবদ্ধ করতে এবং বিশ্ব জনমত গড়তে অবিনশ্বর অবদান রেখেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধারা।

১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এল নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী। এই বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমেই পৃথিবীর জাতিসমূহের কাছে জানানো হয়েছিল বাংলাদেশের প্রতি তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি এবং সহযোগিতা দানের আহ্বান। 

এ বিষয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা সুজেয় শ্যাম বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় কালজয়ী গানগুলো গেয়ে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সমগ্র জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে আমাদের ঠিকানা জানতেন, সেটা আমরা জানতাম না। তারা প্রায়ই আমাদের চিঠি দিতেন। তারা আমাদের আরও গান করে, তাদের অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য বলতেন।'

তিনি আরো বলেন, 'যুদ্ধের ওই ৯টি মাস আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। কিন্তু ৭৫-এর পর সব কিছু কেমন যেন উলট পালট হয়ে গেছে। রাজাকাররা এখনও এক হয়ে সক্রিয় আছে, কিন্তু আমরা কেন এতোভাগে ভাগ হয়ে গেলাম।'

জানা গেছে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশন সংকেত হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। নির্দিষ্ট গান সম্প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে শত্রুঘাঁটিতে গেরিলাবাহিনী হামলা চালাতো। এমনিভাবে চেতনাদীপ্ত গানে গানে  উজ্জীবিত করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা মুক্তিযোদ্ধাসহ সমগ্র জাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছিল। 

আগুন ঝরানো মুক্তির গানে গানে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অসহায় বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন জ্বালিয়েছিল আশার মশাল। শুধু গানই নয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল চরমপত্র পাঠ। যা সেই দুঃসময়েও হাসির খোরাক জোগানোর পাশাপাশি ধিক্‌ এবং উদ্দীপনা দিয়েছে প্রতিটি বাঙালিকে। এক কথায়, মহান স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তথা এর শিল্পী-কলাকুশলীদের অবদান অবিস্মরণীয়। 

কণ্ঠযোদ্ধা তিমির নন্দী বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এবং বাঙালিদেরকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান যেভাবে উজ্জীবিত করতো পৃথিবীর কোন দেশের ইতিহাসে এমনটা নেই। আমাদের গানগুলো ছিলো বুলেটের মত, অস্ত্রের মত। গানের মাধ্যমে যোদ্ধারা অনেক কৌশলও অবলম্বন করতেন, যেমন কোন একটা গান সম্প্রচার করা হলে শত্রুঘাঁটি আক্রমণ করা হবে বা কোন ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া হবে।'

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা বুলবুল মহলানবীশ বলেন, 'গণ মানুষের চেতনার জায়গায় আমরা এসব গানের মাধ্যমে আঘাত করতে পেরেছি। তারা বুঝতে পেরেছে যে দেশকে পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। এই কাজটা আমরা খুব সফলভাবে করতে পেরেছি।' স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও কণ্ঠযোদ্ধাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর- বিজয়ের ঐতিহাসিক সেই দিনটির কথা।

প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংগঠিত হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বেতারের দশজন নিবেদিত কর্মী (দুজন বেতার কর্মী ছিলেন না), স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনগণ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতায়। এই বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের দশজন সার্বক্ষণিক সংগঠক ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ (উক্ত বেতারের নিজস্ব শিল্পী), আবুল কাশেম সন্দ্বীপ (ফটিকছড়ি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল), সৈয়দ আব্দুস শাকের (চট্টগ্রাম বেতার প্রকৌশলী), আব্দুল্লাহ আল ফারুক (অনুষ্ঠান প্রযোজক), মোস্তফা আনোয়ার (অনুষ্ঠান প্রযোজক), রাশেদুল হোসেন (টেকনিক্যাল এসিসট্যান্ট), আমিনুর রহমান (টেকনিক্যাল অপারেটর), রেজাউল করিম চৌধুরী (টেকনিক্যাল অপারেটর) এবং কাজী হাবিবুদ্দিন (বেতার কর্মী ছিলেন না)।

বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ; এই বেতার কেন্দ্রের প্রথম অধিবেশন সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন আবুল কাশেম সন্দীপ, স্থানীয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাক্তার মনজুলা আনোয়ার, ডাক্তার সৈয়দ আনোয়ার আলী, ইঞ্জিনিয়ার আশিকুল ইসলাম, দিলীপ চন্দ্র দাশ, কাজী হোসনে আরা প্রমুখ। কিন্তু শেষোক্ত চারজন প্রথম সন্ধ্যার ঐতিহাসিক অধিবেশন শেষে কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ছেড়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। উল্লেখ্য যে, উদ্বোধনী অধিবেশনের সময় কাজী হোসেনে আরা কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবস্থান গোপন রাখার জন্য নিরাপত্তাজনিত কারণে কণ্ঠ দিতে পারেননি। 

বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সার্বক্ষণিক প্রথম দশজন সংগঠন কর্মীকে প্রত্যক্ষভাবে আরো যারা সহযোগিতা প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ শফি (শহীদ), মুশতারী শফি, মীর্জা নাসির উদ্দিন (চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী), সুলতান আলী (বার্তা সম্পাদক), আব্দুস সোবহান (বেতার প্রকৌশলী), দেলোয়ার হোসেন (বেতার প্রকৌশলী), মাহমুদ হোসেন (শহীদ), আব্দুস শুকুর, সেকান্দার হায়াত খান, মোসলেম খান প্রমুখ। এছাড়া যাদের পরোক্ষ সমর্থন এই বেতার সংগঠনে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম বেতারের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক আব্দুল কাহহারের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখযোগ্য। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচার বাধাহীনভাবে এগোতে পারেনি। প্রচণ্ড বাধা এসেছিল মাত্র চারদিনের মধ্যে। শত্রুর বোমারু বিমান থেকে ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে বোমা ফেলা হয়। উপায়ান্তর না দেখে বাংলাদেশের বীর শব্দ সৈনিকগণ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সহায়তায় একটি ক্ষুদ্র ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার বয়ে নিয়ে আসেন মুক্তাঞ্চলে। এই ট্রান্সমিটারের সাহায্যে বিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল আরো কিছুদিন।

মুজিব নগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধের প্রচার জোরদার করার উদ্দেশ্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে নতুন করে সংগঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয় আব্দুল মান্নান এম.এন.এ’র ওপর। মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৩৭৮ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ইংরেজি ১৯৭১ সালের ২৫ মে ছিল রোজ মঙ্গলবার। এইদিন ঠিক সকাল ৭টায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার আকাশে ইথার তরঙ্গে ভেসে এলো এক নতুন বেতার কেন্দ্রের সঙ্কেত ধ্বনি। যন্ত্রসঙ্গীতে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। 

প্রথম অনুষ্ঠানে আরো যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা হলেন - উদ্বোধনী ও অনুষ্ঠান সম্পর্কিত ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধুর বাণী থেকে পাঠ : আশফাকুর রহমান খান (বেতার কর্মী)। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত : মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী (সাংবাদিক)। বাংলা খবর গ্রন্থনা : কামাল লোহানী (সাংবাদিক)। বাংলা খবর পাঠ : সৈয়দ হাসান ইমাম (অভিনেতা)। ইংরেজি সংবাদ গ্রন্থনা : আলী যাকের (নাট্যকর্মী ও অভিনেতা), একে জালাল উদ্দিন (সাংবাদিক)। ইংরেজি সংবাদ পাঠ : মিসেস টি হোসেন (গৃহবধূ)। চরমপত্র রচনা ও পাঠ : এম.আর. আখতার মুকুল (সাংবাদিক ও প্রবন্ধকার)। জাগরণী গানের অনুষ্ঠান : তাহের সুলতান (বেতার কর্মী), টি এইচ সিকদার (বেতার কর্মী)। পূর্ণ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে শুরু হয়েছিল এই বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজ পরিচালিত হতো ছোট একটি দ্বিতল বাড়িতে। অনুষ্ঠান বাণীবদ্ধ করার জন্য স্টুডিও ছিল মাত্র একটি। পরে আরো একটি কক্ষ খালি করে অনুষ্ঠান রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা হয়েছিল। তবে এগুলোতে পেশাগত স্টুডিওর ন্যায় কোনও শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না প্রয়োজনীয় বাদ্য যন্ত্র ও যন্ত্রী। অবশ্য পরবর্তীকালে বাদ্যযন্ত্রের আংশিক অভাব পূরণ হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্তরা ড্রাম, সাইড ড্রাম, গীটার, করনেট ইত্যাদি যন্ত্রপাতি খরিদ করে নিয়েছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের বাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। ওখানেই তারা খাওয়া-দাওয়া করতেন। সারাদিন এবং গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে ঐ বাড়ির খোলা মেঝেতেই চাদর পেতে শুয়ে পড়তেন। সীমিত কয়েকজন লেখক, কথক এবং শিল্পী নিয়ে শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে সাথে জড়িত ছিলেন, তাঁরাও মুক্তিযুদ্ধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন