শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ , ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি

বারী সিদ্দিকী: বাঁশি আর হৃদয়স্পর্শী সুরের অনন্য কারিগর

নিউজজি প্রতিবেদক ২৪ নভেম্বর, ২০২১, ১০:৫৭:১৮

69
  • বারী সিদ্দিকী: বাঁশি আর হৃদয়স্পর্শী সুরের অনন্য কারিগর

তিনি গাইতেন সরল ভাষায়, সরল সুরে। কিন্তু কী এক অদ্ভুত জাদু ছিল সেই সুরে, সেই কথায়। গান যেন গান নয়, মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হতো। তিনি বাঁশি বাজাতেন। সে বাঁশির সুর হৃদয়ের দেয়াল ভেদ করে চলে যেতো গহীন থেকে গহীনতর অনুভবের দেশে। শিহরণ জাগিয়ে তুলতো মনের ভেতর। 

তিনি সেই গানের পাখি, যিনি বাংলার প্রতি প্রান্তরে পৌঁছে দিয়েছেন- ‘শুয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি...’। তিনি বারী সিদ্দিকী। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে যাওয়া অনন্য শিল্পী তিনি। বাঁশি আর হৃদয়স্পর্শী সুরের অনন্য কারিগর।

খ্যাতিমান এই শিল্পীর চলে যাওয়ার দিন আজ। ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর দেশের লোকসঙ্গীতে অসামান্য এক শূন্যতা তৈরি করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বারী সিদ্দিকী। আজ তার প্রয়াণের চার বছর পূর্ণ হলো।

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনার একটি সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বারী সিদ্দিকী। শৈশব থেকেই গানের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বরেণ্য ওস্তাদের কাছেও তিনি সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন।

বারী সিদ্দিকীর বাঁশির সুরে মন হারাননি, এমন শ্রোতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ১৯৮০ সাল থেকে টানা দুই দশক তিনি বাঁশি বাজিয়ে জয় করেছেন বিশ্ব। বারী সিদ্দিকীর বাঁশির সুরে কেঁদেছেন অগণিত মানুষ। প্রাকৃতিক এই বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তিনি যে বিষাদময় হাহাকার সৃষ্টি করতেন, সেটা মানুষের কান হয়ে পৌঁছে যেতো হৃদপিণ্ডের অতলে। আর সেখানে তৈরি হয়ে যেতো অপার সুন্দর এক অনুভব।

ছোটবেলায় মায়ের অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতায় বাঁশিতে হাতেখড়ি হয় বারী সিদ্দিকীর। কিন্তু সেই সময় নেত্রকোণায় বাঁশি শেখার কোনও পদ্ধতিগত ব্যবস্থা ছিলো না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ হয় যখন বারী সিদ্দিকী হাইস্কুলে পড়তেন। নেত্রকোণা শিল্পকলা একাডেমিতে ওস্তাদ শ্রী গোপাল দত্তের কাছ থেকে বাঁশি শিখতে শুরু করেন তিনি। এরপর বারী সিদ্দিকী ওস্তাদ তাগাল ব্রাদার্স, পণ্ডিত দেবেন্দ্র মুৎসুদ্দী, ওস্তাদ আয়েফ আলী খান মিনকারীর মতো গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ থেক একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বারী সিদ্দিকী অংশ নেন। সেই সম্মেলনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই বাঁশি বাজান বারী। তাও একটানা ৪৫ মিনিট। তার বাঁশিতে মুগ্ধ হয় বিশ্ব শ্রোতারা। বারী সিদ্দিকী পান উপমহাদেশ জোড়া খ্যাতি। এরপর থেকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে বংশী বাদক হিসবে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছান বারী।

ছোটবেলা থেকে গানের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গায়ক হিসেবে বারী সিদ্দিকী পরিচিতি পান নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে। তার ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় গান করেই দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা পান বারী। চলচ্চিত্রের গান দিয়ে জনপ্রিয়তার পাওয়ার পর বারী সিদ্দিকীর দুটি একক অ্যালবাম প্রকাশ হয়। ‘দুঃখ রইলো মনে’ এবং ‘অপরাধী হইলেও আমি তোর’ শীর্ষক অ্যালবাম দুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে লোকজ সুরের গানগুলো সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়।

তারপর থেকে লোক ও আধ্যাত্মিক গানের অন্যতম শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন বারী সিদ্দিকী। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় সম্মানের সঙ্গে তিনি অংশ নিতে থাকেন। একাধিক প্রজন্মের শিল্পী তার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লোকজ ঘরানার গানে আসেন। বারী সিদ্দিকীর প্রকাশিত অন্যান্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘সরলা’, ‘ভাবের দেশে চলো’, ‘সাদা রুমাল’, ‘মাটির মালিকানা’, ‘মাটির দেহ’, ‘মনে বড় জ্বালা’, ‘প্রেমের উৎসব’, ‘ভালোবাসার বসত বাড়ি’, ‘নিলুয়া বাতাস’ ও ‘দুঃখ দিলে দুঃখ পাবি’।

মূলত বিরহ-বিচ্ছেদ আর মরমী সুর উঠে আসে বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে। তার গাওয়া ‘শুয়া চান পাখি’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’, ‘রজনী’, ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’, ‘পুবালি বাতাসে’, মানুষ ধরো মানুষ ভজো’ ও ‘আমার মন্দ স্বভাব জেনেও’ গানগুলো বাংলা সঙ্গীতকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বারী সিদ্দিকীর ‘প্রবাস প্রজন্ম জাপান সম্মাননা’ উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। অথচ খ্যাতিমান এই সঙ্গীত সাধক দেশের বড় সব সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, তেমন কোনও সম্মাননায় তাকে ভূষিত করা হয়নি। তবে সম্মাননা কিংবা পুরস্কারে নয়, বারী সিদ্দিকী অমর হয়ে থাকবেন তার সৃষ্ট গানে আর বাঁশির সুরে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাবে বারী সিদ্দিকীর সুর। চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি সঙ্গীত ভুবনে।

নিউজজি/রুআ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন