রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮ , ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি

ওবায়েদ উল হক একজন বহুমাত্রিক প্রতিভা

নিউজজি ডেস্ক ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৫:৫৮

100
  • ওবায়েদ উল হক একজন বহুমাত্রিক প্রতিভা

ঢাকা : আলোকিত মানুষরা অনেক গুণ ও পরিচয়ের অধিকারী হয়ে থাকেন। বহুমাত্রিক প্রতিভায় নানা ক্ষেত্রে তারা স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন; যুগ যুগ পেরিয়ে শতাব্দীকালও তারা অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে মহীয়ান থাকেন। তেমনি আলোকিত মানুষদেরই একজন ওবায়েদ উল হক।

একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার ও নাট্যকার ওবায়েদ উল হকের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৭ সালের ১৩ই অক্টোবর তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ওবায়েদ উল হক পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। 

তার মত এমন সৎ, বিচক্ষণ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্রকার কালে কালে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। খ্যাতিমান সাংবাদিক হিসেবে আদর্শ, সততা, দেশপ্রেম, সচেতন প্রত্যয় এবং পর্বত প্রমাণ ব্যক্তিত্বের এক উজ্জ্বল জীবনচিত্র তার। একইভাবে তিনি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

ওবায়েদ উল হক ছিলেন আমাদের দেশের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। একাধারে তিনি একজন লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, সুরকার, গীতিকার। তিনি দীর্ঘকাল ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভার-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯১১ সালে ফেনীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ওবায়েদ উল হক জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বজলুল হক খান ছিলেন ফেনীর আইনজীবী ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। তার মায়ের নাম আঞ্জুমান নেসা। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার ঝোঁক ছিল প্রবল। বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। তখন তিনি সাহিত্যে প্রচুর বই পড়তেন। প্রথম কবিতা সওগাত পত্রিকায় ছাপা হয় মাত্র ১০ বছর বয়স। এরপর বিভিন্ন ম্যাগাজিন এবং লিটল ম্যাগে নিয়মিত তার কবিতা ছাপা হতে থাকে। 

১৯৩৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শন ও মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন কোর্স সম্পন্ন করেন। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে ওবায়েদ উল হক সার্কেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরে তিনি কুমিল্লায় ঋণ সালিশি বোর্ড-এর সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার বিরোধ হওয়ায় তিনি ১৯৪৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখিতে মনোযোগী হন।

গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, রম্যরচনা সহ তার অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়মিত সওগাত (১৯১৮) মোহাম্মদী (১৯১০) বুলবুল, ছায়াবীথি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্বৎসমাজে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। সাহিত্য ছাড়াও চলচ্চিত্রের প্রতি তার প্রবল স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল। 

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ তার মনোভাবনাকে চরমভাবে নাড়া দেয়। যার ফলে মননশীলতার বিদগ্ধ অনুভবে তিনি লিখলেন জীবনের সর্বপ্রথম গল্পগাথার এক করুণ আলেখ্য ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’। কোনো বাঙালি মুসলমান কর্তৃক রচিত তার প্রথম ছবি হিসেবে ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ ১৯৪৬ সালে বাংলা, বিহার, আসাম এবং বার্মায় মুক্তি পায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য ওবায়েদ উল হক ‘হিমাদ্রি চৌধুরী’ নাম গ্রহণ করেন।

১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতা ছেড়ে ফেনীতে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে দি পাকিস্তান অবজারভার প্রকাশিত হয় এবং ওবায়েদ-উল হক পত্রিকাটিতে নিয়মিত কলাম লেখেন। ১৯৫১ সালে তিনি এ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। সাংবাদিকতার এ পর্যায়ে এ পত্রিকার তিনি উপসম্পাদক (১৯৫৮-১৯৬২), যুগ্ম-সম্পাদক (১৯৬২-১৯৭১) এবং স্বাধীনতাত্তোর পর্বে এ পত্রিকার সম্পাদক হন। 

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে প্রথমে এ পত্রিকার নামকরণ হয় ‘দি অবজারভার’, পরে হয় ‘দি বাংলাদেশ অবজারভার’। ১৯৮৪ সালে এ পত্রিকার নাম পরিবর্তন বিষয়ে বিতর্কের সূচনা হলে ওবায়েদ উল হক পদত্যাগ করেন এবং ১৯৮৬ সালে ডেইলি নিউজ-এর সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে এ পত্রিকার সম্পাদনা ছেড়ে দিয়ে তিনি দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস (১৯৭৪)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পঞ্চাশের দশকে তিনটি একাঙ্কিকা নাটক নিয়ে ‘দিগ্বিজয়ে চোরাবাজার’ নামে তার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। এরপর একই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয় আরেকটি বই ‘এই পার্কে’। দুটি বইই পাঠকমহলে বেশ প্রশংসিত হয়। এছাড়াও তার রচিত নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ‘ব্যতিক্রম’, ‘রুগ্না পৃথিবী’ (১৯৬৮), ‘যুগসন্ধি’ ও ‘সমাচার এই’।

কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘দ্বিধার ফসল’, ‘সায়াহ্নের সংলাপ’, ‘গরীব হতে চাই’ ও ‘পথের পদাবলী’। ওবায়েদ উল হক রচিত উপন্যাস হচ্ছে- ‘সংগ্রাম’, ‘দ্বৈত সঙ্গীত’ ও ‘ঢল’ প্রভৃতি। তার এই সংগ্রাম উপন্যাস অবলম্বনে পাকিস্তান আমলে ঢাকায় ফজলুল হকের পরিচালনায় ‘আজান’ নামে একটি ছবি নির্মিত হয়। তার ইংরেজি গ্রন্থ ‘Voice of Thunder’ শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত। পরে এটি ‘A Leader with a Difference’ নামে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।

আজন্ম তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ সরকার যখন দেশে একটি প্রেস ইন্সটিটিউট করার চিন্তা করলো, তার আহ্বায়ক করা হয় ওবায়েদ উল হককে। তিনি পিআইবির (প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ) প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

 তিনি একাধারে ছিলেন এডিটরস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান, নজরুল ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। অর্ধশতাব্দির বেশি সময় ধরে তিনি জড়িয়ে রয়েছেন সাংবাদিকতায়। 

আজন্ম সৃজনকর্মে নিবেদিত থাকার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮১ সালে একুশে পদক, ১৯৮৩ সালে ইউনিসেফ স্বর্ণপদক, আব্দুস সালাম স্বর্ণ পদক, জহুর হোসেন চৌধুরী স্বর্ণ পদক, অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণ পদক, ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন