শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮ , ৯ সফর ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি

গানের পাখি মূলত আব্দুল আলীম

লুৎফর হাসান ২৭ জুলাই, ২০২১, ০০:৪৯:১৬

  • ফাইল ছবি

চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি। এরকম এক গানের সঙ্গে দুলছিল বিলের জলে মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রার্থনায় আমন ধানের গাছ। সবুজ সেই ধানেরা মিশে গিয়েছিল হেলেঞ্চা বিলের স্বচ্ছ কালো জলে। সে জল কি কালো ছিল? সেদিন তো তাইই ছিল। আকাশে মেঘের ছোটাছুটি আবার মেঘ ভেঙে রোদ। একপাশে রোদের মানচিত্র ভেঙে আবার কালো মেঘ। পুরোটার ছায়া এসে দোল খাচ্ছিল সবুজ ধানের উপর থইথই জলে। সেদিকে নাও ভাসিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম বড়দের সাথে। আমরা তখন ছোট। তবে ডিঙি বয়ে নিয়ে যাবার সাহস ও কৌশল রপ্ত করেছি। আর রপ্ত করেছিলাম অগণন গান। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা নিখাদ সব গান। কী যে ছিল সেইসব গানে। সেই উনিশশ আটাশি। বন্যার জল যখন থিতু হয়ে ভীষণ শান্ত হয়ে গেছে আমাদের নবগ্রাম অঞ্চলে। তখন আমরা দুপুর গড়াবার আগেই পূবের দিকে ডিঙি ভাসাতাম। নাসু কাকা কিংবা বাবলু মামা। আর তাদের বন্ধু সামাদ ভাই অথবা ইদ্রিস কাকা। এই তো মনে আছে। আর মনে আছে কোরাস সঙ্গীত। তারা আমাকে শিখিয়েছিলেন আব্দুল আলীমের গান। চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি।  

আব্দুল আলীমের গানে গানে আমাদের জলজ জীবন। বিস্তৃত বিলের সীমানায় দূরে অনেক দূরে যে নৌকা ছুটে যেতো অন্য গ্রামের দিকে, সেই নৌকায় কে বা কারা ছিল মনে নেই। তবে মাইকে আব্দুল আলীমের গান ছিল অবিরাম। ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা’ কিংবা ‘মেঘনার কুলে ঘর বাঁধিলাম’ আর বাজতো ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’। সেই যে কলিজা ছিঁড়ে ফেলা গানের টান, সেই দীর্ঘ দম নেয়া গান, টান চলতো যখন কেমন ঝিরিঝিরি জল আরও কেঁপে উঠতো। মাইকের সেই নৌকা মিলিয়ে যেতে হাওয়ায়, ছায়ায় কিংবা শূন্যতায়। সেই রেশ আমাদের ব্যাকুল করে দিতো। আমরা তখন ভেসে আসা কলমির গোলাপি ফুলের দিকে চেয়ে আছি। কেউ তখন গেয়ে উঠতো ‘আর কতকাল ভাসব আমি’। আমাদের ডিঙি নাও তখন হেলে পড়া বিকেলের সঙ্গী। ঘাটে যখন পৌঁছবে, এদিকে তখনও কেউ নেই। সকলেই গেছে হাটে, বাজারে গেছে সকলেই। এখন জিরিয়ে নেবার কালেও গুনগুন, সেই গুনগুনে কেমন হাহাকার ঝরে পড়ে ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি’। 

তখন উদাস দুপুরের বেলা। ইশকুল নেই। বাবা মায়ের শাসন নেই। দুরন্ত সেই জীবনে আমরা বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে চলা বানের ভয়ে উঠে গেছি বড় বাড়ির উঠোনে। উদ্বাস্তু বললে ভুল হবে না। তবে আস্ত জীবনের সেই আটকে থাকা সময়টাই সবচেয়ে সমৃদ্ধ স্মৃতি হয়ে আছে। খড়ের গম্বুজের আড়ালে ছালা বিছিয়ে গোল হয়ে আমরা বসে আছি। বড় এক ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতা জুড়ে গান। সেখানেও আব্দুল আলীম। ‘পরের জায়গা পরের জমিন’ ‘হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ’ ‘কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে’ ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না’ ‘ক্যান বা তারে সঁপে দিলাম’ ‘ এই যে দুনিয়া’ ‘দোল দোল দুলুনি’ আরও কত কত গান। 

মাগরিবের আযান ভেসে আসে উত্তর পাড়া হতে। এপাড়ার মসজিদ ডুবে আছে। উঠোনেই জায়নামাজ। নামাজের পর পর চাঁদের আলোয় ঝিকিমিকি পুঁথি পাঠের আসর। চলে বিষাদসিন্ধু, চলে কাশেম মালার প্রেম’। মুরুব্বীরা এগিয়ে এসে উঁকিঝুঁকি। আমরা তখন তাদের গান খুঁজি। গাইতে থাকি ‘আল্লাহু আল্লাহু’ ‘নবী মোর পরশমনি’ ‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়’। তাঁদের বয়সী চোখ বেয়ে জলের ধারা নামে। আব্দুল আলীমকে নিজেদের কাছে পুণ্যবান শিল্পী বলে মনে করেন। তাঁদের কান্না কান্না অনুভূতির সাথে সঙ্গী হয় মোনাজাত। উড়ে যায় দূর আকাশে। যেদিকে আরশের ঠিকানা। 

চলে যায় তিন দশক। কম তো নয়। কত শিল্পী আসেন, গান শোনান, তাদের অধ্যায় শেষ হয়ে যায়। কেউ কেউ কেউ টিকে থাকেন। কারো কারো গান চিরকালীন আবেদন নিয়ে জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। এখনও আঙুল গুনে হিসেব করলে দেখা যাবে মানুষের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে বেশি গানের সংখ্যায় শীর্ষে আছে আব্দুল আলীমের গান। আজ এই মহান শিল্পীর জন্মদিন। নিউজজির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাই। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers