রবিবার, ১ আগস্ট ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮ , ২১ জিলহজ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি

কাজী আনোয়ার হোসেন’র একুশে পদক পাওয়া উচিত

আব্দুন নূর তুষার, অতিথি লেখক ২১ জুলাই, ২০২১, ১৬:২৩:৪১

  • কাজী আনোয়ার হোসেন ও আব্দুন নূর তুষার। ছবি: ইন্টারনেট

আমি আর আমার ছোটভাই সারা বছর যত রকম ঈদ সালামি, টাকা উপহার পেতাম- সব জমিয়ে রাখতাম। পরীক্ষার শেষ দিকে সেই টাকা থেকে মাত্র ২০টাকা মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দিলে পরীক্ষার পর ছুটির শুরুতেই বাড়িতে এসে পৌঁছাতো সেবা প্রকাশনীর একগাদা বই। কখনো কখনো প্রায় ২ কিলো হেঁটে চলে যেতাম মীরপুর বড়বাজার সাব-পোষ্ট অফিসে, সেখান থেকে বাকি টাকা দিয়ে নিয়ে আসতাম ভিপিপি’তে আসা বইয়ের প্যাকেট। মুক্তধারা থেকেও বই আসতো। তবে সেবা প্রকাশনীর বই’ই বেশি। 

কুয়াশা, কিশোর ক্লাসিক, ওয়েস্টার্ন, ক্লাস নাইনে ওঠার পর মাসুদ রানা। আমার চেয়ে বারো বছরের ছোট একমাত্র বোন পড়তো তিন গোয়েন্দা। আমার সেই বোন এখন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার, ভাই আর্কিটেক্ট। দু’জনেই বুয়েটে পড়েছে , শিক্ষকতাও করেছে। আমিই সবচেয়ে অসফল মানুষ।

ইসরাইল নামে একজন ব্যক্তির ছাপানো একটা চিঠি থাকতো বইয়ের সাথে। তিনি সেবা প্রকাশনীর ম্যানেজার। রহস্য পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর সেটাও প্রতি মাসে হয়ে গেল আবশ্যিকপাঠ। 

শাহাদাত চৌধুরী-হাশেম খান প্রচ্ছদ করতেন বইগুলোর। কোলাজ করে বইয়ের রঙ্গিন প্রচ্ছদ সেবা প্রকাশনীই প্রথম শুরু করে। হুমায়ুন আহমেদ তার অভাবের দিনগুলোতে অনুবাদ করেছিলেন ‘দি এক্সরসিস্ট’। অমানুষ নামে অনুবাদ করেছিলেন ‘ম্যান অন ফায়ার’ বইটি, রহস্য পত্রিকার জন্য। অনুবাদ ভালো না লাগায়, কাজী আনোয়ার হোসেন সেটা নিজে আবার অনুবাদ করে, অগ্নিপুরুষ হিসেবে মাসুদ রানার একটি পর্ব বানিয়ে দেন।

সব মাসুদ রানা তিনি সরাসরি লেখেন নাই। কিছু লিখেছেন- শেখ আব্দুল হাকিম, শাহাদত চৌধুরী এবং অন্যরা। তিনি সম্পাদনা করতেন। এরা ছিলেন ঘোস্টরাইটার (নেপথ্যলেখক)। তার নামেই রানা প্রকাশিত হতো, এখনো হয়। প্রথম দুটো মাসুদ রানা মৌলিক। ধ্বংস পাহাড় ও ভারতনাট্যম। সুলতা সেন ও মিত্রা- দুটি বইতে দু’জন নায়িকা-ই- মারা যায়। কবীর চৌধুরী হলো মরিয়ার্টির মত মাসুদ রানার নেমেসিস। রানা তাকে বারবার পরাস্ত করে, সে বারবার ফিরে আসে। এরকম মৌলিক লেখা আরো আছে।

কাজী আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের প্রথম লেখক, যিনি নিজে কেবল লিখে ও বই প্রকাশ করে নিজের জীবিকা অর্জন করেছেন। মৌলিক লেখা লিখতে অনেক সময় লাগে। বইয়ের দাম এত কম যে, বছরে দুটো বই লিখলে টিকে থাকা যাবে না। একারনেই তিনি পরে ছায়া অবলম্বনে মাসুদ রানার বইগুলো লিখতে থাকেন। আয়ান ফ্লেমিং, অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হ্যাডলি চেজ, সিডনি শেলডন, রবার্ট লুডলাম’সহ আরো অনেক লেখকের বই তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় অনুসরণ করে তৈরী করছেন- বাঙ্গালির জীবনে ও বাংলা সাহিত্যে একমাত্র আধুনিক গুপ্তচর’র চরিত্র মাসুদ রানাকে।

সেবা প্রকাশনী তার সকল লেখককে রয়্যালটি দিয়েছে এবং এখনো দেয়। সেবা প্রকাশনী না থাকলে অসংখ্য বিদেশি ভাষার ক্লাসিক ঝরঝরে বাংলায় অনুবাদ হয়ে কিশোর তরুনদের হাতে পৌঁছাতো না।

বাংলা অ্যাকাডেমির চেয়ে ঢের বেশি অনুবাদ প্রকাশ করেছে সেবা প্রকাশনী। পশ্চিমবঙ্গের খটমটে অনুবাদ বুঝতে অভিধান লাগে। অথচ জুল ভার্নের সব বই, এরিখ মারিয়া রেমার্ক, হেনরী রাইডার হ্যাগার্ড, এরিখ সেগাল, ভিক্টর হুগো, এরিখ ফন দানিকেন, আলেক্সান্দার দুমা, এইচ জি ওয়েলস, রবার্ট লুই স্টিভেনসন, পচাব্দি গাজী, জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসন, চার্লস ডিকেন্স, শার্লোট ব্রন্টি, মার্ক টোয়েন, হ্যারিয়েট বিচার স্টো, হারম্যান মেরভিল জন স্টাইনব্যাক, এমনকি মহাজাতক শহীদ আল বোখারীর কোয়ান্টাম মেথডের বইও প্রকাশ করেছে সেবা প্রকাশনী্। 

মহাভারত, রামায়ন প্রকাশ করেছে সেবা। রবিনহুড, মবি ডিক। লেখার আধুনিক সম্পাদনার রীতি কেবল সেবা প্রকাশনী মেনে চলে। রিডার্স ডাইজেস্ট’র মত রহস্য পত্রিকা দেশের একমাত্র পেপারব্যাক বুকসাইজ মাসিক পত্রিকা।

কাজী আনোয়ার হোসেন নিজে অনুবাদক হিসেবে অসাধারণ। ছয় রোমাঞ্চ ও পঞ্চরোমাঞ্চ তার করা ১১টি বিদেশি গল্পের অনুবাদ।

কাজী আনোয়ার হোসেন চমৎকার গান গাইতে পারেন। সিনেমাতে প্লেব্যাক করেছেন। এই মানুষটির কারণে পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদা, ব্যোমকেশ বক্সি আর কিরিটী রায়ের বদলে বাংলাদেশ পেয়েছে মাসুদ রানা আর কুয়াশা’কে। ভয়াল নামে আরেকটা সিরিজে  ইমতিয়াজ নামে আরেকজন নায়ক তৈরীর চেষ্টা হয়েছিল। ৯টা খণ্ড বের হয়ে ওটা বন্ধ হয়ে যায়।

কাজী আনোয়ার হোসেন নিভৃতচারী। নিজেকে জাহির করেন না। তার প্রচারণা আপনি টেলিভিশন-রেডিওতে দেখবেন না। কিন্তু বাংলাদেশে জন্মে সেবা প্রকাশনী ও কাজী আনোয়ার হোসেনের বই পড়ে নাই- ১৯৬৫ সালের পর থেকে এমন মানুষ আপনি পাবেন না বললেই চলে।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প, লেখকের পৃষ্ঠপোষকতা, প্রচ্ছদ শিল্পীর সম্মানি, রয়্যালটি প্রদান, বই বিপনন, অনুবাদ সাহিত্যে কাজী আনোয়ার হোসেনের অবদান অপরিসীম।

গতকাল ১৯ জুলাই ছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্মদিন। আমি তাই মঙ্গলবার (২০ জুলাই) একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এই মানুষটির একুশে পদক পাওয়া উচিত। অনুবাদ সাহিত্যে হলেও তার বাংলা অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পাওয়া উচিত।

আমাদের সাহিত্যে সবচেয়ে পুরুষালী, সাহসী, অকুতোভয়, দেশপ্রেমিক নায়ক মাসুদ রানাকে সৃষ্টির জন্য তাকে আলাদা করে পুরষ্কৃত করা উচিত।

আমরা তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তো দুরের কথা, তথাকথিত সুশীল সাহিত্যিকদের মধ্য থেকেও সম্মানসূচক কোনও পদক বা খেতাব পেতে দেখি নাই। এটাই আমাদের জাতির দুর্বলতা। 

অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বৃটেনের রানী, জেমস বন্ড নামের অলীক চরিত্রের অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগের বাহুলগ্না হয়ে প্রবেশ করেন। অলীক চরিত্র শার্লক হোমসের বাড়ির নামে একটা যাদুঘর হয় বেকার স্ট্রীট লন্ডনে। আর আমরা কাজী আনোয়ার হোসেনকে লেখক হিসেবে জাতীয় সম্মান দিতে ভুলে যাই। 

কোনো টিভি-রেডিও তার জন্মদিনের কথা মনে করে না। টিভি নাটক লেখেন না বলেই হয়তো। তবে বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটকটি তার পিশাচ দ্বীপ গল্প নিয়ে তৈরী হয়েছিল। বিপাশা ও নোবেলের অভিনয়ে, আতিকুল হক চৌধুরীর পরিচালনায়। সোহেল রানা তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন মাসুদ রানা সিনেমা দিয়ে। অলিভিয়া ও কবরী ছিলেন সঙ্গে। মাসুদ রানা, বিস্মরণ অবলম্বনে।

প্রিয় কাজীদা (কাজী আনোয়ার হোসেন), আমার মতো গুণমুগ্ধ- এমন অসংখ্য তুষারের যতোটা স্মার্টনেস, ব্যক্তিত্ব বা দেশপ্রেম, সেখানে আপনার অবদান আছে। শুভ জন্মদিন, সালাম, অভিবাদন।

নিউজজি/ওএফবি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers