বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশ

একজনকে ঠেকাতে কাটা হলো ১২ বছরের গাছ!

রাজশাহী প্রতিনিধি ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:৪৯:০৫

173
  • ছবি : নিউজজি

রাজশাহী: এক ব্যক্তি গাছের নিচে বসে বাঁশ কাটতেন—এমন অভিযোগে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্সের প্রায় ১২ বছর বয়সী একটি পাইকর গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ছায়াদানকারী বড় গাছটি কেটে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, একজনকে সরাতে গাছ কাটাই কি ছিল একমাত্র সমাধান?

গাছটির নিচে কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসতেন। প্রচণ্ড গরম ও বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের সময় সেখানে তারা বিশ্রাম নিতেন। দাফন কাজে ব্যবহৃত বাঁশ কাটার শ্রমিকরাও গাছটির নিচে বসতেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের সেখানে বসা নিয়ে আপত্তির জেরেই গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। তবে গাছ কাটার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল কি না, এ বিষয়ে কোনো নথি বা সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

সরকার যখন দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন একটি সরকারি সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানের চত্বরে থাকা ছায়াদানকারী গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে বেশ কিছু খালি জায়গায় বিভিন্ন ধরনের সবজি, কলা ও আখ চাষ করা হয়েছে। প্রায় ১০ থেকে ১৫ কাঠা জায়গাজুড়ে এসব চাষাবাদ করতে দেখা যায়।

এর পাশেই ছিল সেই পাইকর গাছটি। তবে গাছটিতে এখন কোনো ডালপালা বা পাতা নেই। কেটে ফেলার পর গাছটির অস্তিত্ব বলতে পড়ে আছে অবশিষ্ট অংশ।

প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গায় যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা হচ্ছে, সেখানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনজ, ফলজ বা ঔষধি গাছ লাগানোর উদ্যোগ কেন নেয়া হয়নি?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজসেবা কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী বলেন, কমপ্লেক্সের বিভিন্ন খালি জায়গায় সবজি, কলা ও আখসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন অফিস সহকারী মুঞ্জুরুল ইসলাম। উৎপাদিত সবজির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়া হলেও অধিকাংশ বাজারে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ওই কর্মচারীর দাবি, সরকারি জায়গা নিয়ম মেনে কোনো স্থানীয় উদ্যোক্তাকে ইজারা দেয়া হলে সরকার রাজস্ব পেতে পারত। আবার সেখানে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হলেও প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ—দুই দিক থেকেই লাভবান হওয়া সম্ভব ছিল।

গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী মুঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, গাছের নিচে স্থানীয় একজন ব্যক্তি জায়গা দখল করে বাঁশ কাটার কাজ করতেন। তাকে নিষেধ করা হলেও তিনি তা শুনতেন না। এ কারণে গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে।

তাহলে একজন ব্যক্তিকে উচ্ছেদ করতে একটি বড় গাছ কেটে ফেলা হলো কেন-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

গাছ কাটার বিষয়ে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্সের উপ-পরিচালক মনিরা খাতুনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাইরের লোকজন গাছের নিচে বসবে কেন?’

বাইরের লোকজন গাছের নিচে বসলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেত; প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা কিংবা থানায় অভিযোগ করা যেত-এমন প্রশ্ন করা হলে উপ-পরিচালক বলেন, আসলে বিষয়টি আমার জানা নেই, জেনে জানাব।

উপ-পরিচালকের এই বক্তব্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বরে থাকা প্রায় ১২ বছরের একটি গাছ কেটে ফেলার ঘটনা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বিষয়টি জানেন না কেন?

আর যদি বাইরের কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে গাছের নিচে বসে থাকেন, তাহলে তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত কে নিলেন?

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেখানে কোনো ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া বসে কাজ করলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তাও নেয়া যায়।

তাহলে একজন ব্যক্তির বসা ঠেকাতে গাছ কেটে ফেলা হলো কেন-এই প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, গাছ কাটার লিখিত অনুমোদন ছিল কি না।

যদি অনুমোদন ছাড়াই গাছটি কাটা হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীলতার ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, কমপ্লেক্সের খালি জায়গায় চাষাবাদ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। সরকারি জমিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চাষাবাদ হয়ে থাকলে তার অনুমোদন কী, উৎপাদিত পণ্য কোথায় যাচ্ছে এবং এ থেকে প্রতিষ্ঠান বা সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নেরও স্বচ্ছ জবাব প্রয়োজন।

একটি গাছ কেটে ফেলার ঘটনাটি তাই শুধু একটি গাছের বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং সরকারি জায়গার ব্যবহার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন।

এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যাই এখন প্রত্যাশিত।

 

নিউজজি/এসএম

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers