বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৮ জিলহজ ১৪৪২

দেশ

সুদিন ফিরেছে দিনাজপুরের ভুট্টাচাষিদের

দেলোয়ার হোসেন, দিনাজপুর ২২ জুন, ২০২১, ১৬:৫৫:৪৪

  • ছবি : নিউজজি

দিনাজপুর: বাম্পার ফলন হওয়ায় দিনাজপুরের ভুট্টাচাষিরা এবছর ব্যাপক লাভবান হয়েছেন। দানাদার শস্য ভুট্টার বাম্পার উৎপাদনের কারণে স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। বেকারী, পোল্ট্রি শিল্প, হাঁস-মুরগীর খামার, গরুর খামার ও মৎস্য খামারে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে ভুট্টাকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দানাদার ফসলের রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বে ভুট্টার বহুবিধ ব্যবহার হচ্ছে।

আদর্শ ভুট্টা চাষিরা ১৯টি উন্নত হাইব্রীড জাতের ভুট্টার আবাদ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন। উল্লেখ্য, ভুট্টার গড় ফলনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়া মহাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।

দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় ভুট্টার বাম্পার ফলন হচ্ছে। আদর্শ ভুট্টা চাষীগণ জানিয়েছেন আমাদের মাঠে যখন কোন ফসল না থাকে তখন ভুট্টা আবাদ করে মঙ্গা দূর করি। এরপর ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে থাকি।

বিরল উপজেলার কৃষক মো. মুহেব্বুল ইসলাম মনা জানান, এ বছর তিনি বিঘা প্রতি জমিতে ৭৪ মন ভুট্টার ফলন পেয়েছেন। ভুট্টা আবাদকারী অপর কৃষক হাসানুজ্জামান জানান, অতীতে আমরা বোরো ধান আবাদ করতাম। বোরো ধান আবাদে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় কৃষকরা ভুট্টা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। 

ভুট্টা চাষী লতিফ জানান, আমি অন্যের জমি লীজ নিয়ে ভুট্টার আবাদ করে ৫০ শতক জমিতে এবছর প্রায় ৮৫ মণ ভুট্টা আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে ভুট্টা মাড়াই মেশিনটি অনন্য অবদান রাখছে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে এক কেজি শুকনো ভুট্টা ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুরের মহাপরিচালক ড. এম এছরাইল হোসেন জানান, ভুট্টা দানাদার অর্থকরী আন্তর্জাতিক মানের শস্য। এই ভুট্টার রকমারি ব্যবহার হচ্ছে। ভুট্টার তৈরী কর্ণ অয়েল (তেল), কর্ণফেøক্স, শিশুখাদ্য, পপকর্ণ (খইভুট্টা), সুইটকর্ণ (মিষ্টিভুট্টা) চাষী ও ভোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাড়িয়েছে। কর্ণ অয়েল পুষ্টিযুক্ত, কলোষ্টেরালমুক্ত, বর্তমানে টাঙ্গাইলে নাসির গ্রুপ কোম্পানি ভুট্টার তৈল উৎপাদন করছেন।

তিনি বলেন, ভুট্টার আবাদ যান্ত্রীকিকরণ হওয়ায় কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন।

গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সারা দেশে ৫.৫৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। ৬৬.৭২ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টার চাহিদার বিপরীতে ৫৪.০২ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। যাঁর গড় ফলন ছিল ৯.৭৫ মেট্রিক টন হেক্টর প্রতি। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ভুট্টার ফলন স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের পথে, বাংলাদেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। রবি মৌসুমে বোরো আবাদে ২০-২৫ টি সেচ লাগে। আর ভুট্টা ফসলে মাত্র ৩-৫ টি সেচ লাগে ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে যায়। ভুট্টা শুকিয়ে অনায়াসে ২-৩ মাস সংরক্ষণ করা যায়।

সদর উপজেলার ২নং সুন্দরবন ইউনিয়নের কালিকাপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এম এ মতিন জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কৃষকদের মাঝে বীজ বপন, চারা রোপন, বীজ শোধন, সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ, রোগ ও পোকা দমন, সেচ প্রয়োগ, আবহাওয়া জনিত বিশেষ তথ্যাদি পৌছাতে সক্ষম হচ্ছি। ফলে এর উপকার ভুট্টা চাষীরা পেতে শুরু করেছে। কৃষককূল বাম্পার ফলনের লক্ষ্যে বীজ সরবরাহ যেন অব্যাহত থাকে এবং নায্য মূল্যে কৃষক যেন বীজ কিনতে পারে এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষি অফিসার শাহ্ মোহাম্মদ শাখাওয়াত জানান, সদরের দশটি ইউনিয়নে ভুট্টার বাম্পার আবাদ হচ্ছে এবং ফলনও সন্তষজনক। অদূর ভবিষ্যতে আরও আবাদ বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী। ভুট্টা চাষীগণ ন্যায্য মুল্য পাওয়ায় ভুট্টার আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ প্রদীপ কুমার গুহ জানান, জেলার প্রতিটি গ্রামে কম বেশি ভুট্টার আবাদ দেখা যাচ্ছে। কৃষক ভায়েরা বাম্পার ফলন ও ন্যায্য মূল্য পেয়ে দারুণ খুশি এবং আনন্দিত। ভুট্টা গাছের পাতা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া খুবই পছন্দ করে এবং তৃপ্তি সহকারে খেয়ে থাকেন। শুকনো পাতা ও গাছ জ্বালানি খড়ি হিসেবে কৃষাণীদের নিকট ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে ও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গভীর মূলের এই দানাদার শস্য সবুজ ছায়া দেয় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। ভুট্টার পাতা, কান্ড, গাছ, ভুট্টার মোচা তুলে নেওয়ার পর জমিতে পড়ে থাকলে তা মাটির সাথে মিশে জৈব সার তৈরি হয়।

দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সুধেন্দ্র নাথ রায় জানান, দানাদার ভুট্টা যেমন অর্থকরী ফসল, তেমনি বেকার যুবকেরা মাড়াই যন্ত্রের বদৌলতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। অপরদিকে বেকারী শিল্পে, হাস-মুরগী, গোবাদি পশু ও মৎস্য খামারে ব্যাপক কদর রয়েছে এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষকগণ এ দানাদার শস্যটির আবাদের দিকে খুবেই মনোযোগী হয়েছে। ফলে মুজিব শতবর্ষে আর এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

নিউজজি/ এসআই

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers