বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ , ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশ

দুই বছর পর কোথায় বরিশালের জুলাই আন্দোলনের ‘প্রতীকী মুখ’রা?

বরিশাল প্রতিনিধি ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৬:৫০:৫৪

96
  • দুই বছর পর কোথায় বরিশালের জুলাই আন্দোলনের ‘প্রতীকী মুখ’রা?

বরিশাল: জেলা জজ কোর্টের সামনের সড়কটি আজও ব্যস্ত। আদালতে আসা মানুষের ভিড়, রিকশার টুংটাং, মোটরসাইকেলের গর্জন আর যানবাহনের অবিরাম চলাচলে দিন কাটে স্বাভাবিক ছন্দে। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই, এই সড়কই একসময় ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। এখানেই উচ্চারিত হয়েছিল পরিবর্তনের দাবিতে শত শত কণ্ঠের স্লোগান। এখানেই পুলিশের লাঠিচার্জ, ধাওয়া, গ্রেপ্তার আর সাহসী প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল বরিশালের জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।

সময়ের ব্যবধানে সেই উত্তাল দিন আজ ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি প্রশ্ন এখনো উত্তর খুঁজছে, যারা সেই আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তারা আজ কোথায়?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে দেশজুড়ে যখন শহীদদের স্মরণ, আলোচনা ও নানা কর্মসূচি চলছে, তখন বরিশালের রাজপথে চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। যে তরুণ-তরুণীদের কণ্ঠে একসময় প্রতিবাদের আগুন জ্বলেছিল, যাদের উপস্থিতিতে সাহস পেত অন্যরা, তাদের অধিকাংশই আজ আর প্রকাশ্যে নেই। রাজপথে নেই, কর্মসূচিতেও নেই। অনেকেই যেন ইচ্ছা করেই সরে গেছেন আলোচনার কেন্দ্র থেকে।

বরিশালের আন্দোলনের স্মৃতি বলতে গেলে কয়েকটি নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে, লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানা, সুজয় শুভ, নাঈম, সুজন, হুজাইফা এবং নাম না-জানা আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী।

আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতেই তারা ছিলেন সামনের সারিতে। কখনো মিছিলের অগ্রভাগে, কখনো স্লোগানের নেতৃত্বে, কখনো আহত সহযোদ্ধাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার দায়িত্বে। ভয়, হুমকি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তাদের থামাতে পারেনি। বরিশালের রাজপথে তারা শুধু অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তারা হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের দৃশ্যমান প্রতীক। বরিশালের আন্দোলনের ইতিহাসে ৩১ জুলাই একটি বিশেষ দিন।

সেদিন জেলা জজ কোর্ট সড়কে আন্দোলনের কর্মসূচি চলছিল। লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানাসহ কয়েকজন নারী আন্দোলনকারী স্লোগান দিচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

অভিযোগ রয়েছে, লামিয়াসহ কয়েকজন নারীকে ওড়না ধরে টেনে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয় এবং পরে আটক করা হয়। একই ঘটনায় সুজয় শুভ, নাঈম, হুজাইফাসহ আরও কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। পরে কয়েকজনকে কিছু সময় আটকে রেখে ছেড়ে দেয়া হয়।

ঘটনার ভিডিও ও স্থিরচিত্র মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের কাছে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে বরিশালের জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুহূর্ত।

সেই সময় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন লামিয়া সাইমুন। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে স্লোগান দেওয়া, লাঠির আঘাত সহ্য করেও পিছু না হটার দৃশ্য তাকে আন্দোলনের প্রতীকী মুখে পরিণত করেছিল।

দুই বছর পর তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফোনে কোনো সাড়া মেলেনি। একসময় যিনি প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় ছিলেন, এখন তিনি যেন নীরবতাকেই নিজের ঠিকানা বানিয়েছেন।

শুধু লামিয়া নন, বরিশালের আন্দোলনের আরও অনেক পরিচিত মুখ এখন জনসম্মুখ থেকে অনেকটাই সরে গেছেন। আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সুজয় শুভ মনে করেন, জুলাই ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই।

তিনি বলেন, আমরা জুলাইয়ে অংশ নিয়েছিলাম, কারণ এই ভূখণ্ডের মানুষকে দীর্ঘদিন ভাত ও ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। জুলাই ছিল সেই বঞ্চনারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেখলাম, জনগণের সংকট কাটেনি। যেখানে জনগণই অনুপস্থিত হয়ে যায়, সেখানে নিজেদের উপস্থিতিরও কোনো অর্থ থাকে না। এজন্যই গুটিয়ে গেছি।

আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ জান্নাত নিপু বলেন, তারা আন্দোলন থেকে সরে যাননি; বরং আন্দোলনের আদর্শ থেকে সরে যাওয়া বাস্তবতাই তাদের হতাশ করেছে।

তার ভাষায়, আমরা হারিয়ে যাইনি। কিন্তু একপক্ষ ক্ষমতার ব্যবহার করে জুলাইকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছে, যা আমাদের চাওয়া ছিল না। এখন শুনি, অমুক-তমুক ‘মাস্টারমাইন্ড’। অথচ গণঅভ্যুত্থানে একজন মাস্টারমাইন্ড থাকে না, সবাই-ই মাস্টারমাইন্ড। জুলাই ছিল আমাদের সামষ্টিক স্বার্থের আন্দোলন। সেখানে ঐক্যের প্রয়োজন ছিল। ছয়জন রিকশাশ্রমিক জুলাইয়ে মারা গেলেও তাদের কথা কেউ বলেনি। জুলাইকে ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। এসব কারণেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।

একসময় প্রতিদিন রাজপথে দেখা যেত যাদের, তাদের অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে নিয়মিত। কেউ চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন, কেউ আবার ব্যক্তিগত জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের অনেকেই মনে করেন, তাদের নীরবতার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা নয়; রয়েছে আন্দোলন-পরবর্তী হতাশা, মতপার্থক্য, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক এবং আন্দোলনের চেতনা নিয়ে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্ন।

আজ জেলা জজ কোর্টের সেই সড়কে আর স্লোগান শোনা যায় না। পুলিশের ধাওয়া নেই, ব্যারিকেড নেই, নেই উত্তেজনায় থমকে যাওয়া শহরও। আছে কেবল স্বাভাবিক নগরজীবনের শব্দ। কিন্তু ইতিহাসের শব্দ কখনো থেমে থাকে না।

বরিশালের জুলাই আন্দোলনের কথা উঠলেই ফিরে আসে কয়েকটি মুখ, কয়েকটি দৃশ্য, কয়েকটি সাহসী মুহূর্ত। সময় তাদের রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে নয়।

লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানা, সুজয় শুভ, নাঈম, সুজন, হুজাইফা এবং নাম-না-জানা আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী, তারা আজ হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। তবু বরিশালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের পদচিহ্ন অমলিন।

কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা কোনো এক সংকটময় সময়ে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে নিজের বিশ্বাসকে বড় করে দেখেছিলেন। রাজপথ থেকে তারা সরে যেতে পারেন, কিন্তু একটি সময়ের সাহস, প্রতিবাদ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে তাদের নাম রয়ে যায় মানুষের স্মৃতিতে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers